হোম > বিশ্ব > ভারত

খ্যাতিমান সোহরাওয়ার্দীকে বাদ দিয়ে গণহত্যাকারীর নামে সড়ক

কলকাতার রাজনীতি

বিশেষ প্রতিনিধি, কলকাতা

কলকাতার ঐতিহ্যের মানচিত্রে বড় পরিবর্তন হয়ে গেল বিজেপি সরকারের নির্দেশে। শহরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ’র নাম বদলে রাখা হয়েছে ‘গোপাল মুখার্জি রোড’।

এই সিদ্ধান্তে শুধু বিতর্কই নয়, গভীর ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগও জোরালো হয়েছে। এই নামকরণের পেছনে রয়েছে জটিল ও ভ্রান্ত ইতিহাসের জাল। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে ঐতিহাসিক পদক্ষেপ বলা হলেও বিরোধীদের বক্তব্য, সড়কটির নামকরণ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে না, বরং তার চাচা শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসক হাসান সোহরাওয়ার্দীর সম্মানে নামকরণ করা হয়েছিল।

গত রোববার এক্সে দেওয়া পোস্টে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে অভিহিত করেন। পশ্চিমবঙ্গ দিবসে (২০ জুন) নেওয়া এই সিদ্ধান্ত দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের পদক্ষেপ বলে মন্তব্য করেন তিনি। এক্সে তিনি লেখেন, ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউর নাম বাদ দিয়ে এখন গোপাল মুখার্জি রোড করা হবে।’

শুভেন্দুর দাবি, কলকাতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক দীর্ঘদিন এমন একজনের নামে ছিল, যিনি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন এবং রাজনৈতিক স্বার্থে নিরীহ মানুষের বিরুদ্ধে সহিংসতার সময় দায়িত্বে ছিলেন।

তার এই মন্তব্যকে অনেকে অবিভক্ত বাংলার শেষ প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর প্রতি ইঙ্গিত হিসেবে দেখেছেন। তৃণমূল কংগ্রেসের সাবেক সংসদ সদস্য ও জাতীয় মুখপাত্র সাকেত গোখলে এক্সে লেখেন, ‘এই সড়কের নাম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে রাখা হয়নি।’

শুভেন্দু দাবি করেন, গোপাল মুখার্জির নামে সড়কটির নামকরণ করলে একজন ‘প্রকৃত রক্ষক ও ত্রাণকর্তাকে’ সম্মান জানানো হবে এবং এর মাধ্যমে ঐতিহাসিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হবে। তিনি আরো লেখেন, ‘এখন থেকে পশ্চিমবঙ্গ প্রকৃত বীরদের স্মরণ করবে, ভুল সংশোধন করবে এবং তাদের সম্মান জানাবে।’

সড়কটির নাম পরিবর্তনকে শুভেন্দু ঐতিহাসিক অন্যায় সংশোধন হিসেবে তুলে ধরলেও সমালোচকরা ভিন্ন প্রশ্ন তুলেছেন। সড়কটির নাম আদৌ কি হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে রাখা হয়েছিল কিনা সেই প্রশ্নও তুলেছেন তারা।

সাকেত গোখলে উল্লেখ করেন, সড়কটির নাম অবিভক্ত বাংলার সাবেক প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নামে নয়; বরং তার চাচা হাসান সোহরাওয়ার্দীর নামে রাখা হয়েছিল। তৃণমূল কংগ্রেস নেতা কুনাল ঘোষও এক্সে লেখেন, ‘আমার মনে হয় কলকাতা পৌর করপোরেশন বড় ধরনের ভুল করেছে।’

তিনি উল্লেখ করেন, দুই সোহরাওয়ার্দী ছিলেন চাচা-ভাতিজা। তারা লেখেন, ‘মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর বিষয়টি যাচাই করা উচিত এবং কলকাতা পৌর করপোরেশনকে নথিপত্র পরীক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া উচিত। যদি ভুলবশত ভাতিজার বদলে চাচাকে শাস্তি দেওয়া হয়, তাহলে তা দুর্ভাগ্যজনক হবে।’

ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, হাসান সোহরাওয়ার্দী ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও চিকিৎসাবিদ্যায় স্বনামধন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯৩০-১৯৩৪ সাল পর্যন্ত কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি ভারতীয় উপমহাদেশের দ্বিতীয় মুসলিম হিসেবে ইংল্যান্ডের রয়্যাল কলেজ অব সার্জনসের ফেলো হওয়ার কৃতিত্বও অর্জন করেন। ১৯৩৩ সালে হাসান সোহরাওয়ার্দী জীবিত থাকাকালেই ক্যালকাটা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশন পার্ক সার্কাস থেকে কসাইপাড়া লেনের সংযোগকারী এই রাস্তাটির নামকরণ তার নামে করেছিল। এই নামকরণ করেছিলেন কলকাতার তৎকালীন মেয়র ডা. বিধানচন্দ্র রায়।

