হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

যুদ্ধের মধ্যেই ইরানের ভেতরে বাড়ছে সশস্ত্র হুমকি

আল-জাজিরা

ইরাকের এরবিল প্রদেশের খালিফানে পাহাড়ের আড়ালে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটিতে কুর্দি-ইরানি ভিন্নমতাবলম্বী গোষ্ঠী ‘কোমালা অফ দ্য টয়লার্স অফ কুর্দিস্তান’-এর সদস্যদের দেখা যাচ্ছে। ছবি: আল-জাজিরা

ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যেই ইরানের ভেতরে নতুন চাপ তৈরি হচ্ছে। একদিকে অর্থনৈতিক সংকটে বাড়ছে জনঅসন্তোষ ও নতুন বিক্ষোভের আশঙ্কা। অন্যদিকে সীমান্তে সক্রিয় কুর্দি ও বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোও তেহরানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ চাপ তৈরির কৌশল। ওয়াশিংটন প্রকাশ্যেই ইরানের বিক্ষোভকারীদের সমর্থন করছে। যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও নৌ অবরোধের চাপ দেশটির ভেতরে নতুন অভ্যুত্থান তৈরি করতে পারে বলেও মার্কিন কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে ইরানি কর্তৃপক্ষ দেশের ভেতরে ছোট সশস্ত্র সেল এবং সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করেছে। গ্রেপ্তার ও সংঘর্ষের খবরও নিয়মিত প্রকাশ করছে তারা। এর মাধ্যমে যুদ্ধকে জাতীয় নিরাপত্তার লড়াই হিসেবে তুলে ধরার পাশাপাশি দেশের ভেতরে ও বাইরে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার বার্তা দিচ্ছে তেহরান।

সর্বশেষ রোববার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, ‘বিপ্লববিরোধী’ ও ‘রাজতন্ত্রপন্থি’ গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি আট সদস্যের নেটওয়ার্কের সদস্যদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

দক্ষিণাঞ্চলীয় ফার্স প্রদেশে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) অভিযোগ করেছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানুয়ারির দেশব্যাপী বিক্ষোভের সময় মলোটভ ককটেল ব্যবহার এবং টায়ার পুড়িয়ে সহিংসতা চালিয়েছিলেন।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির মধ্যেই নতুন বিক্ষোভের আশঙ্কা করছে ইরানের ইসলামি প্রজাতন্ত্রের নেতৃত্ব। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এ নিয়ে তারা উদ্বেগও প্রকাশ করেছে।

রাজতন্ত্রের ছায়া, বিক্ষোভের ভয়

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মাধ্যমে ইরানে রাজতন্ত্রের পতন ঘটে। কিন্তু জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেশটির কিছু মানুষ আবার রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পক্ষে অবস্থান নেন।

ইরানের শেষ শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভির ছেলে রেজা পাহলভি বর্তমানে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি ইরান সরকারের অন্যতম প্রধান বিরোধী। জানুয়ারিতে তিনি ইরানিদের দেশব্যাপী ধর্মঘট ও বিক্ষোভে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ওই অস্থিরতায় হাজারো মানুষ নিহত হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

তবে ইরানের ভেতরে রেজা পাহলভির সমর্থনে স্লোগান শোনা গেলেও বর্তমানে বড় কোনো সংগঠিত রাজতন্ত্রপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠী সেখানে সক্রিয় নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোর বড় বিক্ষোভগুলোর মূল কারণও রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনা নয়। অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও সরকারি দমন-পীড়নের বিরুদ্ধেই মূলত এসব আন্দোলন হয়েছে।

তবু যুদ্ধ শুরুর পর রাজতন্ত্রপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযান বাড়িয়েছে ইরান। ১৮ মার্চ দেশটির গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় জানায়, ২৬টি প্রদেশে কথিত ১১১টি ‘রাজতন্ত্রপন্থি সেল’ গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ইরানি কর্তৃপক্ষ জানুয়ারির বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সশস্ত্র এজেন্টদের মাধ্যমে পরিচালিত একটি ‘অভ্যুত্থান’ হিসেবে দেখছে। তাদের দাবি, রাজতন্ত্রপন্থিরাও ওই তৎপরতার অংশ ছিল।

