ইয়েমেনে পশ্চিমা সমর্থিত ‘সরকারি বাহিনী ও ইরান সমর্থিত হুথিদের মধ্যে লড়াই তীব্র হচ্ছে। বিভিন্ন ফ্রন্টে অভিযান জোরদার করেছে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী। অন্যদিকে মধ্যাঞ্চলীয় মারিব শহর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে হুথিরা। দক্ষিণের তায়েজে সংঘর্ষের মধ্যে খাদ্য, রান্নার গ্যাস ও চিকিৎসাসামগ্রীর সংকট আরো গভীর হচ্ছে।
জাতিসংঘের সংস্থা আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) তথ্য অনুযায়ী, লড়াইয়ের কারণে বাস্তুচ্যুত হয়েছেন ২ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ।
ইয়েমেনে পশ্চিমা সমর্থিত সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, রোববার মারিব শহর লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে হুথিরা। অন্যদিকে দক্ষিণাঞ্চলীয় তায়েজে অগ্রগতির দাবি করেছে সরকারি সেনারা।
পশ্চিমা সমর্থিত সরকারপন্থি কমান্ডারদের ভাষ্য, শনিবার লাহিজ প্রদেশে সংঘর্ষে আট সেনা নিহত হয়েছেন। দক্ষিণ তাইজে ১২ জন হুথি যোদ্ধাকে হত্যার দাবিও করেছে সরকারি বাহিনী। তবে হতাহতের এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
গত মাসে লোহিত সাগরের উপকূলীয় এলাকায় হুথিদের অগ্রগতির পর যুদ্ধের এই নতুন পর্যায় শুরু হয়। হুথিদের দখলে থাকা ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে পাল্টা অভিযান শুরু করে সরকারি বাহিনী। ২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করে নেয় হুথিরা।
এদিকে ইয়েমেনে হুথিদের হামলার নিন্দা জানিয়েছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি)। সৌদি আরব, বাহরাইন, কুয়েত, ওমান, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতকে নিয়ে গঠিত এই জোট গত রোববার এক বিবৃতিতে সৌদি আরবের প্রতি সমর্থন জানায়।
বাহরাইনের রাজধানী মানামায় জোটের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের পর বিবৃতিটি দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, জোটের কোনো একটি সদস্যদেশের ওপর হামলা হলে তা ছয়টি দেশের ওপরই হামলা হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ক্ষেত্রে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির কথা উল্লেখ করে নিজেদের সুরক্ষায় সৌদি আরবের পদক্ষেপ নেওয়ার অধিকারের প্রতি সমর্থন জানানো হয়।
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের দাবি, রোববার ভোরে রিয়াদ ও সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের কাছে দুটি ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে রাজধানীর কাছে আরেকটি ড্রোন প্রতিহত করার কথাও জানিয়েছে জোটটি। তবে আগের ড্রোনটি কারা পাঠিয়েছিল, তা জানানো হয়নি।
উপসাগরীয় দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা হুথিদের বিরুদ্ধে বেসামরিক বিমানবন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় প্রাণঘাতী হামলা চালানোর অভিযোগ করেছেন। তারা গোষ্ঠীটির বিরুদ্ধে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরো কঠোরভাবে কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের প্রতি হুথিদের আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ গত ১৫ অক্টোবর এক বিবৃতিতে সৌদি আরবে হুথিদের হামলা এবং লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচলের প্রতি হুমকির নিন্দা জানায়। জিসিসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা ওই বিবৃতিকে স্বাগত জানিয়েছেন।
ইয়েমেনের পশ্চিমা সমর্থিত সরকারও হুথিদের হামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এবং অক্টোবর মাসের জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতি আগলিয়া বালতাকে পাঠানো চিঠিতে এ আহ্বান জানানো হয়। চিঠিতে ইয়েমেনের অস্থায়ী সরকারি সদর দপ্তর এডেনের প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে হামলার কথা উল্লেখ করেছে সরকার।
রোববার সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মনসুর বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের সঙ্গে বৈঠক করেন সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান আল সৌদ। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ওয়ামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়।
তাইজে বাড়ছে খাদ্য ও চিকিৎসাসংকট
যুদ্ধের কারণে ইয়েমেনে ২ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা। তাদের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার তায়েজ প্রদেশের বাসিন্দা। সেখানে লড়াইয়ের কারণে সরবরাহের পথগুলো ব্যাহত হয়েছে।
আলজাজিরার প্রতিবেদক হাদিল আল-ইয়ামানি তায়েজ থেকে জানিয়েছেন, শহরটির পশ্চিম প্রবেশপথ দিয়ে পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দিয়েছে হুথি বাহিনী। ফলে রান্নার গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। খাদ্যের মজুতও দ্রুত কমে আসছে।
অবরোধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী স্থানীয় একটি কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শহরটিতে খাদ্যের দাম পাঁচ গুণ বেড়েছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে বলেছে, তাইজের ১২টি হাসপাতালে আর মাত্র চার দিনের জ্বালানি মজুত রয়েছে। হাসপাতালগুলোতে অস্ত্রোপচারের প্রয়োজনীয় সরঞ্জামও শেষ হয়ে গেছে। শহরটিতে কলেরার প্রাদুর্ভাবের মধ্যে অক্সিজেন ও ওষুধের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। এতে রোগীদের চিকিৎসা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
এএম