যুক্তরাষ্ট্রের নতুন নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর আগ্রহের কথা জানিয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে তিনি বলেছেন, আগামী দিনে দুই দেশের বাণিজ্য আরো বাড়ানো ও বহুমুখী করতে চায় ভারত।
বৈঠকের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে মোদি বলেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব আরো শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি তিনি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আগামী দিনে আমরা আমাদের বাণিজ্যিক পণ্যের পরিধি বাড়াতে এবং তা বহুমুখী করতে চাই।
মোদির এই বক্তব্য এসেছে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে লক্ষ্য করে ‘অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট’ নামে অর্থনৈতিক অভিযান শুরুর মাত্র সাত দিন পর। ওয়াশিংটন এই অভিযানের আওতায় ইরানের সামরিক কার্যক্রম, জ্বালানি ও পেট্রোকেমিক্যাল বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে চাপ বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা বিদেশি পক্ষগুলোর ওপরও নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকটি ছিল ছয় মাস আগে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের পর দুই নেতার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ। বৈঠকে আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
মোদি বলেন, দীর্ঘস্থায়ী শান্তি নিশ্চিত করতে যেকোনো ধরনের প্রচেষ্টাকে ভারত সমর্থন করে যাবে।
নিষেধাজ্ঞার মধ্যে বাণিজ্য বাড়ানোর পথ খুঁজছে দিল্লি
ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য কীভাবে বাড়ানো হবে, সে বিষয়ে মোদি বিস্তারিত কিছু বলেননি। তবে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রিকে এ নিয়ে প্রশ্ন করা হয়।
মিশ্রি বলেন, প্রধানমন্ত্রী এমন নতুন সম্ভাবনা খুঁজে দেখার কথা বলেছেন, যেগুলো ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
এ ক্ষেত্রে অর্থায়ন, বিমা, পরিবহন ও লজিস্টিক ব্যবস্থার বিষয়গুলো বিবেচনায় নিতে হবে বলে জানান তিনি।
বর্তমানে ভারত ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্য বেসরকারি পক্ষগুলোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থার বিভিন্ন বিধিনিষেধ মেনেই ব্যবসা করতে হয়।
ঐতিহাসিকভাবে ইরানের সঙ্গে ভারতের বড় বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার কারণে তা অনেক কমেছে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ছিল ১৭ দশমিক ০৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৬৩ বিলিয়ন ডলারে।
চাবাহার বন্দর নিয়ে দিল্লির ভাবনা
ইরানের সঙ্গে পরিবহন ও সামুদ্রিক সহযোগিতার প্রসঙ্গে চাবাহার বন্দরের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই বন্দরের সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে।
মিশ্রি বলেন, ভারত বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। চাবাহার বন্দরের ভূমিকা বিবেচনায় নিয়ে একটি ‘টেকসই পথ’ খুঁজে বের করাই এর লক্ষ্য।
চাবাহার বন্দরের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া নিষেধাজ্ঞা থেকে ভারতের পাওয়া ছাড়ের মেয়াদ ২৬ এপ্রিল শেষ হয়েছে। চাবাহারে ভারত উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিনিয়োগ করেছে।
ভারতে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস পেজেশকিয়ানের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেছে, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিক এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট অন্যান্য ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা বাড়ানোর ব্যাপক সুযোগ রয়েছে।
দূতাবাসের ভাষ্য, দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা শক্তিশালী করার পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলা করতে পারলে ভারত ও ইরানের সম্পর্ক আরও উচ্চ পর্যায়ে নেওয়া সম্ভব।
পেজেশকিয়ান মোদিকে আরো অনুরোধ করেছেন, বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ভারতের বিস্তৃত যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে ইরানকে যুদ্ধ ও রক্তপাতের পথ থেকে সরে এসে সংলাপ ও সমঝোতার পথে ফিরতে সহায়তা করতে।
পুতিনের সঙ্গে বৈঠকে বাণিজ্য ঘাটতি
বিশকেকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গেও দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন মোদি। চলতি বছরে দুই নেতার এটি ছিল প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ।
বৈঠকে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে বাড়তে থাকা বাণিজ্য ঘাটতির বিষয়টি উঠে আসে বলে জানান বিক্রম মিশ্রি। বিশেষ করে রাশিয়া থেকে ভারতের বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল কেনার পর এই ঘাটতি বেড়েছে।
মিশ্রি বলেন, উভয় পক্ষই বিষয়টি স্বীকার করেছে। বিভিন্ন খাতে রাশিয়ায় ভারতের রপ্তানি বাড়ানোর বিষয়েও আলোচনা চলছে।
তিনি জানান, গত বছর পুতিন বার্ষিক শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে গেলে মোদি তাকে একটি নথি দিয়েছিলেন। এতে রাশিয়ার বাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশের ক্ষেত্রে বিদ্যমান সমস্যাগুলো তুলে ধরা হয়েছিল। এর মধ্যে কিছু অশুল্ক বাধার বিষয়ও ছিল।
মিশ্রির ভাষ্য, রুশ বন্ধুদের সহযোগিতায় এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। মাংস, সামুদ্রিক পণ্য ও কিছু দুগ্ধজাত পণ্যসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের রাশিয়ার বাজারে প্রবেশের সুযোগও উল্লেখযোগ্যভাবে উন্নত হয়েছে।
সূত্র: টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া