সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে টানা তৃতীয় দিনের মতো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবি করেছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা।
সোমবার দিবাগত রাতে রিয়াদে একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। তবে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের দাবি, রিয়াদ ও দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর খামিস মুশাইতের দিকে ছোড়া তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
এদিকে কয়েক দিনের হামলায় সৌদি আরবে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। বন্ধ রয়েছে রাজধানীর বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। ধারাবাহিক হামলার মুখে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে তদন্ত শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে দেশটির বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলোতে আরো হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছে হুথিরা।
আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল-মালিকি জানান, হুথিরা রিয়াদের দিকে একটি এবং খামিস মুশাইতের দিকে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। তিনটি ক্ষেপণাস্ত্রই প্রতিহত করে ধ্বংস করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তবে সোমবার রাতে রিয়াদের বাসিন্দারা একাধিক শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছেন। এর কিছুক্ষণ আগে তাদের মোবাইলফোনে আকাশপথে হামলার আশঙ্কা জানিয়ে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছিল।
ইয়েমেনের রাজধানী সানাসহ দেশটির জনবহুল এলাকাগুলোর নিয়ন্ত্রণে থাকা হুথিরা জানিয়েছে, রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছিল তাদের হামলার লক্ষ্যবস্তু।
হুথিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেন, ইয়েমেন সীমান্তের কাছে খামিস মুশাইতের একটি সামরিক বিমানঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালিয়েছেন তারা। সৌদি আরবের মক্কা ও মদিনা ছাড়া অন্য শহরগুলোর বিমানবন্দরে ফ্লাইট পরিচালনা না করতে আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা ও যাত্রীদের আবারও সতর্ক করেছেন তিনি।
তার দাবি, এসব বিমানবন্দর এখন ‘নিরাপদ নয়’।
এর আগে শনিবার হুথিদের হামলায় রিয়াদের বাদশা খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১৩ জন নিহত ও ৩০০ জনের বেশি আহত হন। এরপর থেকে বিমানবন্দরটি বন্ধ রয়েছে। রোববারের আরেকটি হামলায় একজন নিহত ও ১১ জন আহত হন।
সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী শনিবার পর্যন্ত বিমানবন্দরটি বন্ধ থাকবে। এ কারণে বিভিন্ন বিমান সংস্থা তাদের ফ্লাইট বাতিল করেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোতেও হামলা চালিয়ে যাচ্ছে হুতিরা।
সৌদি আরবের জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান আল সৌদ বলেছেন, গত এক সপ্তাহে বিমানবন্দরগুলোতে হামলা দেশটির সংকট মোকাবিলার সক্ষমতার বড় পরীক্ষা নিয়েছে।
রিয়াদে এক জ্বালানি সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোর ঘটনাগুলো গুরুতর। আমাদের প্রতিক্রিয়াও সমানভাবে কঠোর হতে হবে।’
যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের নেওয়া সৌদি অর্থনীতিকে বহুমুখী করার পরিকল্পনা ‘ভিশন ২০৩০’-এর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে হবে। বিনিয়োগও অব্যাহত রাখতে হবে।’
আকাশ প্রতিরক্ষার ব্যর্থতা নিয়ে তদন্ত
সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কেন ধারাবাহিক হামলা ঠেকাতে পারছে না, তা খতিয়ে দেখছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে মধ্যপ্রাচ্যের দুই কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) এ তথ্য জানিয়েছেন।
ওই কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে, হুতিরা প্রথমে কয়েকটি ড্রোন পাঠিয়ে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য পথ তৈরি করে। এরপর ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের সমন্বিত হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছে যায়।
হুথিদের হাতে এমন কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে, যেগুলোর ওয়ারহেড উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে। ফলে সৌদি আরবের ব্যবহৃত প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষাব্যবস্থাসহ অন্যান্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য এসব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা কঠিন হয়ে উঠছে।
এপিকে এক কর্মকর্তা বলেন, হামলার বিষয়ে আরো আগে সতর্কবার্তা দেওয়া সম্ভব ছিল কি না, তা-ও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনগুলো এক হাজার কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে রিয়াদে পৌঁছেছিল।
যুক্তরাষ্ট্রকে হুথিদের পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুতিদের সমালোচনা করলেও এই সংঘাতে ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপ করবে কি না, সে বিষয়ে কোনো ইঙ্গিত দেননি। হুথিদের কর্মকাণ্ড নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘হুথিরা খুব খারাপ আচরণ করছে। এটা ভালো নয়।’
তবে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ালে পাল্টা হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন হুথিদের এক কর্মকর্তা। গোষ্ঠীটির রাজনৈতিক ব্যুরোর সদস্য মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যদি ইয়েমেনের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে জড়ায়, তাহলে পাল্টা জবাব দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে আমরা সময় নষ্ট করব না। বরং যুক্তরাষ্ট্র ও এ অঞ্চলে তাদের সব স্বার্থকে লক্ষ্য করে দ্রুত ও যন্ত্রণাদায়ক জবাব দেওয়া হবে।’
আল-বুখাইতি সৌদি আরবের তেল স্থাপনা ও বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও এসব স্থাপনা থেকে দূরে থাকার সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তার দাবি, এসব স্থাপনা এখন ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সমর্থক বাহিনীর সঙ্গে লড়াই করছে হুথিরা। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট হুতিদের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালানোর পাশাপাশি ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে স্থলযুদ্ধে সহায়তা করছে। ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যুদ্ধ শুরুর পর আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়লে ইয়েমেনের এই সংঘাতও তীব্র হয়ে ওঠে।
এএম