গাজা উপত্যকা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পুরোনো পরিকল্পনা আবারও নতুন করে সামনে আনছে ইসরাইল। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ সম্প্রতি বলেছেন, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছা অভিবাসন’ ছাড়া এই সংকটের কোনো বাস্তব সমাধান নেই। তার বক্তব্যে নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইসরাইলের আসন্ন নির্বাচন সামনে রেখে আয়োজিত এক রাজনৈতিক সম্মেলনে কাটজ বলেন, গাজার ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে একসময় ‘স্থগিত’ রাখা হয়েছিল, কিন্তু তা বাতিল হয়নি। তার দাবি, পরিকল্পনাটি এখনো আলোচনায় রয়েছে এবং বাস্তবায়নের জন্য শুধু মার্কিন সমর্থন প্রয়োজন।
কাটজের বক্তব্য অনুযায়ী, গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের অন্য দেশে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করা হলে ইসরাইল তাদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত। তিনি বলেন, প্রয়োজনে সমুদ্র, আকাশ কিংবা অন্য যেকোনো পথে তাদের বের করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা সম্ভব। তবে এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বাধা হলো অন্য দেশগুলোর গাজাবাসীকে গ্রহণে অনাগ্রহ।
গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার ধারণাটি নতুন নয়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ট্রাম্প ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর গাজা যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং সেখানকার বাসিন্দাদের অন্যত্র সরিয়ে দিয়ে এলাকাটিকে ‘মধ্যপ্রাচ্যের রিভিয়েরা’ হিসেবে গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ওই প্রস্তাব বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে। জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও গাজার জনগণের যেকোনো ধরনের জোরপূর্বক উচ্ছেদ ঠেকানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এরপর ইসরাইল ‘স্বেচ্ছা অভিবাসন’কে সামনে রেখে একটি বিশেষ দপ্তরও গঠন করে। কাটজের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে গঠিত ওই দপ্তরের উদ্দেশ্য হিসেবে তৃতীয় কোনো দেশে গাজাবাসীদের ‘নিরাপদ ও তত্ত্বাবধানে’ চলে যাওয়ার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছিল। পরে ইসরাইলি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে গাজা থেকে ফিলিস্তিনিদের সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা পুনরুজ্জীবিত করার খবরও প্রকাশিত হয়।
এদিকে গাজা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শান্তি পরিকল্পনায় ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের পরিবর্তে তাদের গাজায় থাকার এবং পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। সৌদি আরব, জর্ডান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসরসহ কয়েকটি আরব দেশও ওই পরিকল্পনাকে স্বাগত জানিয়েছিল। তবে বর্তমানে শান্তি পরিকল্পনা ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে মতবিরোধে আটকে আছে। ইসরাইল হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহারে রাজি নয়; অন্যদিকে হামাস ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের আগে অস্ত্র ছাড়তে রাজি নয়।
ইসরাইলি ডানপন্থি রাজনীতিকদের মধ্যেও গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপনের দাবি জোরালো হয়েছে। জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির সম্প্রতি গাজার বিভিন্ন অংশে ইহুদি বসতি পুনঃস্থাপনের কথা বলেছেন এবং ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছা অভিবাসনে’ উৎসাহিত করার দাবি জানিয়েছেন। একই সময়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণও অব্যাহত রয়েছে।
ফলে গাজার শান্তি পরিকল্পনা অচল হয়ে পড়ার প্রেক্ষাপটে কাটজের সাম্প্রতিক বক্তব্যকে নিছক নির্বাচনী বক্তব্য হিসেবে দেখছেন না পর্যবেক্ষকেরা। বিশেষ করে ‘পরিকল্পনাটি বাতিল হয়নি’ এবং মার্কিন সমর্থনের প্রয়োজন রয়েছে—এই বক্তব্য গাজাবাসীর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করেছে। ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কাটজের বক্তব্যের বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।