জেন-জি আন্দোলনে নতুন করে আলোচনায় দিল্লির ঐতিহাসিক মানমন্দির, বছরের পর বছর ধরে এখানে ন্যায়বিচার ও অধিকার আদায়ের দাবিতে আন্দোলন করছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ
মহাকাশের গতি ও সময় মাপতে ১৭২৪ সালে দিল্লিতে গড়ে তোলা হয়েছিল যন্তর মন্তর। প্রায় তিন শতাব্দী পর ২০২৬ সালে আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় এসেছে ঐতিহাসিক এই মানমন্দির। তবে এবার জ্যোতির্বিজ্ঞানের জন্য নয়, আলোচনার কেন্দ্রে এর রাজনৈতিক ভূমিকা। এর পেছনে রয়েছে জেন-জি আন্দোলন।
দিল্লির কনট প্লেসের ঔপনিবেশিক আমলের সাদা ভবন ছাড়িয়ে সূর্যের আলো যখন আরও ওপরে ওঠে, তখন সেই আলোর ছায়া পড়ে যন্তর মন্তরের লাল পাথরের স্থাপনাগুলোয়। সূর্যের অবস্থান ও গতিবিধি পরিমাপের জন্য তৈরি এই স্থাপত্য দীর্ঘদিন ধরে সময় নির্ণয়ের কাজ করেছে। কিন্তু এর আশপাশের সড়কে এখন সময়ের আরেক হিসাব চলছে। সেখানে মানুষ হিসাব কষছেন তাঁদের হারানো যৌবন, অপূর্ণ স্বপ্ন, বেকারত্ব এবং ন্যায়বিচারের অপেক্ষার।
অনশন, পুলিশি হেফাজত, সরকারি আশ্বাস আর দীর্ঘ প্রতীক্ষার মধ্য দিয়ে বছরের পর বছর কেটে যাচ্ছে আন্দোলনকারীদের। চাকরি, ন্যায়বিচার ও অধিকার আদায়ের দাবিতে তাঁদের অনেকে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছেন এই যন্তর মন্তরেই।
অশোকা রোড ও টলস্টয় মার্গের মাঝখানের বাঁকানো এই সড়ক ভারতের রাজধানীতে প্রতিবাদের গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ হয়ে উঠেছে। ক্ষমতার কেন্দ্রের এত কাছে এবং সবার নজরে থাকার কারণে জায়গাটিকে উপেক্ষা করা কঠিন। গত কয়েক মাসে জেন-জি আন্দোলন এই পুরোনো প্রতিবাদস্থলে নতুন গতি এনেছে। ২০২৬ সালের মে মাসে অনলাইনে জন্ম নেওয়া ব্যঙ্গাত্মক প্রতিক্রিয়া থেকে গড়ে ওঠা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র আন্দোলনের ঢেউও আছড়ে পড়েছে এই ঐতিহাসিক চত্বরে।
যন্তর মন্তরে প্রতিটি প্রতিবাদ নতুন প্রশ্ন সামনে আনে। এর দুটি পরিচয়—জ্যোতির্বিজ্ঞানের গবেষণাকেন্দ্র এবং গণআন্দোলনের মঞ্চ—আপাতদৃষ্টিতে আলাদা। কিন্তু দুটির মধ্যেই রয়েছে মানুষের চারপাশের ঘটনা বোঝার এবং সেগুলোর কারণ খুঁজে বের করার চেষ্টা।
যন্তর মন্তর তাই কেবল প্রতিবাদের স্থান নয়; এটি স্বাধীন ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উন্মুক্ত আর্কাইভ। নর্মদা অববাহিকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ, খরা ও ঋণে জর্জরিত কৃষক, নারী নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলনকারী তরুণ, পদকজয়ী সেনাসদস্য ও কুস্তিগীর, কর্মচারী, শিক্ষক, চিকিৎসক এবং শিক্ষার্থীরা এখানে এসেছেন। এসেছে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংগঠন। আবার এমন মানুষও এখানে হাজির হয়েছেন, যাদের সম্বল ছিল শুধু নিজেদের দুঃখ-কষ্টের কথা জানানোর আকুতি।
