ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ইস্যুতে চলমান বিক্ষোভে আলোচনায় উঠে এসেছেন ২৯ বছর বয়সী পিএইচডি গবেষক, নাট্যকর্মী ও অধিকারকর্মী নেহা বোরা। পুলিশের ব্যারিকেডে উঠে স্লোগান দেওয়া, রাস্তায় বিক্ষোভের সময় আটক হওয়া এবং পুলিশ সদস্যদের হাতে বহন করে নিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে ঘিরে আগ্রহ বেড়েছে।
ভারতের তরুণ প্রজন্মের নেতৃত্বে চলমান আন্দোলনগুলোর মধ্যে নেহার উপস্থিতি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে। আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (আইসা)। সংগঠনটির নেত্রী নেহাও ওই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেহা অবশ্য তাকে ঘিরে বাড়তি আলোচনাকে খুব একটা গুরুত্ব দিতে চাননি। তার ভাষ্য, বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনে তিনি যা করছেন, অন্য কর্মীরাও দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের কাজ করে আসছেন। তবে তার কর্মকাণ্ড ক্যামেরায় ধারণ হওয়ায় মানুষ বিষয়টিকে আলাদাভাবে দেখছেন।
ছাত্ররাজনীতি থেকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি
উত্তর ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যে জন্ম নেওয়া নেহা ছোটবেলায় বাবার চাকরির সুবাদে বিভিন্ন শহরে বেড়ে ওঠেন। তার বাবা সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ছিলেন। দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক শেষ করার পর তিনি রাজধানীর আম্বেদকর বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। বর্তমানে তিনি ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে (জেএনইউ) পিএইচডি করছেন।
গত এক দশক ধরে বামপন্থী ছাত্রসংগঠন আইসার সঙ্গে যুক্ত নেহা। গত দুই বছর ধরে সংগঠনটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি, পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং শিক্ষা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন করে আসছেন এই তরুণ অধিকারকর্মী।
তবে ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক রাজনীতির বাইরে তার পরিচিতি বাড়ে চলতি বছরের গ্রীষ্মে শিক্ষা সংস্কারবিরোধী আন্দোলনের সময়। জেন-জি নেতৃত্বাধীন অনলাইন ব্যঙ্গাত্মক আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) কয়েক সপ্তাহ ধরে দিল্লিতে বিক্ষোভ করে। আন্দোলনটি জুলাইয়ে শেষ হয়, যার আগে শিক্ষা সংস্কার নিয়ে ব্যাপক প্রতিবাদ হয় এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের বিষয়টি সামনে আসে।
আন্দোলনের শুরু থেকেই নেহা ও আইসার কর্মীরা এতে অংশ নিলেও তখন তাদের খুব বেশি মানুষ চিনতেন না। গত ২৮ জুন শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানী সোনম ওয়াংচুক সিজেপির আন্দোলনের সমর্থনে অনশন শুরু করলে নেহা ও আইসার কয়েকজন কর্মীও তার সঙ্গে যোগ দেন। এরপরই নেহার বক্তব্য ও আন্দোলন পরিচালনার ধরন সংবাদমাধ্যমের নজরে আসে।
নেহা পরে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা সংস্কারের বিরুদ্ধে তারা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। তাই ওই কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া তাদের কাছে স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত ছিল।
অনশন, আটক ও ভাইরাল ভিডিও
আন্দোলনের সময় সোনম ওয়াংচুক ও অন্য কয়েকজনকে হাসপাতালে নেওয়া হলেও নেহা অনশন চালিয়ে যান। এতে তার প্রায় আট কেজি ওজন কমে যায় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পরও এক ভিডিওবার্তায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। নেহা বলেছিলেন, সুস্থ হয়ে আবারো অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে রাস্তায় ফিরবেন তারা।
