হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

সফল ইরান, ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র

সমঝোতার এক সপ্তাহ

আমার দেশ অনলাইন

২১ জুন সুইজারল্যান্ডের চতুর্পক্ষীয় বৈঠকে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ এবং পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির অংশগ্রহণ করেন। ছবি: রয়টার্স

ফ্রান্সে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের এক সপ্তাহ পার হয়েছে। এই চুক্তির বড় খবর হলো, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এখন আর সরাসরি যুদ্ধে লিপ্ত নেই। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার অর্ধশতকের শত্রুতা এবং আঞ্চলিক শান্তি চুক্তির ব্যর্থতার ইতিহাস থাকা সত্ত্বেও এই যুদ্ধবিরতি টিকে রয়েছে। স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে ১৪ দফার এই ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তিটি আপাতত মার্কিন আইনপ্রণেতাদের সংশয় কাটিয়ে টিকে গেছে। মূলত যুদ্ধের চড়া অর্থনৈতিক মাশুল ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে উভয় পক্ষই এই মুহূর্তে সংঘাত এড়াতে চায়। তবে এটি কোনো স্থায়ী শান্তি নয়, বরং কঠিন রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো পরে নেওয়ার একটি কৌশল মাত্র। তা সত্ত্বেও এক সপ্তাহে উভয় পক্ষই কিছু সুবিধা পেতে শুরু করেছে।

হরমুজ প্রণালি আংশিক উন্মুক্ত

চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো ইরানের হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া। জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। গত বুধবার সেখানে ৭০টি জাহাজ পারাপার হয়েছে, যা মঙ্গলবারের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। তবে যুদ্ধ শুরুর আগের সময় দৈনিক ১০০টির বেশি চেয়ে এটি এখনও কম।

প্রণালিটি পুরোপুরি উন্মুক্ত হয়নি। ইরান এখনো উত্তর করিডোর দিয়ে যাতায়াতের জন্য পারমিট বা অনুমতি বাধ্যতামূলক রেখেছে। এছাড়া কেন্দ্রে মাইন থাকার কারণে জাহাজগুলো ওমান উপকূল ঘেঁষে একটি মাত্র লেন দিয়ে চলাচল করছে। এর মধ্যেই গত বৃহস্পতিবার প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজে ইরানি ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে। এই ঘটনা পারস্য উপসাগরে আটকে পড়া হাজার হাজার নাবিককে সরিয়ে নেওয়ার কাজকে ব্যাহত করেছে।

জেপি মরগ্যানের মতে, এই প্রণালি বন্ধ থাকায় ইতিহাসে সবচেয়ে বড় তেলের ধাক্কা লেগেছিল, যা বৈশ্বিক বাজারে ১৬০ কোটি ব্যারেল তেলের সরবরাহ কমিয়ে দেয়। এর ফলে তেলের উচ্চ মূল্য ও মজুত সংকটের কারণে মার্কিন অর্থনীতি বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছিল। ট্রাম্প নিজেও স্বীকার করেছেন, এটি অব্যাহত থাকলে মার্কিন অর্থনীতিতে মহামন্দা যুগের মতো বিপর্যয় নেমে আসতে পারত। তবে টোল ছাড়া জাহাজ চলাচলের এই সুযোগ চুক্তি স্বাক্ষরের পর মাত্র ৬০ দিন বহাল থাকবে। এরপর ইরান এবং ওমান প্রতি ব্যারেলে ১ থেকে ২ ডলার টোল দাবি করতে পারে, যা ইরানকে প্রতিদিন লাখ লাখ ডলার আয়ের সুযোগ দেবে।

তেল বিক্রি শুরু করেছে ইরান

প্রণালি উন্মুক্ত হওয়ার পর ইরানের ওপর থেকে মার্কিন ট্রেজারি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ায় তারা এখন যেকোনো দেশের কাছে তেল বিক্রি করতে পারছে। সমালোচকদের ভয়, এর মাধ্যমে ইরান তাদের সামরিক খাত পুনর্গঠন করবে এবং হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলোকে আবার শক্তিশালী করবে।

মৌলিক তথ্য অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পরপরই ইরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে ৩৮ লাখ ব্যারেল তেল রপ্তানি করেছে।

মেরিটাইম ইন্টেলিজেন্স কোম্পানি ট্যাংকারট্র্যাকার্স জানিয়েছে, ইরান বর্তমানে চীনের কাছে তেল বিক্রি করছে এবং কার্যক্রম আরো বাড়িয়েছে।

রিস্টাড কনসালটেন্সির ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রধান হোর্হে লিওন জানান, ইরান এখন দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল তেল বিক্রি করতে পারবে, যা যুদ্ধপূর্ব সময়ের চেয়ে এক-তৃতীয়াংশ বেশি। এখন বৈধভাবে বিক্রির সুযোগ পাওয়ায় ইরানকে আর বড় কোনো ছাড় বা ডিসকাউন্ট দিতে হচ্ছে না।

অন্যান্য আর্থিক প্রণোদনা

স্থায়ী চুক্তির আগে বিশ্বজুড়ে আটকে থাকা ১ হাজার কোটি ডলারের বেশি সম্পদ ফেরত চায় ইরান। মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা পর্যন্ত এই তহবিল ছাড় করা হবে না।

