ভারতে চলতি বছর শিল্প, সাহিত্য ও সমাজসেবার ক্ষেত্রে মোট ১৩৩ জন কৃতী ব্যক্তিত্বকে পদ্ম নাগরিক সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে, যার মধ্যে মুসলিম ব্যক্তিত্বদের অসামান্য অবদান বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। যদিও তা সংখ্যায় মাত্র পাঁচ।
এ তালিকায় ভারত আবার তার বৈচিত্র্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ ভারতীয় চলচ্চিত্রের মহিরুহ মামুট্টিকে পদ্মভূষণ দিয়ে সম্মানিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে রাজস্থানের গাফফারুদ্দিন মেওয়াতি যোগী বা গুজরাটের হাজিভাই কাসামভাইয়ের মতো শিল্পীরা পদ্মশ্রী পেয়ে প্রান্তিক সংস্কৃতিকে মূলধারায় নিয়ে এসেছেন। নুরুদ্দিন আহমেদের ভাস্কর্য কিংবা অধ্যাপক শফি শৌকের সাহিত্য সাধনা প্রমাণ করে, জ্ঞান ও শিল্পের কোনো ধর্মীয় সীমানা নেই। কিন্তু এই আপাত উজ্জ্বল তালিকার গভীরে তাকালে কিছু অস্বস্তিকর প্রশ্নও সামনে আসে।
১৩৩ জনের এ বিশাল তালিকার দিকে চোখ রাখলে দেখা যায় মুসলিম ব্যক্তিত্বের সংখ্যা মাত্র পাঁচ। ভারতের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ যেখানে মুসলিম সম্প্রদায়, সেখানে এই অতি সামান্য প্রতিনিধিত্ব কি কেবলই কাকতালীয়? প্রশ্নটি আরো জোরালো হয়ে ওঠে যখন আমরা দেশের বর্তমান সামাজিক পরিস্থিতির দিকে তাকাই। খবরের কাগজে যখন প্রায়ই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের ওপর হিংসা বা গণপিটুনির মতো ঘটনার শিরোনাম দেখি, তখন জাতীয় পুরস্কারের এ সংখ্যাতাত্ত্বিক ভারসাম্যহীনতা সাধারণ মানুষের মনে নানা দ্বিধা তৈরি করে। ভারতের মতো বিশাল দেশে কি মাত্র পাঁচজন মুসলিম গুণী মানুষের সন্ধান পাওয়া সম্ভব ছিল? অবশ্যই নয়। বিজ্ঞান থেকে সমাজসেবা আর শিল্প থেকে অর্থনীতিÑপ্রতিটি ক্ষেত্রে মুসলিম সম্প্রদায়ের অগণিত প্রতিভা নিরলসভাবে দেশের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।
এই স্বল্প প্রতিনিধিত্ব কি তবে একটি বৃহত্তর উদাসীনতার সংকেত? জাতীয় পুরস্কার কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়; বরং এটি রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রের একটি বড় বিজ্ঞাপন। যখন দেশের একটি বড় অংশ নিজেদের এই রাষ্ট্রীয় উৎসবে ব্রাত্য মনে করে, তখন সামাজিক সংহতির ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে। গুণী মানুষের অভাব ভারতে কোনোকালেই ছিল না এবং আজও নেই। তবে তাদের খুঁজে বের করা এবং যথোপযুক্ত সম্মান দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছার অভাব হয়তো রয়েই গেছে। যে দেশে গাফফারুদ্দিন মেওয়াতি যোগী মহাভারতের গান গেয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির পাঠ দেন, সে দেশে রাষ্ট্রকেও আরো বেশি উদার ও সমদর্শী হওয়া প্রয়োজন। প্রতিভা কেবল ধর্মের ঊর্ধ্বে থাকলেই হবে না, রাষ্ট্রকেও প্রমাণ করতে হবে তার স্বীকৃতির চোখ কোনো বিশেষ চশমায় আবদ্ধ নয়। নতুবা এ সম্মাননা কেবল গুটিকয়েক মানুষের প্রাপ্তি হয়েই থাকবে, বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে আস্থা ফেরাতে পারবে না।
দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার অবিসংবাদিত নায়ক মামুট্টিকে এ বছর পদ্মভূষণ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছে। দীর্ঘ পাঁচ দশকের অভিনয় জীবনে ৪০০-এর বেশি চলচ্চিত্রে অভিনয় করা এই শিল্পী কেবল কেরালার নন; বরং সমগ্র ভারতের চলচ্চিত্র জগতের এক মহিরুহ। তার অসাধারণ অভিনয় দক্ষতা এবং শিল্পের প্রতি নিবেদন তাকে দেশের তৃতীয় সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মানের যোগ্য করে তুলেছে।
শিল্পকলা ও লোকসংস্কৃতি রক্ষায় রাজস্থানের গাফফারুদ্দিন মেওয়াতি যোগীর নামটিও এ তালিকায় উজ্জ্বল। তিনি বিরল ‘ভাপং’ যন্ত্রের বাদক এবং মেওয়াতি যোগী সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি হিসেবে কয়েক প্রজন্ম ধরে মহাভারতের কাহিনি বা ‘পান্দুন কা কাদা’ গেয়ে চলেছেন। তার এ সাধনা হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক জীবন্ত উদাহরণ। একই ভাবে গুজরাটের জুনাগড় থেকে উঠে আসা মীর হাজিভাই কাসামভাই তার ঢোলক বাদনের জাদুতে মুগ্ধ করেছেন দেশবাসীকে। ‘হাজি রামাকড়ু’ নামে পরিচিত এই শিল্পী হাজার হাজার মঞ্চ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সংগীত ও গজলকে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন।
পূর্ব ভারতের আসাম থেকে নুরুদ্দিন আহমেদ তার ভাস্কর্য ও দৃশ্যশিল্পের মাধ্যমে নতুন একটি ধারা তৈরি করেছেন। তিনি বৈষ্ণব সংস্কৃতি থেকে শুরু করে দুর্গা প্রতিমা ও আসামের জননেতাদের মূর্তি নির্মাণে যে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন, তা তাকে জাতীয় স্তরে পরিচিতি দিয়েছে। শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য ও শিল্পের মাধ্যমে দর্শনের বহিঃপ্রকাশ তার কাজের প্রধান বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে জম্মু-কাশ্মীরের প্রখ্যাত পণ্ডিত ও ভাষাবিদ অধ্যাপক শফি শৌক শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য পদ্মশ্রী সম্মান পেয়েছেন। কাশ্মীরি ও ইংরেজি ভাষায় তার ডজনখানেক গ্রন্থ সাহিত্যভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে। মূলত এই বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের কাজ প্রমাণ করে, প্রতিভা কোনো ধর্মের সীমারেখায় আবদ্ধ নয়; বরং তা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের এই রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি আগামী প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।