যুক্তরাষ্ট্রে আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ইস্যু হয়ে উঠেছে ইরান যুদ্ধ। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীদের চাপে ফেলতে যুদ্ধবিরোধী অবস্থানকে সামনে আনছেন ডেমোক্র্যাটরা। তাদের বক্তব্য, ইরান যুদ্ধ এখন আর শুধু পররাষ্ট্রনীতির বিষয় নয়, এটি সরাসরি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির সঙ্গে জড়িয়ে গেছে।
গত বুধবার মিশিগানে যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট নির্বাচনের এক বিতর্কে প্রথম প্রশ্নই ছিল অর্থনীতি নিয়ে। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী আবদুল আল-সাইয়েদ ও তার রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বী মাইক রজার্সের মধ্যে এই বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়। রজার্স প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থী।
বিতর্কে আল-সাইয়েদ সুদের হার, কর কিংবা বাণিজ্যনীতি নিয়ে কথা না বলে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের দাম—সবকিছুর পেছনেই মূলত ইরান যুদ্ধের প্রভাব রয়েছে।’
আল-সাইয়েদ আরো বলেন, ‘আমাদের এমন একটি যুদ্ধক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ প্রস্তাব দরকার, যার মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা সীমিত করা যাবে। এমন কোনো সিনেটরকে আমরা চাই না, যিনি এই যুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতে চান। যুদ্ধটি শুরুর সময়ই এর কোনো যৌক্তিকতা ছিল না, আর এখন তো আরো নেই।’
ট্রাম্পের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা সীমিত করতে কংগ্রেসে নেওয়া আইন প্রণয়নের উদ্যোগের কথাই বলছিলেন তিনি।
মিশিগানজুড়ে ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধের বিরোধিতাকে নির্বাচনী প্রচারের অন্যতম প্রধান বিষয় করেছেন। জ্বালানি ও নিত্যপণ্যের বাড়তি দামে চাপে থাকা ভোটারদের সমর্থন পেতে তারা এ কৌশল নিয়েছেন।
ইনস্টিটিউট ফর গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের (আইজিএ) কর্মসূচি পরিচালক জোনাথন গায়ার বলেন, ‘ইরান যুদ্ধ এখন মানুষের সংসারের হিসাব-নিকাশের বিষয় হয়ে উঠেছে। ভোটাররা সাধারণত পররাষ্ট্রনীতিকে তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখেন না। কিন্তু এখন এটি অর্থনীতির সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গেছে যে কার্যত পররাষ্ট্রনীতিই অর্থনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
গত মাসে আইজিএ প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, সম্ভাব্য ভোটারদের ৬০ শতাংশ ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকার বিরোধিতা করছেন। রিপাবলিকানদের জন্য আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জরিপে অংশ নেওয়া ৮১ শতাংশ মানুষ মনে করেন, এই যুদ্ধের কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।
যুদ্ধের প্রভাবে বাড়ছে জীবনযাত্রার ব্যয়
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানে হামলা শুরু করার পরপরই হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পণ্যের সরবরাহ ব্যাহত করতে শুরু করে তেহরান। এতে বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাসের দাম দ্রুত বেড়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রে গত কয়েক সপ্তাহে ডিজেলের দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ভারী যন্ত্রপাতি চালানোর পাশাপাশি দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ভোগ্যপণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত ভারী ট্রাক চালাতেও ডিজেল প্রয়োজন হয়। ফলে ডিজেলের বাড়তি দাম পরিবহন ব্যয়েও প্রভাব ফেলছে।
একই সঙ্গে সাধারণ মানুষের জন্য পেট্রল বা গ্যাসোলিন কেনাও ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। প্রায় প্রতিদিনই গাড়িতে জ্বালানি নিতে গিয়ে এর প্রভাব টের পাচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকেরা।
আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের (এএএ) তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর আগে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন (৩ দশমিক ৮ লিটার) পেট্রলের গড় দাম ছিল ৩ ডলারের কম। গত বৃহস্পতিবার তা বেড়ে ৪ ডলার ২৭ সেন্ট ছাড়িয়েছে।
জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বাড়ার প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অর্থনীতিতে। এতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরো বেড়েছে। অথচ নির্বাচনী রাজনীতিতে জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দেওয়ার বিষয়টি আগেই অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছিল।
ট্রাম্প ও তার মিত্ররা দাবি করে আসছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করা থেকে বিরত রাখতেই এই যুদ্ধ প্রয়োজন ছিল। তবে যুদ্ধ শুরুর আগে ট্রাম্প নিজেই একাধিকবার বলেছিলেন, ২০২৫ সালের জুনে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচি ‘সম্পূর্ণ ধ্বংস’ হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তারা কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিয়ে বলেছেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরি করছে—এমন কোনো প্রমাণ তাদের কাছে নেই।