এখানে মানুষের ভিড় বাড়লে তা প্রতিষ্ঠান ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগের সংকটের ইঙ্গিত দিতে পারে। তরুণেরা যখন প্রশ্ন নিয়ে বসেন, তখন সেই সংকট কেবল কোনো মন্ত্রী, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ছন্দপতনের দিকেও ইঙ্গিত করে। কোনো শিক্ষার্থী যখন প্রশ্ন করেন, ‘আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?’, তখন তিনি শুধু সরকারের কাছে উত্তর চান না; রাষ্ট্রের কাছেও নিজের হারানো সময়ের হিসাব চান।
কীভাবে আন্দোলনের কেন্দ্রে পরিণত হলো যন্তর মন্তর
যন্তর মন্তরের আগে দিল্লিতে বড় প্রতিবাদস্থল ছিল রাজপথের (বর্তমানে কর্তব্য পথ) কাছে বোট ক্লাবের লন। সংসদ ভবন, রাষ্ট্রপতি ভবন এবং নর্থ ও সাউথ ব্লকের কাছাকাছি হওয়ায় ক্ষমতাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য জায়গাটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৮৮ সালে কৃষক নেতা মহেন্দ্র সিং টিকাইতের নেতৃত্বে হাজার হাজার কৃষক এক সপ্তাহ ধরে এলাকাটি ঘিরে রাখেন। তাঁরা সেখানে তাঁবু খাটান, রান্না করেন, গবাদিপশু নিয়ে আসেন এবং দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত অবস্থান চালিয়ে যান। তাঁদের এই বিশাল সমাবেশ সরকারকে চাপে ফেলে।
১৯৬০-এর দশকের শেষভাগ থেকে ১৯৮০-এর দশক পর্যন্ত বোট ক্লাব ছিল ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের অন্যতম প্রধান মঞ্চ। তবে ১৯৯৩ সাল নাগাদ, বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়তে থাকলে প্রশাসন রাজপথ থেকে বিক্ষোভ সরিয়ে নিতে শুরু করে।
এ সময় যন্তর মন্তর বিকল্প প্রতিবাদস্থল হিসেবে গুরুত্ব পায়। এটি সংসদের কাছাকাছি, কিন্তু একেবারে পাশে নয়। জনসাধারণের নজরে থাকা সত্ত্বেও জায়গাটি প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
তবে যন্তর মন্তরের গুরুত্ব শুধু প্রতিবাদের মঞ্চ কিংবা প্রাচীন স্থাপত্য হিসেবে নয়। লেখক সালমান রুশদি কিছুদিন আগে যন্তর মন্তর নিয়ে নিজের একটি লেখার কথা উল্লেখ করেন। তিনি জানান, তাঁর বন্ধু আলোকচিত্রী সাইমন চ্যাপুট এই স্থানের একটি চমৎকার আলোকচিত্র সিরিজ তৈরি করেছিলেন। সেই ছবিগুলো সীমিত সংস্করণের একটি শিল্পবিষয়ক বইয়ে সংকলিত হলে তিনি সেগুলোর সঙ্গে একটি গল্প লেখেন। সীমিত সংস্করণের ওই বই ছাড়া গল্পটি আগে আর কোথাও প্রকাশিত হয়নি।
আকাশের গতি থেকে রাষ্ট্র ও নাগরিকের দূরত্ব
বিখ্যাত লেখক পল লুন্ডে তার ‘জয় সিং অ্যান্ড দ্য যন্তর মন্তর’ বইয়ে লিখেছেন, ইউরোপের জেসুইট মিশনারিরা যখন কোপারনিকাস, টাইকো ব্রাহে ও গ্যালিলিওর মতো জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের ধর্মদ্রোহী মনে করতেন, তখন সওয়াই জয় সিং বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কাজে নিয়োজিত ছিলেন।
যন্তর মন্তরের ‘সম্রাট জয়প্রকাশ যন্ত্র’ একসময় পৃথিবীর সঙ্গে মহাজাগতিক গতির সম্পর্ক পরিমাপ করত। এখন এই স্থাপনার আশপাশে আন্দোলনকারীরা যেন রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্বের হিসাব তুলে ধরছেন।
