বাঙালি বংশোদ্ভূত এক মুসলিম নারীকে বেআইনিভাবে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ করার ঘটনায় আসাম সরকারকে ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন ভারতের গৌহাটি হাইকোর্ট। আদালতের মতে, আইনি প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই ওই নারীকে দেশ থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনায় নিয়মের গুরুতর লঙ্ঘন হয়েছে।
মমতাজ বেগম নামের ওই নারীর পরিবার জানতে পারে, তাকে জোরপূর্বক ভারত থেকে বের করে বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে। এরপর তারা গৌহাটি হাইকোর্টে হেবিয়াস কর্পাস পিটিশন দায়ের করে। মামলায় ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেও পক্ষভুক্ত করা হয়। বাংলাদেশে মমতাজের সন্ধান চালিয়ে তাকে দ্রুত ভারতে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দেন আদালত।
ঘটনাটিতে নগাঁও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেছে হাইকোর্টের বিচারপতি কল্যাণ রাই সুরাণা ও বিচারপতি সুস্মিতা ফুকন খাউন্ডের বেঞ্চ। আদালত বলেছে, ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রমে আইনের চরম অপব্যবহার ও ব্যক্তিগত আক্রোশের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালগুলো মূলত নথিপত্রের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির নাগরিকত্ব নির্ধারণ করে।
মমতাজের নাগরিকত্ব নিয়ে আইনি লড়াই শুরু হয় ১৯৯৭ সালে ভোটার তালিকা সংশোধনের সময়। তখন তাকে ‘ডি’ বা সন্দেহভাজন ভোটার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। পরে বর্ডার পুলিশ তার বিষয়টি ট্রাইব্যুনালে পাঠায়। ২০১৭ সালে নগাঁও ফরেনার্স ট্রাইব্যুনাল তাকে বিদেশি ঘোষণা করে। হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জের পর মামলাটি পুনর্বিবেচনার জন্য পাঠানো হলেও পরবর্তী সময়ে ট্রাইব্যুনাল আবারও তাকে বিদেশি ঘোষণা করে।
২০১৯ সালে ট্রাইব্যুনাল মমতাজ তার বাবার সন্তান—এটি যথাযথভাবে প্রমাণ করতে পারেননি বলে উল্লেখ করে। পরে গৌহাটি হাইকোর্ট তার দাখিল করা সব নথি ও প্রমাণ নতুন করে পর্যালোচনার নির্দেশ দেয়।
হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী গত ৩০ মে মমতাজ ট্রাইব্যুনালে হাজির হন। কিন্তু মামলাটি পুনর্বিবেচনা না করে ট্রাইব্যুনালের বিচারক বিপুল কুমার নাথ তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই আদালত চত্বর থেকে তাকে আটক করা হয়। তার আইনজীবীদের অভিযোগ, গ্রেপ্তারের নির্দেশের কোনো কপিও তাকে দেওয়া হয়নি। ফলে ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ থেকেও তিনি বঞ্চিত হন।
হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মামলাটি পুনরায় ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর বিষয়টি বিচারকের ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণেই এমন পরিণতি পেয়েছে। আদালত মনে করে, ১৯৫০ সালের আসাম থেকে অভিবাসী বহিষ্কার আইনেরও লঙ্ঘন হয়েছে। কারণ, আইনি প্রতিকার পাওয়ার সব পথ শেষ হওয়ার আগে কাউকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা যায় না।
মমতাজকে গ্রেপ্তারের সময় নিয়েও পরিবার ও পুলিশের বক্তব্যে বড় ধরনের অসঙ্গতি পেয়েছে আদালত। পরিবারের দাবি, ৩০ মে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তিনি ট্রাইব্যুনালে যান এবং প্রায় আধা ঘণ্টার মধ্যে জুরিয়া থানার পুলিশ তাকে নিয়ে যায়। অন্যদিকে নগাঁওয়ের পুলিশ সুপারের দাবি, দুপুর ২টার দিকে ট্রাইব্যুনালের বাইরে থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আদালত প্রশ্ন তোলে, মমতাজকে মৌখিকভাবেও যদি রায় জানানো না হয়ে থাকে, তাহলে তিনি কেন দুপুর ২টা পর্যন্ত ট্রাইব্যুনাল চত্বরে অপেক্ষা করবেন। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ, মমতাজকে গ্রেপ্তার করে মাতিয়া ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানো এবং পরে দেশ থেকে বিতাড়নের সুযোগ তৈরি করতেই রায় দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্ব করা হয়েছিল। এভাবে রাজ্য প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাকে হাইকোর্টে যাওয়ার আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছেন বলে আদালত মনে করেছে।
এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতেই অন্তর্বর্তীকালীন প্রতিকার হিসেবে আসাম সরকারকে মমতাজ বেগমকে ২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এ সময় সুপ্রিম কোর্টের একটি পুরোনো রায়ের উল্লেখ করে বেঞ্চ জানায়, সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, তা শুধু ভারতীয় নাগরিকদের জন্য নয়; বিদেশিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
এ ছাড়া আসামের সব জেলার পুলিশ সুপারদের কোনো ঘোষিত বিদেশিকে হেফাজতে নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট রায়ের বিষয়ে তাকে অবহিত করার নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। পাশাপাশি, তাকে অন্যত্র স্থানান্তরের আগে পরিবারের কোনো প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যকে বিষয়টি জানানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত বছরের মে মাস থেকে আসামের বিজেপি সরকার ঘোষিত বিদেশিদের গভীর রাতে বাড়ি থেকে তুলে বাংলাদেশে পুশব্যাকের অভিযান চালিয়ে আসছে। মমতাজ বেগমের ঘটনাও সেই প্রক্রিয়ার অংশ বলে অভিযোগ রয়েছে। গত চার বছরে আসামের ফরেনার্স ট্রাইব্যুনালগুলো প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার মানুষের নাগরিকত্ব কেড়ে নিয়েছে, যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উচ্চ আদালত উদ্বেগ ও সমালোচনা জানিয়েছে।
এমএমআর