কুয়েতে বসবাসরত ইরানিরা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধে ক্রমেই চাপ ও উদ্বেগের মধ্যে পড়ছেন। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার পর কুয়েতেও ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বেড়েছে। এর প্রভাব পড়ছে দেশটিতে বসবাসরত প্রায় ৫২ হাজার ইরানির ওপর। অনেকেই বলছেন, তারা দুই দেশের সংঘাতের মাঝখানে পড়ে গেছেন এবং শুধু শান্তিতে বসবাস ও জীবিকা নির্বাহ করতে চান।
যুদ্ধের প্রভাবের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ কুয়েত সিটির একটি পারস্য রেস্তোরাঁ। চলতি বছরের শুরুতে রেস্তোরাঁটির নাম থেকে ‘ইরানিয়ান কুইজিন’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। ব্যবস্থাপনার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, যুদ্ধের পরিস্থিতিতে বিষয়টি স্পর্শকাতর হয়ে ওঠায় নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে রেস্তোরাঁটির ব্যবসা এখনো যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি।
কুয়েতে বসবাসরত ইরানি নাগরিকদের মধ্যে কেউ মাছ ধরার নৌকা, সবজির বাজার ও বেকারিতে তুলনামূলক কম বেতনের কাজ করেন। আবার অনেকে কাপড় ও কার্পেটের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। রাজধানীর ঐতিহাসিক মুবারাকিয়া বাজারেও ইরানি ব্যবসায়ীদের বড় উপস্থিতি রয়েছে। তাদের অনেকের সঙ্গে স্থানীয় কুয়েতিদের দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক সম্পর্কও রয়েছে।
শিরাজের বাসিন্দা ৩৫ বছর বয়সী এক ইরানি ব্যবসায়ী, যিনি নিরাপত্তার কারণে ছদ্মনাম ব্যবহার করেছেন, বলেন, তারা বহু বছর ধরে কুয়েতে বসবাস করছেন এবং দুই দেশের মধ্যে কোনো সমস্যা চান না। যুদ্ধের কারণে তিনি ইরানে থাকা মেয়ের কাছে ফিরতেও পারছেন না। ইরান ও কুয়েতের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট ২৮ ফেব্রুয়ারি বন্ধ হয়ে যায়।
যুদ্ধের আগে কুয়েত ও ইরানের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্কও বেশ সক্রিয় ছিল। ২০২৪ সালে দুই দেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ৩০ কোটি ডলার। ইরান থেকে কুয়েতে খাদ্য ও কৃষিপণ্য, মাছ, কার্পেট এবং নির্মাণসামগ্রী রপ্তানি হতো। যুদ্ধের মধ্যেও মুবারাকিয়া বাজারের কয়েকজন ইরানি ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, কুয়েতি ক্রেতাদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক এখনো ভালো রয়েছে।
তবে নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে ইরানি সম্প্রদায়ের ওপর চাপ বেড়েছে। কুয়েতি কর্তৃপক্ষ ইরানের বিপ্লবী গার্ডের সঙ্গে যোগাযোগ বা নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডের সন্দেহে অভিযান ও গ্রেপ্তার চালাচ্ছে। গত মাসে দেশটির একমাত্র ইরানি স্কুলও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
এক ইরানি নাগরিক বলেন, তারা সরাসরি হয়রানির শিকার না হলেও সবার মধ্যে এক ধরনের উদ্বেগ কাজ করছে। আরেকজনের ভাষায়, ‘আমরা মাঝখানে পড়ে গেছি।’ একই সঙ্গে কুয়েতের স্থানীয় বাসিন্দাদের কেউ কেউ বলছেন, ইরানিরা দেশটির ইতিহাস ও সমাজের দীর্ঘদিনের অংশ; তাদের ছাড়া কুয়েতকে কল্পনা করা কঠিন।
ফলে যুদ্ধের সামরিক অভিঘাতের পাশাপাশি কুয়েতে এর একটি সামাজিক প্রভাবও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দীর্ঘদিনের প্রতিবেশী ও বাণিজ্যিক সম্পর্কের মধ্যে বসবাস করা ইরানি সম্প্রদায় এখন নিরাপত্তা, জীবিকা ও নিজেদের সামাজিক পরিচয়—তিন দিক থেকেই নতুন অনিশ্চয়তার মুখোমুখি।