জয়প্রকাশ যন্ত্র আকাশের উল্টো মানচিত্র পৃথিবীর বুকে তুলে ধরতে পারত। একইভাবে যন্তর মন্তরের প্রতিবাদস্থল ভারতের গণতন্ত্রের এক বিপরীত চিত্র দেখায়। সংবিধান যেখানে জনগণকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী বলে স্বীকৃতি দেয়, সেখানে নিজেদের মত প্রকাশের জন্য নাগরিকদের নানা বাধা, অনুমতি ও সময়সীমা পেরোতে হয়।
কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেজ অব আর্কিটেকচার, আর্ট অ্যান্ড প্ল্যানিংয়ের সহযোগী অধ্যাপক এমেরিটাস ব্যারি পার্লাস তার ‘সেলেস্টিয়াল মিরর: দ্য অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরিজ অব জয় সিং’ বইয়ে যন্তর মন্তরের স্থাপত্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এটি শুধু পাথরের তৈরি কোনো যন্ত্র নয়; বরং বিশাল জ্যামিতিক কাঠামোর এমন এক সমন্বয়, যা স্বর্গকে পৃথিবীতে নামিয়ে আনে। জয় সিং স্থাপত্যকে বিজ্ঞানের যন্ত্রে রূপ দিয়েছিলেন।
স্থপতি ও ইতিহাসবিদ অনীশা শেখর মুখার্জিও তার ‘যন্তর মন্তর: মহারাজা সওয়াই জয় সিংস ল্যাবরেটরি ইন দিল্লি’ বইয়ে এই স্থাপত্যের বিশেষত্ব তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, দিল্লির যন্তর মন্তর একটি ধাঁধার মতো। এর বিশাল স্থাপত্য প্রথম দর্শনে বিমূর্ত ভাস্কর্য মনে হলেও প্রতিটি কাঠামো তৈরি হয়েছিল বিজ্ঞানের প্রয়োজনে। এগুলোর সাহায্যে খালি চোখে সময় ও মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব।
এই বৈজ্ঞানিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি যন্তর মন্তর ভারতের রাজনৈতিক পরিসর হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। এখানে দেশের সবচেয়ে ক্ষমতাহীন নাগরিকেরাও ক্ষমতার দরজায় কড়া নেড়ে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেন।
স্বাধীনতার পর প্রতিবাদের নতুন জীবন
যন্তর মন্তর যে প্রতিবাদের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, তা অষ্টাদশ শতাব্দীর মূল নকশার অংশ ছিল না। ভারতের স্বাধীনতা এবং নয়াদিল্লিতে প্রশাসনিক ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার পর এই স্থানের নতুন ভূমিকা তৈরি হয়।
১৯১১ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য দিল্লিকে দেশের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলে। এর মাধ্যমে কলকাতার রাজনৈতিক অস্থিরতা, আঞ্চলিক প্রভাব এবং জাতীয়তাবাদী জনতার ভিড় থেকে প্রশাসনিক কেন্দ্রকে দূরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ইতিহাস গবেষক হারলিন কাউরের গবেষণায় পার্লামেন্ট স্ট্রিট, বোট ক্লাব, রামলীলা ময়দান ও যন্তর মন্তরের মতো স্থানকে জনপরিসরের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মানুষের উপস্থিতিই এসব স্থানকে প্রতিবাদের মঞ্চে পরিণত করেছে। সরকারের অনুমতি, নিষেধাজ্ঞা ও পুলিশি নিয়ন্ত্রণও এসব স্থানের রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করেছে।