তবে সমঝোতা স্মারকে বলা হয়েছে, এই জব্দকৃত সম্পদ ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যবহারের জন্য ‘সম্পূর্ণ সহজলভ্য’ করা হবে, যদিও এর সময়সীমা বা পরিধি স্পষ্ট করা হয়নি।

এছাড়া দেশটির অর্থনীতি পুনর্গঠনে ৩০০ বিলিয়ন ডলারের একটি বেসরকারি বিনিয়োগ তহবিল গঠনের কথা বলা হয়েছে, যা মার্কিন করদাতাদের টাকায় হবে না। ট্রাম্প জি-৭ বৈঠকে জানিয়েছেন, অন্য দেশ ও অর্থদাতারা ইরানে বিনিয়োগ করতে পারবে, তবে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখনই বড় কোনো আগ্রহ দেখাবে না। চূড়ান্ত চুক্তির মাধ্যমে ইরানের ওপর থেকে সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে, যাতে তারা মুক্ত বাণিজ্য করতে পারে। তবে ট্রাম্পের একতরফা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ক্ষমতা কতটা রয়েছে তা স্পষ্ট নয়, কারণ এতে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদনের প্রয়োজন হতে পারে।

পারমাণবিক পরিদর্শন নিয়ে জটিলতা

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন, জাতিসংঘ পারমাণবিক পরিদর্শকদের ইরানে ‘অনন্তকাল’ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হবে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও একে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে অভিহিত করেছেন।

তবে বাস্তব পরিস্থিতি জটিল। ইরান সরকার এতে আদৌ সম্মত হয়েছে কি-না তা স্পষ্ট নয়। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই ইঙ্গিত দিয়েছেন, তেহরান কেবল পরমাণু অস্ত্র অ-বিস্তার চুক্তির (এনপিটি) বাধ্যবাধকতাগুলো মেনে চলছে। গত বছর মার্কিন হামলার পর তারা আইএইএ-র সাথে সহযোগিতা স্থগিত করেছিল।

আইএইএ মনে করে, এই সমঝোতা স্মারকে তাদের প্রধান ভূমিকা রয়েছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, যেকোনো পরিদর্শনের বিষয় চূড়ান্ত চুক্তির পর বিবেচনা করা হবে। অতীতে ইরাক ও ইরানের সাথে আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের এই পরিদর্শন সংক্রান্ত আইনি ক্ষমতা এবং সন্দেহভাজন স্থাপনায় প্রবেশাধিকার নিয়ে দীর্ঘ বিরোধের ইতিহাস রয়েছে।

লেবানন পরিস্থিতি চুক্তির জন্য হুমকি

সমঝোতা স্মারকে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে ও স্থায়ীভাবে সামরিক অভিযান বন্ধের কথা বলা হয়েছে। তবে লেবানন এই চুক্তির সবচেয়ে দুর্বল দিক হতে পারে। ইসরাইলের সমালোচকদের আশঙ্কা, এই চুক্তি হিজবুল্লাহকে পুনর্গঠনের সুযোগ দেবে। ইরান ট্রাম্পকে দিয়ে লেবাননকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করিয়ে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ওপর সামরিক অভিযান বন্ধের চাপ সৃষ্টি করছে।

তবে ইসরাইল নিজেকে এই চুক্তির অধীনে দায়বদ্ধ মনে করে না। অতীতেও ইসরাইল-হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতি ব্যর্থ হয়েছে। এই চুক্তির আগের দিনগুলোতেও ইসরাইলি বাহিনী লেবাননের গভীরে প্রবেশ করেছিল। যুদ্ধ সমাপ্তি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসন ও নেতানিয়াহুর দলের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ রয়েছে। ইসরাইল লেবাননসহ পুরো মধ্যপ্রাচ্যে নিজের নিরাপত্তা রক্ষায় স্বাধীনভাবে কাজ করার যে ঘোষণা দিয়েছে, তা ট্রাম্পের কর্তৃত্বকে পরীক্ষার মুখে ফেলবে। আর অন্যদিকে, ইরানও যেকোনো সময় পুনরায় হরমুজ প্রণালি বন্ধের হুমকি দিয়ে নিজেদের অবস্থান ধরে রাখতে চাইবে।

সূত্র: সিএনএন

এএম

মসজিদে হামলার দায়ে ইসরাইলি ৬ অভিবাসীর বিরুদ্ধে মামলা

মার্কিন স্থাপনায় পাল্টা হামলা চালাল ইরান

হরমুজ সংক্রান্ত হটলাইন চালুর দাবি যুক্তরাষ্ট্রের, নাকচ ইরানের

সৌদিতে ভ্রমণ নিষিদ্ধ ৩ দেশের নাগরিকদের

জাহাজে ড্রোন হামলার জবাবে ইরানে মার্কিন হামলা

ছাড় করা অর্থ দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্য কেনার দাবি ভিত্তিহীন: ইরানের স্পিকার

ইসরাইলকে ‘শর্তহীনভাবে’ লেবানন ছাড়তে বললেন হিজবুল্লাহ প্রধান

ধর্মীয় উগ্রতা নয়, ১৪০০ বছরের আইনি ভিত্তিতে চলে ইরান

ইরানের পক্ষে যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত ছিল তুরস্ক, দাবি ট্রাম্পের

লেবানন, গাজা ও সিরিয়া থেকে সরবে না ইসরাইলি বাহিনী: নেতানিয়াহু