সাম্প্রতিক সময়ে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ ও আটকের ঘটনায় নেহার উপস্থিতি বারবার সামনে এসেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে তাকে পুলিশের ব্যারিকেডে উঠে স্লোগান দিতে এবং নারী পুলিশ সদস্যদের হাতে আটক হতে দেখা যায়। তাকে হাসিমুখে পুলিশ সদস্যদের বহন করে নিয়ে যাওয়ার ছবিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে নেহা তরুণ আন্দোলনকারীদের মধ্যে পরিচিত মুখ হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন শহরে শিক্ষার্থীদের দাবির পক্ষে কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছেন তিনি। এ ছাড়া কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে সংবাদ সম্মেলনেও দেখা গেছে তাকে।
মোদি ও বিজেপির সমালোচনা, পরিবারেও মতবিরোধ
নেহার বামপন্থী রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহসহ বিজেপি নেতাদের সমালোচনামূলক বক্তব্য তার ব্যক্তিগত জীবনেও প্রভাব ফেলেছে। নেহার ভাষ্য অনুযায়ী, তার বাবা-মা বিজেপির কট্টর সমর্থক হওয়ায় রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে পরিবারের মধ্যে প্রায়ই মতবিরোধ তৈরি হয়।
গত মাসে উত্তর প্রদেশে বিজেপির পক্ষ থেকে নেহার বিরুদ্ধে অন্তত তিনটি পুলিশ অভিযোগ দায়ের করা হয়। অভিযোগগুলোতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে নিয়ে তার ‘আপত্তিকর মন্তব্যের’ কথা বলা হয়েছে। এর দুই দিন আগে নেহা প্রাণনাশের হুমকি পেয়েছেন দাবি করে আইসার পক্ষ থেকে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয়েছিল।
এ ছাড়া ঝাড়খণ্ড রাজ্যে একটি প্রতিবাদ মিছিলে তার দিকে এক ব্যক্তি কালি ছুড়ে মারেন বলে অভিযোগ ওঠে। পরে ইনস্টাগ্রামে নিজের কালিমাখা মুখের ছবি প্রকাশ করেন নেহা। পুলিশ জানিয়েছে, এ ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল।
নির্বাচন কমিশন নিয়ে নতুন বিক্ষোভ
ভারতে নির্বাচনব্যবস্থা ও ভোটার তালিকা নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কের মধ্যে নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে কর্মসূচি পালনের কথা রয়েছে। কর্মসূচিটির আহ্বান জানিয়েছে সিজেপি।
আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, ভোটার তালিকায় কারসাজি করে মোদির দল বিজেপিকে সুবিধা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে ভারতের নির্বাচন কমিশন ও বিজেপি—উভয় পক্ষই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। নেহা সিজেপির সদস্য না হলেও আইসার পক্ষ থেকে ওই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন তিনি। তাদের দাবি, গণতন্ত্র রক্ষার স্বার্থেই তারা আবারো রাজপথে নামবেন।
‘রাজনীতির গতিপথ নির্ধারণ করে রাজপথ’
নেহার মতে, ভারতের রাজনীতিতে রাজপথের আন্দোলন বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে এবং আগামী কয়েক বছরেও তা অব্যাহত থাকবে।
বিবিসিকে তিনি বলেন, সাম্প্রতিক অতীতে যেসব সামাজিক পরিবর্তন ঘটেছে, সেগুলো কেবল সংসদে বসে থাকা ব্যক্তিদের মাধ্যমে আসেনি; বরং রাজপথের আন্দোলন থেকেই সেসব পরিবর্তনের সূচনা হয়েছে।
শিক্ষা সংস্কার, শিক্ষার্থীদের অধিকার, ভোটার তালিকা এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে বিতর্কের মধ্যে নেহার মতো তরুণ আন্দোলনকারীদের সক্রিয়তা ভারতের রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। আগামী দিনের বিক্ষোভে তার ভূমিকা কতটা বিস্তৃত হয়, তা নির্ভর করবে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর।
সূত্র: বিবিসি
এআরবি