২০১৭ সালে জাতীয় পরিবেশ আদালত পরিবেশগত ও নাগরিক উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে যন্তর মন্তরে প্রতিবাদে নিষেধাজ্ঞা দেয়। প্রায় চার কিলোমিটার দূরে রামলীলা ময়দানকে অবস্থান কর্মসূচির নতুন আনুষ্ঠানিক স্থান হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পুষ্পাঞ্জলি ঝার গবেষণায় যন্তর মন্তরের রাজনৈতিক গুরুত্বের একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক চিত্র পাওয়া যায়। পার্লামেন্ট স্ট্রিট থানার নথির ওপর ভিত্তি করে করা সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১০ সালের আগস্ট পর্যন্ত যন্তর মন্তরে অন্তত ১৩ হাজার ১১৮টি ধর্না এবং ৫ হাজার ৪৯১টি বিক্ষোভ, সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
শুধু ২০১০ সালের প্রথম আট মাসেই বিভিন্ন বিক্ষোভে প্রায় দেড় লাখ মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে আটক করা হয়েছিল ১২ হাজারের বেশি মানুষকে।
এই পরিসংখ্যানের অর্থ এই নয় যে প্রতিদিনই সেখানে বিশাল কোনো আন্দোলন হয়েছে। বরং এর মধ্য দিয়ে বোঝা যায়, ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় প্রতিদিনই ছোট ছোট জনগোষ্ঠী নিজেদের অভিযোগ ও দাবি নিয়ে রাজধানীতে আসত।
গবেষক অনিল সিনহা যন্তর মন্তরকে একটি ‘গণতান্ত্রিক পরিসর’ হিসেবে দেখেছেন। রাষ্ট্রের বাইরে থেকেও এই পরিসর রাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে। জনগণই একে বেছে নিয়েছে, নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে এবং সময়ের সঙ্গে বারবার নতুন রূপ দিয়েছে।
যে আন্দোলনগুলো যন্তর মন্তরকে স্মরণীয় করেছে
ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী অঁরি লেফেভর তার ‘রাইট টু দ্য সিটি’ বইয়ে শহরের অধিকার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, শহর শুধু বসবাস বা দখলের জায়গা নয়। সেখানে উপস্থিত থাকা, শহরকে ব্যবহার করা এবং জীবনের হারানো অধিকার পুনরুদ্ধার করাও মানুষের অধিকার।
ক্ষমতা সংসদ, মন্ত্রণালয়, প্রশাসন, পুলিশ ও সরকারি কাঠামোর মাধ্যমে নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। অন্যদিকে ক্ষমতাহীন নাগরিকেরা নিজেদের শরীর, পোস্টার, স্লোগান এবং রাস্তায় কাটানো সময়ের মধ্য দিয়ে উপস্থিতি জানান দেন। ডিজিটাল মাধ্যম এই যোগাযোগকে এগিয়ে নিতে পারে, কিন্তু রাস্তায় সশরীরে উপস্থিত থাকার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।
১৯৯০-এর দশকে নর্মদা বাঁচাও আন্দোলনের কর্মীরা যন্তর মন্তরকে বড় বাঁধকেন্দ্রিক উন্নয়নের আড়ালে চাপা পড়ে থাকা মানুষের দুর্দশা তুলে ধরার মঞ্চে পরিণত করেন। বড় বাঁধ নির্মাণের কারণে গ্রাম হারানো, আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বাস্তুচ্যুতি এবং অপর্যাপ্ত পুনর্বাসনের বিষয়গুলো তারা সামনে আনেন। মেধা পাটকর ও তার সহকর্মীরা প্রত্যন্ত নদী উপত্যকার মানুষের সমস্যাকে সংসদের সামনে তুলে ধরেন।
নর্মদার তীরে উন্নয়নের নামে ভিটেমাটি হারানো মানুষ রাজধানীর রাজনৈতিক মানচিত্রে নিজেদের জায়গা করে নেন।
