ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে আন্দোলন, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত যন্তর-মন্তরকে বিক্ষোভের জন্য নির্ধারিত স্থানের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। এর পরিবর্তে রাজধানীর তিনটি বিকল্প স্থানে প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারের এ সিদ্ধান্তে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিরোধী রাজনৈতিক দল, ছাত্রসংগঠন ও অধিকারকর্মীরা বলছেন, এর ফলে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও সমাবেশের অধিকার সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দিল্লি পুলিশের নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে রাজধানীতে বিক্ষোভ-সমাবেশের জন্য নির্ধারিত স্থান হিসেবে ব্যবহার করা হবে রামলীলা ময়দান, উত্তর-পশ্চিম দিল্লির বুরারি ময়দান এবং পূর্ব দিল্লির সিবিডি ময়দান। ফলে ভারতের পার্লামেন্ট ও কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার কাছাকাছি অবস্থিত যন্তর-মন্তরে আর আগের মতো বিক্ষোভ আয়োজনের সুযোগ থাকছে না।
সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দিল্লি পুলিশ যন্তর-মন্তরকে বিক্ষোভের জন্য নির্ধারিত স্থানের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি জানায়। এর আগে ১১ অক্টোবর দিল্লি পুলিশ কমিশনার অনুরাগ কুমারের জারি করা এক স্থায়ী আদেশে নতুন স্থান নির্ধারণের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়।
নির্দেশনায় বলা হয়েছে, প্রতিবাদ কর্মসূচির জন্য বিকল্প স্থান পর্যালোচনা করতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নতুন তিনটি স্থানে বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য বিস্তারিত ও সংশোধিত নিয়মকানুন বা স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর (এসওপি) পরে জারি করা হবে।
কেন এই সিদ্ধান্ত, কেনই বা ক্ষোভ?
যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি চেয়ে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) সোমবার পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার দ্বারস্থ হওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। দলটির দাবি, যন্তর-মন্তরে প্রতিবাদ কর্মসূচি আয়োজনের অনুমতি দিতে হবে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে গত ২ অক্টোবর থেকে সেখানে আন্দোলন চালিয়ে আসছিল সিজেপি, বামপন্থি ছাত্রসংগঠন ও বিরোধী জোট ইন্ডিয়ার সংশ্লিষ্ট কর্মীরা।
গত ১০ অক্টোবর আন্দোলনকারীরা যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভ করতে গেলে দিল্লি পুলিশ তাদের সেখানে প্রবেশ করতে দেয়নি। এরপর বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের শুনানিতেও ওঠে। আবেদনকারীরা দাবি করেন, নির্ধারিত স্থানে শান্তিপূর্ণভাবে প্রতিবাদ করার সুযোগ দেওয়া উচিত।
দিল্লি পুলিশের নতুন নির্দেশনার পর সিজেপি একে অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যা দিয়েছে। দলটির মুখপাত্র সৌরভ দাস যন্তর-মন্তরে বিক্ষোভের অনুমতি দেওয়ার জন্য পুলিশকে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দিয়েছেন। তার ভাষ্য, এই সিদ্ধান্ত মানুষের শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়া ও প্রতিবাদ জানানোর মৌলিক অধিকারের ওপর আঘাত।
সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপও সরকারের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তার অভিযোগ, যন্তর-মন্তরকে বিক্ষোভের নির্ধারিত স্থান থেকে বাদ দেওয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিবাদের পরিসর সংকুচিত করা হচ্ছে।
বামপন্থি ছাত্রসংগঠন আইসার নেত্রী নেহা বোরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, যন্তর-মন্তর কেবল একটি জায়গা নয়, এটি মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতীক। এই স্থান ধরে রাখার জন্য তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন বলেও জানান তিনি।
সিজেপির সহ-সমন্বয়ক সৌরভ দাস প্রশ্ন তুলেছেন, যন্তর-মন্তরের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবাদস্থল সরিয়ে দেওয়ার আগে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো সংগঠন বা অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা করেছে কি না।
দলটির আইনি শাখার প্রধান রত্না সিংয়ের বক্তব্য, আগে অনুমতির জটিলতার কারণে বিক্ষোভে বাধা দেওয়ার অভিযোগ ছিল; এখন প্রতিবাদের স্থানটিই নির্ধারিত তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণও সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেছেন। তার মতে, বিক্ষোভের স্থান নির্ধারণের নামে মানুষকে শুধু নির্দিষ্ট জায়গার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়া ও প্রতিবাদ জানানো সাংবিধানিক অধিকার বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
কেন ঐতিহাসিক যন্তর-মন্তর গুরুত্বপূর্ণ?
দিল্লির যন্তর-মন্তর মূলত একটি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানমন্দির। তবে সময়ের সঙ্গে এটি ভারতের গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও নাগরিক প্রতিবাদের অন্যতম পরিচিত স্থানে পরিণত হয়েছে।
সিনিয়র সাংবাদিক ত্রিভুবনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ষাটের দশকের শেষভাগ থেকে আশির দশক পর্যন্ত দিল্লির বোট ক্লাব ছিল গণবিক্ষোভের প্রধান কেন্দ্র। পরে ১৯৯৩ সালের পর রাজনৈতিক উত্তেজনা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিবেচনায় তৎকালীন রাজপথ, বর্তমানে কর্তব্য পথ, থেকে প্রতিবাদ কর্মসূচি সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই প্রেক্ষাপটে যন্তর-মন্তর একটি মধ্যবর্তী বিকল্প হিসেবে গুরুত্ব পেতে শুরু করে।
স্থানটি একদিকে পার্লামেন্টের কাছাকাছি, অন্যদিকে কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক এলাকার মূল অংশের বাইরে। ফলে প্রতিবাদকারীরা নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারতেন, আবার প্রশাসনের পক্ষেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা তুলনামূলক সহজ ছিল।
তবে যন্তর-মন্তরে সমাবেশের ওপর আগে থেকেই কিছু বিধিনিষেধ ছিল। ২০০৩ সালের ৩১ জানুয়ারি জারি করা দিল্লি পুলিশের একটি স্থায়ী আদেশের উল্লেখ করে ২০১৫ সালে কেন্দ্রীয় সরকার লোকসভায় জানিয়েছিল, সেখানে পাঁচ হাজারের বেশি মানুষের সমাবেশ হওয়া উচিত নয়। বিক্ষোভকারীদের যানবাহন নিয়ে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ ছিল।
পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার নথির ভিত্তিতে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের আগস্ট পর্যন্ত যন্তর-মন্তরে অন্তত ১৩ হাজার ১১৮টি অবস্থান কর্মসূচি এবং পাঁচ হাজার ৪৯১টি বিক্ষোভ, সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শুধু ২০১০ সালের প্রথম আট মাসেই বিভিন্ন কর্মসূচিতে প্রায় দেড় লাখ মানুষ অংশ নেন। এ সময়ে আইন ভঙ্গের অভিযোগে ১২ হাজারের বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছিল বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
এআরবি