ভারত আবার উত্তাল হয়ে উঠেছে। এবার বিক্ষুব্ধ জনগণ রাজপথে নেমেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবিতে। তিনি সুকৌশলে কোটি কোটি ভোটারকে তালিকা থেকে বাদ দিয়েছেন বলে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। আর এর সুফল পেয়েছে ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
গতকাল শুক্রবার দিল্লি, মুম্বাই, কলকাতাসহ ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ হয়েছে। দিল্লির যন্তর মন্তরে বিক্ষোভে অংশ নিতে গেলে দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতিশী মারলেনাসহ ৭০০’র বেশি মানুষকে আটক করা হয়। আটকদের মধ্যে আম আদমি পার্টির (এএপি) দিল্লিপ্রধান সৌরভ ভরদ্বাজ, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরাও রয়েছেন।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ তুলে সিইসির পদত্যাগ দাবিতে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়। ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ছাড়াও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, নাগরিক সমাজ ও বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা এতে অংশ নেন। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। কমিশনের বক্তব্য, যোগ্য ভোটারদের বাদ দেওয়ার উদ্দেশ্যে নয়; বরং মৃত, অযোগ্য ও একাধিকবার তালিকাভুক্ত ভোটারদের শনাক্ত করে তালিকা সংশোধনের জন্যই এ কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে।
পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচিতে যোগ দিতে গতকাল শুক্রবার দিল্লির যন্তর মন্তরের দিকে রওনা হন বিক্ষোভকারীরা। তবে সেখানে পৌঁছানোর আগেই তাদের আটকে দেয় পুলিশ। যন্তর মন্তর ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। পুলিশের পাশাপাশি র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স ও কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের সদস্যসহ কয়েক হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়। খবর বিবিসি, আলজাজিরা ও টেলিগ্রাফের।
বিক্ষোভ মোকাবিলায় নয়াদিল্লিতে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সহিংসতা আইনের ১৬৩ ধারা জারি করা হয়। এর আওতায় পাঁচজনের বেশি মানুষের জমায়েত, মিছিল, বিক্ষোভ, অবস্থান, স্লোগান ও বক্তৃতায় বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার বিভিন্ন সড়কেও ব্যারিকেড দেওয়া হয়। বিক্ষোভের মূল কেন্দ্র যন্তর মন্তরের আশপাশের ১১ মেট্রো স্টেশন বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ওই এলাকায় রাত ৯টা পর্যন্ত ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।
এসআইআর ঘিরে অনিয়মের অভিযোগে গান্ধীজয়ন্তীতে যন্তর মন্তরে এই আন্দোলনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল আগেই। ছাত্র সংগঠন এআইএসএ, রাজ্যসভার এমপি মনোজ ঝা এবং সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণের ডাকে এই জমায়েত শুরু হওয়ার কথা ছিল শুক্রবার বেলা ১১টায়। আন্দোলন দমাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েক হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়।
পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে যন্তর মন্তরের দিকে এগিয়ে গেলে একের পর এক বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। বিকালের দিকে আটকের সংখ্যা ৭০০ ছাড়ায়। আটকদের মধ্যে দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতিশী, এএপি নেতা সৌরভ ভরদ্বাজ ও সঞ্জয় সিং, সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব এবং এআইএসএ সভাপতি নেহা বোরাও রয়েছেন। আটকের পর তাদের বিভিন্ন থানায় নেওয়া হয়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আটকের পর পুলিশ বাসে তোলার সময় বিক্ষোভকারী ঋষভ সিং বলেন, ‘বিক্ষোভ করার অধিকার আমাদের মৌলিক অধিকার। আর ভোট চুরির বিষয়ে আমরা সরকারের কাছে জবাব চাই।’
দিল্লির বাইরেও বিক্ষোভ
এদিকে, পুলিশের অনুমতি না পাওয়া সত্ত্বেও মুম্বাইয়ের ঐতিহাসিক শিবাজি পার্কে সিজেপির ডাকে হাজার হাজার তরুণ-তরুণী ‘জেল ভরো’ কর্মসূচিতে অংশ নেন। সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের নেতৃত্বে আয়োজিত এই প্রতিবাদে সংহতি জানাতে উপস্থিত হন প্রবীণ অভিনেতা নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি এবং জনপ্রিয় গায়ক বিশাল দাদলানির মতো বলিউড তারকারা। মুম্বাইয়ের বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও শহরের বাইরের কিছু স্থান থেকেও অনেকে সেখানে যোগ দেন।
