ভারতে প্রায় ছয় বছর ধরে কারাবন্দী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক নেতা উমর খালিদ মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। ঝুঁকির মধ্যে থাকা মানবাধিকারকর্মীদের সম্মান জানাতে দেওয়া ‘ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স অ্যাওয়ার্ড ২০২৬’-এর এশিয়া অঞ্চলের বিজয়ী নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) এক বিবৃতিতে আয়ারল্যান্ডভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্স এ ঘোষণা দেয়। সংস্থাটি বলেছে, কেউ কেউ খালিদকে ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ ও ‘দেশবিরোধী’ হিসেবে দেখলেও অন্যদের কাছে তিনি জাতীয় বীর, সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর এবং একজন মানবাধিকারকর্মী।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়, ভারতের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে অসাংবিধানিক ও মুসলিমবিরোধী বলে বিবেচিত পরিবর্তনগুলোর প্রতিবাদে গড়ে ওঠা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক নাগরিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে গত ছয় বছর ধরে কারাগারে রয়েছেন খালিদ।
২০২০ সালের দিল্লি দাঙ্গার মামলায় আটক
২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল উমর খালিদকে গ্রেপ্তার করে। উত্তর-পূর্ব দিল্লির দাঙ্গার বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের মামলায় তাকে ‘মূল ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারেই রয়েছেন।
তার বিরুদ্ধে বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইন (ইউএপিএ), রাষ্ট্রদ্রোহ এবং ভারতীয় দণ্ডবিধির হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ আরো ১৮টি ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। গ্রেপ্তারের সময় তিনি ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০১৯-২০ সালে নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-বিরোধী বিক্ষোভ সংগঠিত করায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি।
ফ্রন্ট লাইন ডিফেন্ডার্সের বিবৃতিতে ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর সিএএর সম্ভাব্য প্রভাবের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। সংস্থাটির মতে, হিন্দু জাতীয়তাবাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে আইনটি এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছে, যা মুসলিমদের নথিপত্র ও আইনি মর্যাদার ক্ষেত্রে অসম ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সংস্থাটি জানায়, শিক্ষার্থী, সংখ্যালঘু ও নাগরিকদের অধিকার রক্ষায় ধারাবাহিকভাবে কাজ করেছেন খালিদ। এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠস্বর হিসেবে তাকে বিবেচনা করা হয়। তার গ্রেপ্তার ও আটককে বেআইনি বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘের নির্বিচার আটকবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপও উদ্বেগ জানিয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
পুরস্কার নিতে অনুষ্ঠানে ছিলেন বাবা
২০২৬ সালের এই পুরস্কারে এশিয়া অঞ্চলে উমর খালিদ নির্বাচিত হলেও বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও মানবাধিকারকর্মীদের সম্মানিত করা হয়েছে। আফ্রিকা অঞ্চলে অ্যাঙ্গোলার লরিন্ডা ম্যানুয়েল গুভেইয়া, আমেরিকা অঞ্চলে ব্রাজিলের আদ্দা ভিক্টোরিয়া কায়েতানো, ইউরোপ ও মধ্য এশিয়ায় সার্বিয়ার লিলিয়ানা নেশিচ এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা অঞ্চলে ইরানের আহমদরেজা হায়েরি পুরস্কার পেয়েছেন।
আয়ারল্যান্ডের ডাবলিনে ট্রিনিটি কলেজে পুরস্কারপ্রাপ্তদের সম্মানে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে উমর খালিদের হয়ে উপস্থিত ছিলেন তার বাবা সৈয়দ কাসিম রাসুল ইলিয়াস।
জামিন পাননি খালিদ
দীর্ঘদিন কারাবন্দী থাকার মধ্যেও উমর খালিদের জামিনের আবেদন বারবার প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। গত ২০ সেপ্টেম্বর দিল্লি হাইকোর্ট ২০২০ সালের উত্তর-পূর্ব দিল্লি দাঙ্গার বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের মামলায় খালিদ ও শরজিল ইমাম—দুজনেরই জামিন আবেদন নাকচ করেন। শরজিল ইমামও ছয় বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দী রয়েছেন।
এর আগে গত ২২ মে মায়ের সঙ্গে দেখা করার জন্য খালিদকে তিন দিনের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন দিয়েছিলেন দিল্লি হাইকোর্ট। তার মায়ের অস্ত্রোপচার হয়েছিল। এর আগে ১৯ মে নিম্ন আদালত খালিদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল। ওই আবেদনে তিনি চাচার মৃত্যুর পর ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এবং ২ জুন মায়ের অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে তার পাশে থাকার অনুমতি চেয়েছিলেন।
দীর্ঘ কারাবাস ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিতর্কের মধ্যেই মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক এই স্বীকৃতি পেলেন উমর খালিদ।
সূত্র: দ্য ওয়্যার
এআরবি