গত বুধবারের বিতর্কে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন মিশিগানের রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্স। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি প্রতি গ্যালন পেট্রলের জন্য ৮ ডলার দিতে চান, তাহলে ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দিন। এতে পুরো অঞ্চলের ওপর আপনার নিয়ন্ত্রণ হারাবেন।’
তবে যুদ্ধের পক্ষে যুক্তি দিলেও রজার্স নিজেই সংঘাত বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সম্প্রতি একটি মুদি দোকানে ধারণ করা নির্বাচনী প্রচারের বিজ্ঞাপনে তিনি বলেন, ‘ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শেষ করতে হবে, এবং তা দ্রুতই করতে হবে।’
রিপাবলিকানদের অন্য কয়েকজন প্রার্থীর অবস্থানেও একই ধরনের বক্তব্য দেখা যাচ্ছে। তাদের অনেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ সিনেট ও প্রতিনিধি পরিষদের নির্বাচনে লড়ছেন।
প্রতিবেশী অঙ্গরাজ্য ওহাইওর সিনেটর জন হাস্টেডও যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার আহ্বান জানিয়েছেন। আইওয়া থেকে সিনেট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা কংগ্রেস সদস্য অ্যাশলি হিনসন বলেছেন, তিনি ট্রাম্পকে সংঘাতের অবিলম্বে ও সফল সমাপ্তির পক্ষে নিজের অবস্থান জানিয়েছেন। মেইনের সিনেটর সুসান কলিন্স যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতা সীমিত করার কয়েকটি প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেওয়ার বিষয়টি প্রচারে তুলে ধরেছেন।
তবে রিপাবলিকান পার্টির নেতা ট্রাম্প আগামী মাসের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে আবার পূর্ণমাত্রায় হামলা শুরু করার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি যুদ্ধকে ঐতিহাসিক সাফল্য হিসেবে তুলে ধরছেন।
গত বুধবার সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমরা সবচেয়ে ভালো কাজগুলোর একটি করেছি। আমরা ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করা থেকে বিরত রেখেছি।’
তিনি আরো বলেন, ‘এটি আমাদের করা সবচেয়ে ভালো কাজগুলোর একটি। এ জন্য অনেক সাহসের প্রয়োজন হয়েছে, কারণ অন্য কোনো প্রেসিডেন্ট এমন পদক্ষেপ নিতে রাজি হননি।’
যুদ্ধ নিয়ে রিপাবলিকানদের সমর্থনেও ভাটা
সামগ্রিকভাবে ইরান যুদ্ধ অজনপ্রিয় হয়ে উঠলেও অধিকাংশ রিপাবলিকান এখনো এর পক্ষে রয়েছেন।
চলতি মাসের শুরুতে পিউ রিসার্চ সেন্টারের প্রকাশিত এক জরিপে দেখা গেছে, রিপাবলিকান উত্তরদাতাদের ৬৩ শতাংশ ইরান যুদ্ধ পরিচালনায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন।
আগস্টে পরিচালিত আইজিএর জরিপে এ হার ছিল ৭৪ শতাংশ। তবে ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিচালনায় ‘দৃঢ়ভাবে সমর্থন’ জানিয়েছেন রিপাবলিকান উত্তরদাতাদের মাত্র ২৪ শতাংশ। এপ্রিলে এই হার ছিল ৪০ শতাংশ।
আইজিএর কর্মসূচি পরিচালক জোনাথন গায়ারের মতে, রিপাবলিকানদের মধ্যে যুদ্ধের প্রতি জোরালো সমর্থন কমে আসা আসন্ন নির্বাচনে দলটির জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে।
আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘এর অর্থ এই নয় যে রিপাবলিকানরা প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে পুরোপুরি সরে যাচ্ছেন। তবে তার প্রতি তাদের সমর্থনে আগের মতো দৃঢ়তা নেই। তারা যদি ভোট দিতে আসেন এবং নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেন, তাহলে এর প্রভাব পড়তে পারে।’
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আর দুই সপ্তাহেরও কম সময় বাকি। এ পরিস্থিতিতে ডেমোক্র্যাটরা মনে করছেন, ইরান যুদ্ধ রিপাবলিকানদের দুর্বল জায়গা হয়ে উঠেছে। তাই সারা দেশে ট্রাম্পের সমর্থনপুষ্ট প্রার্থীদের চাপে ফেলতে তারা বারবার যুদ্ধের প্রসঙ্গ সামনে আনছেন।
গত বুধবার ডেট্রয়েটে এল-সায়েদের সমর্থকদের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনী বিতর্ক দেখার অনুষ্ঠানে আলজাজিরা কথা বলে ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফির সঙ্গে। সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্য সফর করে ফেরা এই সিনেটরের কাছে ইরান যুদ্ধের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়েছিল। তার উত্তরেও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির চেয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিই বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
মারফি বলেন, ‘ডেট্রয়েটে ইতোমধ্যে প্রতি গ্যালন ডিজেলের দাম ৬ ডলার ছাড়িয়েছে। এই যুদ্ধ আবার শুরু হলে দাম আরো বাড়বে। বিতর্কে মাইক রজার্স বলেছেন, তিনি যুদ্ধের পক্ষে থাকবেন। এর অর্থ হলো, তিনি কার্যত মার্কিন অর্থনীতির জন্য মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘মিশিগানের ভোটারদের সামনে এখন বড় একটি সিদ্ধান্ত। আপনি যদি চান, এই যুদ্ধ আরো এক বছর চলুক এবং পেট্রলের দাম প্রতি গ্যালন ৮ ডলারে উঠুক, তাহলে মাইক রজার্সকে ভোট দিন। আর যদি যুদ্ধের অবসান চান এবং পণ্যের দাম কমাতে চান, তাহলে আবদুল আল-সাইয়েদকে ভোট দিন।’
এএম