যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার মধ্যে আলোচনায় এসেছে ইরানের একটি মাঝারি পাল্লার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। এর নাম ‘খেইবার শেকান’। ফারসি ভাষায় এর অর্থ ‘দুর্গ ভেঙে ফেলা’ বা ‘ক্যাসল ব্রেকার’। ইরান সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলায় এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করছে।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি এই ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করেছে। ২০২২ সালে প্রথমবার এটি প্রকাশ্যে আনা হয়। ক্ষেপণাস্ত্রটির পাল্লা প্রায় ১ হাজার ৪৫০ কিলোমিটার। এতে ৪৪৯ থেকে ৫৯০ কেজি পর্যন্ত ওজনের ওয়ারহেড বহনের সক্ষমতা রয়েছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ ‘ক্যাসল ব্রেকার’
খেইবার শেকানের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর সলিড-ফুয়েল বা কঠিন জ্বালানি প্রযুক্তি। তরল জ্বালানির ক্ষেপণাস্ত্রের মতো উৎক্ষেপণের আগে দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানি ভরতে হয় না। ফলে সংকটের সময় দ্রুত এটি উৎক্ষেপণ করা সম্ভব।
সলিড-ফুয়েল ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলকভাবে সহজে সংরক্ষণ করা যায় এবং উৎক্ষেপণের প্রস্তুতিও দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব। এতে জ্বালানি সরবরাহের জন্য আলাদা বড় ধরনের লজিস্টিক ব্যবস্থার প্রয়োজন কমে যায়। একই সঙ্গে উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি কম সময়ের হওয়ায় প্রতিপক্ষের পক্ষে আগে থেকে শনাক্ত করাও কঠিন হতে পারে।
কোথায় ব্যবহার করছে ইরান
ইরান দাবি করেছে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করে সাম্প্রতিক হামলায় খেইবার শেকান ব্যবহার করা হয়েছে। বিশেষ করে জর্ডানে মার্কিন সামরিক স্থাপনার বিরুদ্ধে হামলায় এই ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের কথা জানিয়েছে ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম।
ইরানের হাতে থাকা এই ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র ইসরাইল এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র ও সামরিক স্থাপনাগুলোকে পাল্লার মধ্যে রাখে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ওপর ইরানের দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডারে খেইবার শেকানের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের ক্রুজ ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এর মধ্যে ‘সুমার’ ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা প্রায় ২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার।
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত কেন আবার বাড়ল
যুক্তরাষ্ট্র ৩১ আগস্ট থেকে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে আইআরজিসির বিভিন্ন স্থাপনায় হামলা শুরু করে। এরপর ইরান পাল্টা জবাব হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে থাকা মার্কিন সামরিক অবস্থান ও সম্পদের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
ইরান জানিয়েছে, জর্ডান, বাহরাইন, কুয়েত এবং ইরাকের এরবিল এলাকায় থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও স্থাপনা লক্ষ্য করে তারা হামলা চালিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও ইরানের সামরিক স্থাপনায় নতুন দফায় হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে।
এই পাল্টাপাল্টি হামলায় আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালি নতুন করে সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে।
হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে উদ্বেগ
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে স্বাভাবিক সময়ে বিশ্বের মোট তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্যের প্রায় এক-চতুর্থাংশ পরিবহন হয়। ফলে এই জলপথে সংঘাত বা নৌ চলাচলে বাধা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ ও দামের ওপর বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বাড়লে মধ্যপ্রাচ্যের অন্য দেশগুলোও সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শক্তির বার্তা
খেইবার শেকানের ব্যবহার শুধু সামরিক হামলার বিষয় নয়, এর মাধ্যমে ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে একটি কৌশলগত বার্তাও দিতে চাইছে। ছয় মাস ধরে চলা সংঘাত ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলার পরও ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অক্ষত রয়েছে—এমন বার্তা দেওয়াই তেহরানের অন্যতম লক্ষ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা সামরিক ঘাঁটিগুলোকে একই সঙ্গে সুরক্ষিত রাখা। ইরানের মাঝারি ও দীর্ঘ পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রের পাশাপাশি ড্রোন ব্যবহারের সক্ষমতা এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়েছে।
ফলে ‘ক্যাসল ব্রেকার’ নামে পরিচিত খেইবার শেকান শুধু একটি ক্ষেপণাস্ত্র নয়; যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতে এটি তেহরানের প্রতিরোধ ও পাল্টা হামলার সক্ষমতার অন্যতম প্রতীক হয়ে উঠেছে।