তবে বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর ‘নিষ্ঠুরতার’ নিন্দা জানিয়েছে জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো। যুদ্ধ শুরুর পর দেশটির বিচার বিভাগ অসংখ্য বন্দির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। তাদের মধ্যে জানুয়ারির বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ব্যক্তিও ছিলেন।

জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে কাজ করার অভিযোগে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শিক্ষার্থী, শিল্পী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক ও স্বাস্থ্যকর্মীসহ আরো অনেককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পশ্চিম সীমান্তে কুর্দি যোদ্ধারা

ইরানের জন্য সবচেয়ে বড় অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র হুমকি এখন পশ্চিম সীমান্তের কুর্দি যোদ্ধারা। ইরাকের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় সক্রিয় এসব গোষ্ঠীর কয়েকটি বহু বছর ধরে উত্তর ইরাকের আধা-স্বায়ত্তশাসিত কুর্দি অঞ্চলে ঘাঁটি গড়ে রেখেছে।

ইরান এসব গোষ্ঠীকে ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানি বাহিনী ইরাকে তাদের ঘাঁটিতে হামলাও চালিয়েছে। একই সঙ্গে তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ইরাক সরকারের সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে তেহরান।

এ বছরের যুদ্ধ শুরুর সময় পরিস্থিতি আরো ঘনীভূত হয়। ট্রাম্প প্রশাসন মনে করেছিল, কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো পশ্চিম ইরানে সীমিত স্থল অভিযান চালাতে পারে। এতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ব্যাপক বিমান ও নৌ হামলার সঙ্গে স্থল চাপও যুক্ত হতো।

মার্চের শুরুতে রয়টার্স জানায়, কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি (পিজেএকে), ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইরানিয়ান কুর্দিস্তান (পিডিকেআই) ও কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টি (পিএকে)সহ কয়েকটি গোষ্ঠীর প্রায় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার ইরানি কুর্দি যোদ্ধা সম্ভাব্য সীমান্ত অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও তাদের আলোচনা হয়েছিল।

তবে পর্যাপ্ত অস্ত্র না থাকা এবং ওয়াশিংটনের কাছ থেকে অভিযান শুরুর স্পষ্ট সংকেত না পাওয়ায় পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হয়নি। এপ্রিলের মধ্যে ইরানের আইআরজিসি সীমান্তবর্তী প্রদেশগুলোতে আরো সেনা পাঠায়।

পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প একাধিকবার দাবি করেন, তিনি কুর্দি বাহিনীকে অস্ত্র দিয়েছিলেন। তবে ওই বাহিনী অস্ত্রগুলো নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।

দক্ষিণ-পূর্বে বালুচ বিদ্রোহ

কুর্দি গোষ্ঠীর পাশাপাশি ইরানের অস্থির দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলও তেহরানের জন্য বড় উদ্বেগের জায়গা। সেখানে বিচ্ছিন্নতাবাদী বালুচ যোদ্ধারা সক্রিয়।

আগস্টের শেষ দিকে নিরাপত্তা বাহিনী জানায়, তারা বালুচ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সবচেয়ে পরিচিত সংগঠন জইশ আল-আদলের একটি সেল ভেঙে দিয়েছে। এ সময় একজন বিদ্রোহী নিহত ও ছয়জন গ্রেপ্তার হন। রাইফেল, গ্রেনেড লঞ্চার ও বিস্ফোরক উদ্ধারের কথাও জানানো হয়।

তবে জইশ আল-আদলের হামলা পুরোপুরি থামেনি। বিচ্ছিন্ন এসব হামলায় কখনো পুলিশ কর্মকর্তা ও আইআরজিসির সদস্যও নিহত হয়েছেন।

যুদ্ধের মধ্যে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর তৎপরতা ঠেকাতে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ আরো শক্ত করার কথা জানিয়েছে ইরান।

বাইরের সহায়তাই বড় ভয়

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো অ্যালেক্স ভাতাঙ্কার মতে, কুর্দি ও বালুচ বিদ্রোহীদের বাইরের সহায়তা বাড়লে ইরানের নিরাপত্তা সংকট আরো তীব্র হতে পারে।

আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, যুদ্ধের এই পরিস্থিতিতে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে বাইরের সহায়তার যেকোনো লক্ষণকে ইরানি রাষ্ট্র অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখতে পারে।

তার মতে, এসব গোষ্ঠী তখনই যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে, যখন তেহরানের ওপর চাপ তৈরির বৃহত্তর বিদেশি অর্থায়নে পরিচালিত অভিযানের অংশ হিসেবে তারা কাজ করবে। ইরান ইতোমধ্যে এমন সম্ভাবনাকে ‘বিদেশি নেতৃত্বাধীন হাইব্রিড যুদ্ধ’ হিসেবে দেখছে।

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ত্রিতা পারসির মতে, বিচ্ছিন্নতাবাদী মিলিশিয়াগুলো একা ইরান সরকারের অস্তিত্বের জন্য হুমকি নয়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ আরো বাড়লে তারা তেহরানের জন্য বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।

বিশেষ করে মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর যুক্তরাষ্ট্র যদি স্থলসেনা পাঠানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে ওয়াশিংটন ইরানের ভেতরের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে ব্যবহারের চেষ্টা করতে পারে বলে মনে করেন পারসি।

ইরানের ভেতরেই চাপ বাড়ানোর বার্তা ওয়াশিংটনের

জানুয়ারির বিক্ষোভের সময় ট্রাম্পসহ মার্কিন কর্মকর্তারা ইরানি বিক্ষোভকারীদের প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছিলেন। ইসলামি প্রজাতন্ত্র উৎখাতের লক্ষ্য নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বানও জানানো হয়েছিল।

যুদ্ধ শুরুর পরও সেই অবস্থানে বড় পরিবর্তন আসেনি।

গত সপ্তাহে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা ও ইরানের দক্ষিণাঞ্চীয় বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধের চাপ শেষ পর্যন্ত দেশটির ভেতরে নতুন অভ্যুত্থান ঘটাতে পারে। এমনকি এর ফলে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতনও হতে পারে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্টও বলেন, এই চাপ ইরানিদের আবার রাস্তায় নামাতে পারে। এমনকি এতে আইআরজিসির ভেতরেও বিভাজন তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, ‘হয়তো জনগণই জেগে উঠবে।’

তার যুক্তি, ইরানে মূল্যস্ফীতি ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে, পণ্যের জন্য দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে, সামরিক বাহিনীর সদস্যরা বেতন পাচ্ছেন না এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন।

ফলে ইরানের জন্য যুদ্ধের ফ্রন্ট এখন শুধু আকাশ বা সীমান্তে সীমাবদ্ধ নেই। একদিকে বিদেশি হামলা, অন্যদিকে অর্থনৈতিক ক্ষোভ ও বিক্ষোভের আশঙ্কা; এর সঙ্গে সীমান্তে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা—সব মিলিয়ে তেহরানের সামনে তৈরি হচ্ছে একাধিক অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ফ্রন্ট।

এএম

সীতাকুণ্ডে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অস্ত্রের মহড়া, গ্রেপ্তার ৩

ইসরাইলকে আবারও সতর্ক করলেন এরদোয়ান

১০ অতিরিক্ত পুলিশ সুপারের বদলি

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনের পর স্থায়ী চক্রাকার বাস চালু

চট্টগ্রামে লেক সিটিতে পাহাড়ে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে অভিযান শুরু

‘কেউ আমাকে নির্বাচন থেকে সরাতে পারবে না’ বলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিএনপি নেতার মৃত্যু

টিভির পর্দায় বাংলাদেশ-আমিরাতের ম্যাচের সঙ্গে চ্যাম্পিয়নস লিগের রোমাঞ্চ

হাসিনাকে ধরে আনব, তার জন্য মৃত্যুদণ্ড অপেক্ষা করছে: তথ্য উপদেষ্টা

কাজাখস্তানকে উড়িয়ে মেয়েদের হ্যাটট্রিক জয়

সুনামগঞ্জে ভবন নির্মাণের এক বছর পরও চালু হয়নি ডায়াবেটিক হাসপাতাল