ভারতে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবা স্টারলিংকের যাত্রা শুরুর অনুমতি পেতে দীর্ঘসূত্রতা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্ক। এ নিয়ে ভারতের শীর্ষ ধনকুবের মুকেশ আম্বানিকে কটাক্ষ করে তাকে ‘প্রধানমন্ত্রী আম্বানি’ বলে আখ্যা দিয়েছেন স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা। মাস্কের অভিযোগ, নিজেদের টেলিকম ব্যবসার আধিপত্য ধরে রাখতেই ভারতে স্টারলিংকের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা চলছে।
শুক্রবার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আম্বানিকে উদ্দেশ করে ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় ক্ষমা চান মাস্ক। তিনি লেখেন, ভারতের প্রকৃত ক্ষমতাধর ব্যক্তি যে আম্বানি, তা বুঝতে না পারায় তিনি দুঃখিত। একই সঙ্গে ভারতের বাজারে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মাস্কের অভিযোগ, ভারতের সাধারণ মানুষের স্বার্থের পরিবর্তে নিজেদের বাজারের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতেই আম্বানি আগ্রহী। রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের চেয়ারম্যানকে উদ্দেশ করে তিনি প্রশ্ন তোলেন, বাজারে নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে চাইলেও স্টারলিংককে প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া হবে কি না।
পাঁচ বছরেও অনুমোদন নিয়ে প্রশ্ন
স্যাটেলাইটের মাধ্যমে উচ্চগতির ইন্টারনেট সরবরাহকারী স্টারলিংক পরিচালনা করে মাস্কের মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ইন্টারনেট বাজার ভারতে সেবা চালুর জন্য প্রতিষ্ঠানটি কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করছে।
মাস্কের দাবি, বিশ্বের ১৬৫টিরও বেশি দেশে স্টারলিংকের কার্যক্রমের অনুমোদন রয়েছে। ভারতের আইন ও সরকারি শর্ত মেনে চলতে গত পাঁচ বছর ধরে কাজ করার পরও কেন চূড়ান্ত অনুমতি মিলছে না, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
স্টারলিংকের সেবা চালু হলে দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ প্রচলিত নেটওয়ার্কের বাইরে থেকেও ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ পাবেন বলে দাবি মাস্কের। এতে শিক্ষা, ব্যবসা ও যোগাযোগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থা অচল হয়ে পড়লে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট জরুরি যোগাযোগ সচল রাখতে সহায়তা করতে পারে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মাস্কের ভাষ্য, বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় অন্য যোগাযোগব্যবস্থা ব্যর্থ হলেও স্টারলিংক জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ভারতে সেবা চালুর অনুমতি দেওয়া হলে সেখানকার মানুষেরও উপকার হবে বলে তিনি দাবি করেন।
সরকারের বক্তব্য, অনুমোদনের প্রক্রিয়া একই
তবে স্টারলিংকের অভিযোগের সঙ্গে একমত নয় ভারত সরকার। দেশটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মতো স্টারলিংককেও একই ধরনের নিয়ন্ত্রক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রতি বৈষম্য করা হচ্ছে—এমন অভিযোগকে সরকার ভিত্তিহীন ও ভুল ধারণাপ্রসূত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
শুক্রবার ভারতের টেলিযোগাযোগমন্ত্রী জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া বলেন, কোনো খাতেই একচেটিয়া ব্যবসার সুযোগ দেয় না ভারত।
স্টারলিংক ইতোমধ্যে স্যাটেলাইট যোগাযোগসেবা দেওয়ার লাইসেন্স পেয়েছে। তবে কার্যক্রম শুরুর জন্য এখনো নিরাপত্তাসংক্রান্ত ছাড়পত্র এবং প্রয়োজনীয় স্পেকট্রাম বরাদ্দের অপেক্ষায় রয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
সরকারি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, স্টারলিংক, রিলায়েন্সের জিও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস এবং ভারতী এয়ারটেলের সমর্থনপুষ্ট ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েব—তিনটি প্রতিষ্ঠানই মোটামুটি একই পর্যায়ে অনুমোদন প্রক্রিয়ায় রয়েছে।
স্টারলিংকের কর্মকর্তারা বলছেন, ভারতীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন এবং নেটওয়ার্কে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও যুক্ত করেছেন। চলতি সপ্তাহে দিল্লিতে একটি শিল্পবিষয়ক অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভারত প্রস্তুত হলেই তারা সেবা দিতে প্রস্তুত।
টেলিকম বাজারে আম্বানি ও এয়ারটেলের শক্ত অবস্থান
ভারতের মোবাইল ও ব্রডব্যান্ড বাজারের ৮০ শতাংশেরও বেশি নিয়ন্ত্রণ করে রিলায়েন্স জিও এবং সুনীল ভারতী মিত্তালের ভারতী এয়ারটেল। ফলে স্টারলিংকের প্রবেশ নিয়ে বিরোধের পেছনে বাজারের প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে জিও ও এয়ারটেলও স্যাটেলাইট যোগাযোগের বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করার চেষ্টা করছে। রিলায়েন্স জিও স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস গড়ে তুলছে এবং লুক্সেমবার্গভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এসইএসের সঙ্গে তাদের অংশীদারত্ব রয়েছে। অন্যদিকে, ভারতী এয়ারটেলের ইউটেলস্যাট ওয়ানওয়েবে উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি আন্তর্জাতিক বাজারে স্টারলিংকের প্রতিদ্বন্দ্বী।
গত বছর স্টারলিংকের সরঞ্জাম ও সেবা ভারতে বিতরণের জন্য জিও এবং এয়ারটেলের সঙ্গে চুক্তি করে স্পেসএক্স। তবে চুক্তিগুলো বাস্তবায়ন ও সেবা চালুর ক্ষেত্রে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন।
স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক নিয়ে ভারতের উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে জাতীয় নিরাপত্তা, যোগাযোগ অবকাঠামোর নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশি প্রতিষ্ঠানের পরিচালিত ব্যবস্থার ওপর দেশীয় আইন কার্যকর করার সক্ষমতা।
সূত্র : দ্য টেলিগ্রাফ অনলাইন
এআরবি