এই রাস্তাতেই ছিল হাসান সোহরাওয়ার্দীর বাসস্থান ‘কাশানা’, যা তৎকালীন ভারতের বহু প্রথিতযশা রাজনীতিকদের মিলনক্ষেত্র ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় এই সড়কের একটি ভবনেই বাংলাদেশের অস্থায়ী প্রবাসী সরকার কাজ চালিয়েছিল।

নতুন নামকরণের সিদ্ধান্ত ঘিরে প্রথম যে বিতর্ক মাথাচাড়া দিয়েছে, তা হলো ‘সোহরাওয়ার্দী’ নামটির পরিচিতি নিয়ে চরম বিভ্রান্তি। সাধারণভাবে এই নামটি উচ্চারণ করলেই মানসপটে ভেসে ওঠে অবিভক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী ‘হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী’র মুখ। বিজেপি সরকার হয়তো এই রাজনৈতিক নেতার নাম মুছে ফেলতে চেয়েছিল। কিন্তু সড়কটি এমন এক মানবতাবাদীর নামে ছিল, যার সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক ছিল না।

শিক্ষা ক্ষেত্রে তার ছিল অপরিসীম অবদান। এমনকি শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হন, তখন হাসান সোহরাওয়ার্দী তাকে সমর্থন করেছিলেন। শুধু তাই নয়, স্যার ডা. হাসান সোহরাওয়ার্দী ভারতের রেলওয়ের নিজস্ব অ্যাম্বুলেন্স, নার্সিং এবং সামগ্রিক চিকিৎসা পরিষেবা ব্যবস্থার জনকও ছিলেন।

সত্যিকারের এই মানবতাবাদী আজীবন আর্তের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। অথচ বিজেপি সরকার ইতিহাসের সঠিক পাঠ না নিয়ে প্রচলিত বিভ্রান্তিকে কাজে লাগিয়ে মহান এই চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদের নাম কলকাতার রাজপথ থেকে মুছে ফেলল। এটি কেবল ইতিহাসের বিকৃতিই নয়, নোংরা মুসলিম বিদ্বেষের বহিঃপ্রকাশ।

কে এই গোপাল পাঁঠা

অন্যদিকে, গোপাল মুখার্জী ওরফে ‘গোপাল পাঁঠা’ ইতিহাসে অত্যন্ত বিতর্কিত, কুখ্যাত এক দাঙ্গাবাজের নাম। ‘সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ’ নামকরণ করেছিলেন যে বিধানচন্দ্র রায়, তিনিই ছিলেন এই দাঙ্গাবাজের রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষক। ১৯৪৬ সালে দাঙ্গার সময় কলকাতার হিন্দুদের সংঘবদ্ধ করেছিলেন ‘গোপাল পাঁঠা’। তিনি ‘পাঞ্জাবি কমিটি’ গড়ে তুলে উগ্রবাদী হিন্দুদের সংগঠিত করেন। এরপর মুসলমানদের ওপর আক্রমণ শুরু করেন। ফলে কলকাতার দাঙ্গার গতিপ্রকৃতি পরিবর্তিত হয়ে যায়। দাঙ্গার তীব্রতা এতটাই ছিল যে, তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী পর্যন্ত তা থামাতে পারেননি। গান্ধী কলকাতার দাঙ্গা শান্ত করতে এলে ‘গোপাল পাঁঠা’ তার কাছে দাবি করেছিলেন যে, দাঙ্গার জন্য দায়ী মুসলিমরা। তাই তারা আগে অস্ত্র সমর্পণ করলে সে শান্ত হবে।

কলকাতার বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী গর্গ চ্যাটার্জী তাকে সরাসরি ‘কুখ্যাত অপরাধী’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি ছিলেন ‘দাঙ্গা সংগঠক’ এবং আইনের শাসন ভঙ্গকারী।

এমন কুখ্যাত ব্যক্তির নামে সড়কের নামকরণের মাধ্যমে বিজেপি সরকার এক মহান চিকিৎসক ও শিক্ষাবিদকে অপমান করল। তার বদলে এমন এক ব্যক্তিকে সম্মানিত করল, যার ভাবমূর্তি বিপুল জনগোষ্ঠীর কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। এই সিদ্ধান্ত গভীর রাজনৈতিক এজেন্ডাকে ইঙ্গিত করে, যেখানে ইতিহাসকে নিজেদের সুবিধামতো ব্যাখ্যা করে এবং বিভ্রান্তিকে পুঁজি করে বিশেষ আদর্শ প্রচার করা হচ্ছে। এই নামকরণ কেবল এক রাস্তার নাম পরিবর্তন নয়, বরং ইতিহাসকে বিকৃত করা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এক ভ্রান্ত ধারণাকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করার নগ্ন প্রচেষ্টা। এই পদক্ষেপ কেবল একটি রাস্তার নাম পরিবর্তন নয়, বরং কলকাতা শহরের পরিচয় ও ঐতিহ্যের ওপর চরম আঘাত।