সমাবেশস্থলে বিপুলসংখ্যক পুলিশ মোতায়েন ছিল। একটি ট্রাকের ওপর অস্থায়ী মঞ্চ তৈরি করে সেখান থেকে সিজেপির নেতারা বক্তব্য দেন। দলটি জানিয়েছে, অক্টোবরজুড়ে দেশের বিভিন্ন শহরে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে।
সিজেপির আহ্বায়ক সৌরভ দাস বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। সংগঠনটির দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব দিতে হবে। চেন্নাইয়ের রাজরত্নম স্টেডিয়ামের কাছেও একই দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
বিরোধী দলের মিছিলে বাধা
শুধু যন্তর মন্তরেই নয়, দিল্লির আশপাশের বিভিন্ন এলাকাতেও বিক্ষোভের চেষ্টা করা হয়। ইন্ডিয়ান ইয়ুথ কংগ্রেসের নেতাকর্মীরা রাইসিনা রোডে সংগঠনটির কার্যালয় থেকে যন্তর মন্তরের দিকে মিছিল নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়।
সংগঠনটির সভাপতি উদয় ভানু চিব বলেন, নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব প্রতিটি ভোটের মর্যাদা রক্ষা করা। ভোটার তালিকা নিয়ে কমিশনের ভেতরেই যখন প্রশ্ন উঠছে, তখন দেশের মানুষের কাছে এর জবাব ও জবাবদিহি প্রয়োজন। পরে জনপথ এলাকাতেও কয়েক ডজন মানুষ অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করেন। পুলিশ তাদের পার্লামেন্ট স্ট্রিট ও যন্তর মন্তরের দিকে যেতে বাধা দেয়। কেন্দ্রীয় দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ এলাকাগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়।
ভোটার তালিকা নিয়ে অভিযোগ
ভোটার তালিকার এসআইআর প্রক্রিয়াকে ঘিরেই মূলত বর্তমান বিরোধের সূত্রপাত। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে বিপুলসংখ্যক যোগ্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। তাদের দাবি, এই প্রক্রিয়া ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা দিতে পারে।
তবে নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। কমিশনের বক্তব্য, ভোটার তালিকা থেকে মৃত, অযোগ্য, একই ব্যক্তির একাধিক নামসহ ভুল বা অনুপযুক্ত তথ্য বাদ দেওয়ার লক্ষ্যেই সংশোধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কমিশন আরো জানিয়েছে, এসআইআর-পরবর্তী সময়ে বাদ পড়তে পারেন এমন যোগ্য ভোটারদের শনাক্ত করে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বিশেষ উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
সিজেপির দেশজুড়ে আন্দোলনের ঘোষণা
সিইসির পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলনের ডাক দিয়েছে। দলটি জানিয়েছে, অক্টোবরজুড়ে দেশের বিভিন্ন শহরে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালনের পরিকল্পনা রয়েছে। সিজেপির আহ্বায়ক সৌরভ দাস বলেছেন, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। সংগঠনটির দাবি, ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম নিয়ে যে প্রশ্ন উঠেছে, তার জবাব দিতে হবে।
রাহুল-মমতার জ্ঞানেশবিরোধী অবস্থান
সিইসির বিরুদ্ধে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর অভিযোগও নতুন নয়। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগ করে আসছেন। তিনি ভোট চুরির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেছেন। বিরোধী দলের আরেক জ্যেষ্ঠ নেতা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সিইসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
বুধবার বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’ জানিয়েছে, আগামীতে তারা দেশজুড়ে প্রতিবাদ সমাবেশ করবে। প্রায় দুই ডজন দল নিয়ে গঠিত এই জোটের পক্ষ থেকে ৬ অক্টোবর দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে মিছিলের কর্মসূচিও ঘোষণা করা হয়েছে।
এদিকে দিল্লি ও মুম্বাইয়ের বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। একদিকে বিরোধী দল, ছাত্র সংগঠন ও সিজেপি ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে জবাবদিহি দাবি করছে; অন্যদিকে নির্বাচন কমিশন অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে সংশোধন কার্যক্রমকে নিয়মিত নির্বাচনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করছে। ফলে ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে বিরোধ আরো তীব্র হয়ে উঠেছে।