২০১১ সালে আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন যন্তর মন্তরকে টেলিভিশন যুগের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করে। ওই বছরের ৫ এপ্রিল শুরু হওয়া অনশন আন্দোলনের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সাদা গান্ধী টুপি, ত্রিবর্ণ পতাকা, মোমবাতি এবং ‘আমি আন্না’ স্লোগান হয়ে ওঠে আন্দোলনের পরিচিত প্রতীক।
২০১২ সালের ডিসেম্বরে দিল্লিতে এক তরুণীকে গণধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর তরুণ-তরুণীরা ইন্ডিয়া গেট, রাইসিনা হিল ও যন্তর মন্তরে জড়ো হন। কোনো একক নেতার নেতৃত্বে পরিচালিত ওই সমাবেশ ছিল না নাগরিকদের প্রতিবাদ। বরং ভয়, শোক, অপমান ও ক্ষোভ থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাঁরা রাস্তায় নেমেছিলেন।
২০১৫ সালে সাবেক সেনাসদস্যরা ‘এক পদ, এক পেনশন’ দাবিতে যন্তর মন্তরে মাসের পর মাস অবস্থান করেন। এ সময় তাঁরা নিজেদের পদক সরিয়ে রেখে প্রতিবাদ জানান।
২০১৭ সালে তামিলনাড়ুর খরাকবলিত কৃষকেরা নিজেদের দুর্দশার কথা জানাতে দিল্লিতে আসেন। তারা দাবি করেন, অন্য কৃষকদের মাথার খুলি সঙ্গে নিয়ে এসেছেন। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে তারা অর্ধনগ্ন অবস্থায় থাকেন, ঘাস খান এবং দাঁত দিয়ে ইঁদুর ধরেন। এভাবে নিজেদের শরীরকেই কৃষিসংকটের এক প্রকাশ্য দলিলে পরিণত করেন।
তবে দীর্ঘস্থায়ী এসব বিক্ষোভের প্রভাব পড়েছিল আশপাশের বাসিন্দাদের জীবনেও। যন্তর মন্তর রোডের বাসিন্দারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘ সময় ধরে লাউডস্পিকার ব্যবহার, যান চলাচল বন্ধ রাখা, অস্থায়ী কাঠামো নির্মাণ, রান্না এবং রাতযাপনের কারণে শব্দদূষণ ও অন্যান্য সমস্যা তৈরি হচ্ছিল। এতে তাদের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছিল।
২০১৭ সালের অক্টোবরে জাতীয় পরিবেশ আদালত যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ বন্ধ করে সেগুলো রামলীলা ময়দানে সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেয়। বিষয়টি পরে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়।
২০১৮ সালের ২৩ জুলাই ‘মজদুর কিষাণ শক্তি সংগঠন বনাম ভারত সরকার’ মামলায় আদালত শান্তিপূর্ণ সমাবেশের সাংবিধানিক অধিকার এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রাখার ওপর জোর দেন।
গণতান্ত্রিক রাজধানীকে নিষেধাজ্ঞার স্থায়ী দুর্গে পরিণত করা যায় না। একই সঙ্গে প্রতিবাদের স্বাধীনতাও অন্য নাগরিকদের জীবন অনির্দিষ্টকাল ধরে ব্যাহত করার অবাধ অনুমতি হতে পারে না। এই দুই অধিকারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই গণতন্ত্রের অন্যতম চ্যালেঞ্জ।
যন্তর মন্তরের ইতিহাস তাই কেবল পাথরের তৈরি জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক স্থাপনার ইতিহাস নয়। এটি রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্ক, অধিকার আদায়ের লড়াই এবং গণতন্ত্রের কার্যকারিতা বোঝারও একটি জানালা। একসময় যে স্থাপনা আকাশের গতি মাপত, তার পাশের সড়ক এখন যেন মাপছে গণতন্ত্রের স্পন্দন—রাষ্ট্র কতটা শুনছে মানুষের কথা, আর মানুষকে নিজের কথা বলার জন্য কতটা পথ পেরোতে হচ্ছে।
এএম