যুদ্ধ, দখল, ধ্বংসস্তূপ ও খাদ্যসংকটের মধ্যেও গাজায় কৃষিকাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন ফিলিস্তিনি কৃষকেরা। চাষযোগ্য জমি ক্রমেই কমে যাওয়ায় ছোট ছোট টুকরো জমিতে সবজি উৎপাদন করে নিজেদের পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের খাদ্যের জোগান দিতে চেষ্টা করছেন তারা। কিন্তু জমিতে কাজ করতেও তাদের প্রতিনিয়ত হামলা ও গুলির ঝুঁকি নিতে হচ্ছে।
গাজার প্রায় ২১ লাখ মানুষ এখন আরও সংকুচিত এলাকায় বসবাস করছেন। যুদ্ধের আগে যে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি ছিল, তার বড় অংশ এখন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে অথবা ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএওর স্যাটেলাইট তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধের আগের কৃষিজমির মাত্র ৪৫০ হেক্টর বা প্রায় ৩ শতাংশ জমি এখন অক্ষত এবং তাৎক্ষণিকভাবে চাষের উপযোগী রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ার কৃষক সাকের আবু রাবি ১ দশমিক ৪ হেক্টর জমিতে আবার চাষ শুরু করেছেন। যুদ্ধের আগে সেখানে কমলালেবুর বাগান ছিল। তার দাবি, ইসরাইলি বাহিনী বাগানটি ধ্বংস করে দেওয়ার পর তিনি পরিবারের সদস্য ও শ্রমিকদের নিয়ে সাধারণ সরঞ্জাম ব্যবহার করে জমিটি পরিষ্কার করে আবার চাষের উপযোগী করেন।
এই সামান্য জমি থেকেই তার পরিবার বেগুন, টমেটো ও মরিচের লাখ লাখ চারা উৎপাদন করছে। কিছু সবজি বিক্রি করে আয় করা হচ্ছে, আর অধিকাংশ চারা অন্য কৃষক ও তাঁবুতে বসবাসকারী পরিবারগুলোর মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। এর ফলে স্থানীয় বাজারে সবজির দামও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।
তবে কৃষকদের জন্য সবচেয়ে বড় সমস্যা নিরাপত্তা। সাকের আবু রাবির ছেলে ইউসুফ ২০২৪ সালের অক্টোবরে মাঠে কাজ করার সময় ড্রোন হামলায় নিহত হন। তার ভাই বিলালও চলতি বছরের জুলাইয়ে কৃষি সরঞ্জাম আনতে গিয়ে নিহত হন। আবু রাবির অভিযোগ, কৃষকরা খাদ্য উৎপাদন করে গাজার মানুষের টিকে থাকার সুযোগ তৈরি করছেন বলেই তাদেরও লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। তবে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনী কৃষক বা বেসামরিক নাগরিকদের লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
কৃষিকাজের জন্য পানি, সার ও কীটনাশকেরও তীব্র সংকট রয়েছে। যুদ্ধের কারণে গাজার ৮০ শতাংশের বেশি গ্রিনহাউস ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পশুসম্পদ কমে যাওয়ায় জৈব সারও পাওয়া যাচ্ছে না। কৃষকরা পচা উদ্ভিদ ব্যবহার করে নিজেরাই সার তৈরির চেষ্টা করছেন। পাশাপাশি মাটির রোগ ও পোকামাকড়ের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর হিসাবে, গাজায় এখনো প্রায় ১৪ লাখ মানুষ বা মোট জনসংখ্যার ৬৭ শতাংশ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছেন। এফএও বলছে, শুধু বাইরে থেকে খাদ্য সরবরাহ করে গাজার খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; স্থানীয় কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন আবার চালু করা জরুরি।
এদিকে গাজার কৃষিজমির বড় অংশ ইসরাইলি সামরিক নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ায় কৃষকদের চাষের সুযোগ আরও সংকুচিত হচ্ছে। স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গাজার উদ্ভিদ আচ্ছাদিত এলাকার প্রায় ৬৮ শতাংশ ইসরাইলি বাহিনীর নির্ধারিত ‘ইয়েলো লাইন’-এর ওপারে এবং আরও ৫ শতাংশ এমন একটি বাফার এলাকায় রয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিনিদের প্রবেশ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
তারপরও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে চাষাবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন গাজার কৃষকরা। তাদের কাছে কৃষিকাজ শুধু জীবিকার মাধ্যম নয়, বরং খাদ্যের জোগান ধরে রাখা এবং যুদ্ধের মধ্যেও টিকে থাকার একটি উপায়।