ভারতের উত্তর প্রদেশের বান্দা জেলায় ভয়াবহ তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। টানা কয়েক দিন ধরে ৪৭–৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করছে, যা স্থানীয় মানদণ্ডেও এক নজিরবিহীন চরম অবস্থা।
স্থানীয়রা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে ‘সকাল ও রাতের কোনো পার্থক্য নেই। কারণ ভোর ৬টায়ও আবহাওয়া দুপুরের মতো গরম লাগে।
বান্দা শহরে দিনের শুরুই এখন অস্বাভাবিকভাবে ভোর শেষ হয়ে যাচ্ছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ভোরেই বাজারে ভিড় করেন, কিন্তু সকাল ৮টার মধ্যেই কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। সকাল ১০টার পর বাজার পুরোপুরি ফাঁকা হয়ে যায়।
হিমাংশু নামে এক ব্যবসায়ী জানান, ‘এখন সকাল ৬:১৫টা হলেও মনে হয় ৮–৯টা বাজে। তাপের কারণে টমেটোর মতো পণ্য খুব দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।’
নির্মাণশ্রমিক পাপ্পু ভার্মা জানান, এখন কাজ করা হয় ভোর ৭টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত, আবার বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত। মাঝের সময়টা তীব্র গরমের কারণে কাজ বন্ধ রাখতে হয়। তিনি বলেন, ‘টানা কাজ করি বা ভাগে ভাগে, মজুরি একই। না থামলে অসুস্থতার চিকিৎসায় সব টাকা চলে যাবে।’
রাস্তায় কাজ করা নারী শ্রমিকেরা দুপুরের তীব্র রোদ থেকে বাঁচতে পানিবাহী ট্যাংকারের নিচে আশ্রয় নেন। তাদের একজন শান্তি দেবী প্রতিদিন ছয় কিলোমিটার হেঁটে কাজ করতে আসেন এবং ফিরে যান।
তিনি বলেন, ‘আমরা সবজি আনলেও তা দুপুরের আগেই নষ্ট হয়ে যায়।’
তার আরও একটি মন্তব্য স্থানীয় বাস্তবতাকে তুলে ধরে—‘গরিবদের কাছে গরম নিয়ে চিন্তা করার সুযোগ নেই।’
স্বাস্থ্য সংকট ও পরিবেশের প্রভাব
স্থানীয় হাসপাতালগুলিতে প্রতিদিন ১৫–২০ জন হিটস্ট্রোক ও তাপজনিত সমস্যায় আক্রান্ত রোগী আসছে, বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বান্দা ও আশপাশের অঞ্চল জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ছে। নদী শুকিয়ে যাওয়া, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কমে যাওয়া এবং বনাঞ্চল কমে যাওয়ায় তাপমাত্রা আরও বেড়ে যাচ্ছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯১ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জেলার বনভূমির উল্লেখযোগ্য অংশ কমে গেছে।
‘সকাল-রাত আর নেই’
স্থানীয় আবহাওয়াবিদ দিনেশ সাহ বলেন, “এখন অবস্থা এমন যে সকাল ৭–৮টার মধ্যেই দুপুরের মতো গরম লাগে। রাতেও তাপমাত্রা প্রায় ৩০ ডিগ্রির কাছাকাছি থাকে।”
ফলে মানুষ পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়ার সুযোগই পাচ্ছে না।
তীব্র গরমের মধ্যেও মানুষ তাদের জীবনযাত্রা মানিয়ে নিয়েছে—কেউ ভোরে কাজ শুরু করছে, কেউ দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছে, আবার কেউ গাছের ছায়ায় আশ্রয় খুঁজছে।
তবে স্থানীয়দের মতে, এই অভিযোজন মানে স্বস্তি নয়—এটি কেবল টিকে থাকার লড়াই।
এক প্রবীণ বাসিন্দা বলেন, “আমার জীবনে এমন গরম আগে কখনও দেখিনি।”
স্বস্তির সাময়িক বৃষ্টি
সম্প্রতি একটি পশ্চিমা আবহাওয়া ব্যবস্থার কারণে সাময়িক বৃষ্টি ও ধুলিঝড় আসে, ফলে তাপমাত্রা কিছুটা কমে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন—এটি কেবল সাময়িক বিরতি। তাদের মতে, এই অঞ্চলে তাপপ্রবাহ আরও ঘন, দীর্ঘ ও ভয়াবহ হয়ে উঠছে—যা ভবিষ্যতে বড় মানবিক সংকট তৈরি করতে পারে।
সূত্র: বিবিসি নিউজ
এসআর