ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বহুল প্রত্যাশিত বাণিজ্য চুক্তি শিগগিরই সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার। বৃহস্পতিবার ভারতীয় সংবাদ সংস্থা এএনআইকে তিনি বলেন, চুক্তি ‘অবিলম্বে’ হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। তবে আলোচনায় কোন বিষয়গুলো এখনো বড় বাধা হয়ে আছে, তা দুই পক্ষই চিহ্নিত করতে পেরেছে বলে জানান তিনি।
গ্রিয়ার বলেন, ‘আমি মনে করি না যে এটি এখনই হওয়ার মতো কিছু।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, আলোচনার ক্ষেত্রে কোনো কোনো বিষয় নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, সেগুলোর একটি স্পষ্ট তালিকা ইতোমধ্যে তৈরি হয়েছে।
গ্রিয়ারের এই মন্তব্যের এক দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে ফোনে কথা হয়। গ্রিয়ার ওই আলোচনাকে ‘খুবই গঠনমূলক’ বলে উল্লেখ করেছেন। ফোনালাপে দুই নেতা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা এগিয়ে নেওয়ার চলমান প্রচেষ্টাও তাদের আলোচনায় উঠে আসে।
এদিকে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন ভারতের বাণিজ্যমন্ত্রী পীযূষ গোয়েল। তিনি মিলওয়াকিতে জি২০ বাণিজ্যমন্ত্রীদের বৈঠকে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি গ্রিয়ারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও করেছেন।
বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে গোয়েল আলোচনার বিষয়ে তুলনামূলক আশাবাদী সুরে কথা বলেন। তিনি জানান, ভারত-যুক্তরাষ্ট্র দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আওতায় উভয় দেশের জন্য লাভজনক একটি অন্তর্বর্তী চুক্তি দ্রুত সম্পন্ন করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের হুভার ইনস্টিটিউশনের ভিজিটিং ফেলো রোনাক ডি. দেশাইয়ের মতে, দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে মূলত দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য রয়েছে। তার ভাষায়, গোয়েল যেসব বিষয় ইতোমধ্যে সমাধান হয়েছে, সেগুলোকে সামনে আনছেন; অন্যদিকে গ্রিয়ার এখনো যেসব বিষয় অমীমাংসিত, সেগুলোকে গুরুত্ব দিচ্ছেন। তার মতে, যেকোনো বাণিজ্য চুক্তির শেষ পর্যায়ের বিষয়গুলোই সাধারণত সবচেয়ে কঠিন হয়ে থাকে।
রাশিয়ার তেল কেন বড় বাধা
আলোচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের জায়গাগুলোর একটি হলো রাশিয়া থেকে ভারতের তেল কেনা। ওয়াশিংটনের কাছে এটি বড় উদ্বেগের বিষয়। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অবস্থান অনুযায়ী, ভারতের রুশ তেল কেনা মস্কোর যুদ্ধ পরিচালনায় অর্থ জোগাচ্ছে।
অন্যদিকে নয়াদিল্লি বরাবরই বলে আসছে, জ্বালানি নিরাপত্তাই রাশিয়া থেকে তেল কেনার মূল কারণ। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে চাপ তৈরি হওয়ায় ভারতের পক্ষে রাশিয়ার সরবরাহ পুরোপুরি বাদ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভারতের বিরুদ্ধে রুশ তেল কেনা অব্যাহত রাখার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপের ঝুঁকিও রয়েছে। এমন পরিস্থিতি দুই দেশের চলমান বাণিজ্য আলোচনা আরো জটিল করে তুলতে পারে।
গত আগস্টে রুশ তেল কেনার কারণে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ অতিরিক্ত শাস্তিমূলক শুল্ক আরোপ করেছিল। এর ফলে ভারতীয় পণ্যের ওপর মোট শুল্কের হার ৫০ শতাংশে পৌঁছায়। পরে ফেব্রুয়ারিতে তা কমিয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়। সে সময় ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, ভারত রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও সম্ভাব্যভাবে ভেনেজুয়েলা থেকে আরো বেশি তেল কিনতে সম্মত হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের ওই বক্তব্যের বিস্তারিত ভারত সরকার সমর্থন করেনি। নয়াদিল্লি বরাবরই জ্বালানি নিরাপত্তাকে রুশ তেল আমদানির প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে।
কৃষি ও শুল্ক সুবিধা নিয়েও মতপার্থক্য
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ভারতের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো কৃষি খাতের রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো সুরক্ষিত রাখা। পাশাপাশি অন্য প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় ভারতীয় রপ্তানিকারকদের সুবিধা দেয়—এমন অগ্রাধিকারমূলক শুল্ক সুবিধা ধরে রাখতেও আগ্রহী নয়াদিল্লি।
কৌশলগত পরামর্শক প্রতিষ্ঠান টেনিওর দক্ষিণ এশিয়া-বিষয়ক উপদেষ্টা অর্পিত চতুর্বেদী মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে দুই দেশের বাণিজ্যিক পরিপূরকতার সীমাও হয়তো সামনে চলে এসেছে। তার মতে, এই মুহূর্তে কোনো পক্ষই অন্য পক্ষের অবস্থানের সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। আবার মতপার্থক্য রেখেই চুক্তিতে পৌঁছানোর মতো পরিস্থিতিও এখনো তৈরি হয়নি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে ভারতীয় পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক রয়েছে। ৬০টি দেশে জোরপূর্বক শ্রমসংক্রান্ত কর্মকাণ্ড, নীতি ও চর্চা নিয়ে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির দপ্তরের তদন্ত শেষ হওয়ার পর এই শুল্ক কাঠামো কার্যকর হয়েছে।
তবে ভারত সরকারের হিসাবে, যুক্তরাষ্ট্রে দেশটির রপ্তানির একটি উল্লেখযোগ্য অংশ—যেমন জেনেরিক ওষুধ ও স্মার্টফোন—এই ১০ শতাংশ শুল্কের আওতার বাইরে রয়েছে।
ফলে ট্রাম্প-মোদির সাম্প্রতিক ফোনালাপকে দুই পক্ষই ইতিবাচক হিসেবে তুলে ধরলেও, রুশ তেল, কৃষি সুরক্ষা ও শুল্ক সুবিধার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো এখনো সমাধান না হওয়ায় বহুল প্রত্যাশিত বাণিজ্য চুক্তির সময়সীমা নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।
সূত্র: সিএনবিসি
এআরবি