অবিভক্ত বাংলার অবিসংবাদিত নেতা, কৃষকের পরম বন্ধু এবং অবিভক্ত বাংলার সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক। তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্বের অনুরাগী ছিলেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম, বিজ্ঞানী প্রফুল্ল চন্দ্র রায় থেকে শুরু করে ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিরা। অথচ আজ কলকাতাতেই চরম অবহেলার শিকার এই মহান নেতার স্মৃতি। তার স্মৃতিবিজড়িত ঐতিহাসিক বাসভবনটি এখন বেদখল অবস্থায় পড়ে আছে। বাড়িটি পরিণত হয়েছে দুষ্কৃতীদের আড্ডাস্থলে। উদাসীনতায় চোখের সামনেই যেন মুছে যাচ্ছে বাংলার ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
কলকাতার পার্ক সার্কাসসংলগ্ন ঝাউতলায় একটি ছোট সড়কের নাম ‘ফজলুল হক সরণি’। এই সড়কের ৮৮/২ নম্বর ঠিকানায় দাঁড়িয়ে আছে শেরেবাংলার সেই ঐতিহাসিক রাজকীয় বাড়ি, যেখান থেকে একসময় পরিচালিত হতো বাংলার রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কর্মকাণ্ড এবং নেওয়া হতো নানা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। অথচ বর্তমানে বাড়িটিতে গেলে শেরেবাংলার স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা হিসেবে চেনার উপায় নেই। সেখানে নেই কোনো পরিচিতিমূলক নামফলক, নেই স্মৃতি সংরক্ষণে সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো উদ্যোগ।
শেরেবাংলার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল কলকাতার স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লেডি ব্রেবোর্ন কলেজ। অথচ এই প্রতিষ্ঠানসংলগ্ন এলাকায়ও তার স্মৃতি ধরে রাখার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ নেই। বরং কলেজের সামনের সড়কটির নাম সোহরাওয়ার্দী অ্যাভিনিউ থেকে পরিবর্তন করে বিজেপি সরকার গোপাল পাঁঠা নামে পরিচিত গোপাল মুখোপাধ্যায়ের নামে করেছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য পাওয়া গেছে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের (কেএমসি) নথিতে। একসময় বাড়িটি করপোরেশনের ঐতিহ্যবাহী ভবনের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু কোনো এক অজ্ঞাত কারণে বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী ভবনের তালিকার কোনো গ্রেডেই এর নাম নেই। সংরক্ষণের অভাব ও প্রশাসনের উদাসীনতায় বাড়িটি এখন কার্যত বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানা এবং দুষ্কৃতীদের বিচরণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
সরকারি নথি অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেরেবাংলার ঐতিহাসিক বাসভবনের ঠিকানা—৮৮/২ ফজলুল হক সরণি, কলকাতা-৭০০০১৭—ব্যবহার করে একাধিক প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি ও স্থানীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন রয়েছে। এই ঠিকানায় কার্যক্রম চালাচ্ছে ‘এন্ডেভার লজিস্টিকস প্রাইভেট লিমিটেড’, ‘এসএসএম বিল্ডকন প্রাইভেট লিমিটেড’-এর মতো নির্মাণপ্রতিষ্ঠান এবং ‘স্পেড ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ইনফ্রা প্রাইভেট লিমিটেড’-এর মতো করপোরেট প্রতিষ্ঠান। এমনকি বাড়িটির একাংশে রয়েছে ‘নিউ আজমাইশ লেডিজ টেইলার্স’ নামে একটি দোকান। যে বাড়িতে বসে একসময় বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো, সেই বাড়ি আজ কয়েকটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কার্যালয় ও ঠিকানায় পরিণত হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ সরকার ও কলকাতা পৌরসভার এই উদাসীনতা এবং ইতিহাসের প্রতি অবহেলাকে কেবল সাধারণ অবহেলা নয়, বরং ঐতিহাসিক অন্যায় হিসেবে দেখছেন অনেকে। হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে বাঙালির কাছে শ্রদ্ধেয় এই নেতার বাসভবন কলকাতার বুকে এমন করুণ অবস্থায় পড়ে আছে কেন, সেই প্রশ্নও উঠেছে। এটি কি নিছক প্রশাসনিক অবহেলা, নাকি অবিভক্ত বাংলার এই প্রভাবশালী নেতার স্মৃতিচিহ্ন মুছে যাওয়ার পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে? ঐতিহ্যবাহী ভবনের তালিকা থেকে বাদ পড়ার ফলে
কি বাড়িটির বাণিজ্যিক ব্যবহার আরও সহজ হয়েছে? এসব প্রশ্নেরও স্পষ্ট উত্তর মেলেনি।
বাংলার মানুষের কাছে ‘শেরেবাংলা’ হিসেবে পরিচিত এ কে ফজলুল হকের ঐতিহাসিক বাসভবনের এমন বেহাল দশা ইতিহাস প্রেমীদের কাছে গভীর হতাশার বিষয়। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক অমিত দে এ নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, বাঙালি আত্মবিস্মৃত জাতি; তারা প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিদের ভুলে যায়। তাদের স্মৃতি রক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেই।
ফজলুল হকের সঙ্গে নিজের পারিবারিক সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে অমিত দে বলেন, ফজলুল হকের ভাগনির সঙ্গে তার বাবা অধ্যাপক অমলেন্দু দের বিয়ে হয়েছিল। তিনি তাদেরই সন্তান। অথচ ফজলুল হকের স্মৃতি রক্ষায় তারা কিছুই করতে পারছেন না। তার মতে, সরকারি উদ্যোগ ছাড়া এই ঐতিহাসিক বাড়ি রক্ষা করা সম্ভব নয়।