ভয়ঙ্কর গোপাল পাঁঠার উত্থান

১৯৪৬ সালে কলকাতার ভয়াবহ দাঙ্গার ইতিহাসে অত্যন্ত আলোচিত ও বিতর্কিত নাম ‘গোপাল পাঁঠা’, যার আসল নাম ছিল গোপাল চন্দ্র মুখার্জী। তৎকালীন কলকাতা পুলিশের নথিতে তাকে ‘ফেরোশাস’ বা ভয়ানক এবং ‘ক্রিমিনাল’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। মধ্য কলকাতার ওয়েলিংটন স্কয়ার, কলেজ স্ট্রিট এবং বৌবাজার এলাকায় তার নিজস্ব বিশাল বাহিনী ছিল, যাদের নিয়ে তিনি দাপিয়ে বেড়াতেন। যদিও দাবি করতেন, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নন। তবে কংগ্রেস নেতা ডা. বিধানচন্দ্র রায়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা ছিল।

তার বাহিনীর কাছে ১৯৪২ সালের ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন’-এর সময় থেকেই প্রচুর অস্ত্রশস্ত্র মজুত ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় কলকাতায় অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের কাছ থেকেও তিনি অস্ত্র সংগ্রহ করেছিলেন। কখনো ২৫০ টাকার বিনিময়ে, আবার কখনো মাত্র এক বোতল হুইস্কির বিনিময়ে তিনি আমেরিকান পয়েন্ট ৪৫ পিস্তল এবং কার্তুজ জোগাড় করে নিজের ভাণ্ডার শক্তিশালী করেছিলেন।

‘একটার বদলে দশটা’ লাশের হুঙ্কার

’৪৬-এর দাঙ্গার সময় গোপাল পাঁঠা ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেন। তিনি তার বাহিনীর লোকদের নির্দেশ দেনÑ দাঙ্গাকারীদের চরম শিক্ষা দিতে হবে। তার নির্দেশ ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও নির্মম, ‘ওরা যদি একটাকে মারে, তোমরা দশটাকে মারবে।’

তিনি তার বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, কাউকে আধমরা করে ছেড়ে না দিয়ে পুরোপুরি খতম করার জন্য। তার লোকজন সে সময় কত মানুষকে হত্যা করেছিল, তার কোনো হিসাব স্বয়ং গোপাল পাঁঠার কাছেও ছিল না।

গান্ধীর কাছে অস্ত্র সমর্পণে অস্বীকৃতি

দাঙ্গার ভয়াবহতা কমার পর ১৯৪৭ সালে মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী যখন কলকাতায় আসেন এবং শান্তি স্থাপনের উদ্দেশ্যে দাঙ্গাকারীদের অস্ত্র সমর্পণের আহ্বান জানান, তখন যুগল চন্দ্র ঘোষের মতো অনেকেই অস্ত্র জমা দিয়ে গান্ধীবাদী হয়ে যান। কিন্তু গোপাল পাঁঠা তা দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেন। কংগ্রেস নেতাদের অনুরোধে তিনি অধ্যাপক নির্মল বসুর উপস্থিতিতে গান্ধীর সঙ্গে দেখা করতে গেলেও পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, তিনি একটি সুচও জমা দেবেন না।

বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে, তার বাহিনীর হাতে থাকা সেসব অস্ত্রের কিছু অংশ পরবর্তী সময়ে শহরে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত হয়েছিল। অবশেষে ২০০৫ সালে কুখ্যাত এই দাঙ্গাবাজের মৃত্যু হয়।

মমতাকে তৃণমূল থেকে অপসারণের ঘোষণা বিদ্রোহীদের, অভিষেকও বরখাস্ত

ভারতে কোচিং সেন্টারে ভয়াবহ আগুন, নিহত ১৪

মসজিদ-মাদরাসা ধ্বংসের জেরে ভারতে আন্দোলনে নামছে মুসলিমরা

শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে দিল্লিতে ককরোচ পার্টির অনির্দিষ্টকালের অবস্থান কর্মসূচি

ভারতে ৪৫ দিনে ২৩টির বেশি মসজিদ-মাদরাসা গুঁড়িয়ে দিল বিজেপি সরকার

কলকাতার রেড রোডে মোদির যোগব্যায়াম ঘিরে সমতার বিতর্ক

কলকাতায় রাস্তা আটকে মোদির যোগব্যায়াম

কোটি টাকায় ভারতে শিশু বেচাকেনা

কেন ২০ জুনকেই ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ হিসেবে বেছে নিল বিজেপি সরকার

যে কারণে ভেঙে তিন টুকরো হলো তৃণমূল কংগ্রেস