হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

কেন নতুন নিরাপত্তা জোট খুঁজছে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো

আল জাজিরার বিশ্লেষণ

আমার দেশ অনলাইন

ছবি: সংগৃহীত

বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভর না করে আরো বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানোর দিকে জোর দিতে পারে। কারণ এই যুদ্ধের প্রভাব পুরো অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।

তেহরান ও ওয়াশিংটন স্থায়ী সমঝোতার লক্ষ্যে আলোচনা চালিয়ে গেলেও, উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ (জিসিসি) ভুক্ত দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা আরো শক্তিশালী করতে নতুন নতুন অংশীদার খুঁজছে। যুদ্ধের সময় এসব দেশের কিছু অংশেও ইরানের হামলা হয়েছিল।

যুদ্ধের আগেই সৌদি আরব পাকিস্তানের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছিল। ভবিষ্যতে এ ধরনের সহযোগিতা এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশেও সম্প্রসারিত হতে পারে।

গত কয়েক বছর ধরে উপসাগরীয় দেশগুলো ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে আধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনছে। একই সঙ্গে তারা রাশিয়া ও চীনের সঙ্গেও ভালো সম্পর্ক বজায় রাছেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর এই বহুমুখী কৌশল আরো জোরদার হবে।

আরব গালফ স্টেটস ইনস্টিটিউটের গবেষক আনা জ্যাকবস খালাফ বলেন, নতুন নিরাপত্তা অংশীদার খোঁজার অর্থ এই নয় যে তারা যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দিতে চায়।

তার ভাষায়, ‘সৌদি আরবের মতো দেশের লক্ষ্য হলো আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে ইরান ও ইসরাইল—উভয়ের প্রভাব মোকাবিলা করা।’

তিনি আরো বলেন, এর অর্থ পাকিস্তানকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প বানানো নয়; বরং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ানো। যেমন সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর ও পাকিস্তানকে নিয়ে একটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা জোট গঠন করা। পাশাপাশি নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতাও বাড়ানো।

ইরানে হামলা

২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনাঘাঁটি, বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা এবং কিছু হোটেলেও হামলা চালায়।

পরে যুদ্ধবিরতির জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করলেও, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বাহরাইন ও কুয়েতে মার্কিন সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আবারো ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।

বিশ্লেষকদের মতে, শুধু ইরান নয়, উপসাগরীয় অনেক দেশ ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান সামরিক অভিযান ও সম্প্রসারণবাদী নীতিকেও নিজেদের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখছে।

গত বছর গাজায় যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতার সময় হামাস নেতাদের হত্যার উদ্দেশ্যে ইসরাইল কাতারের রাজধানী দোহায় বোমা হামলা চালায়।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই হামলায় অসন্তোষ প্রকাশ করেন এবং জানান, এ হামলার বিষয়ে তিনি আগে কিছু জানতেন না বা অনুমোদন দেননি।

আনা জ্যাকবস খালাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ইরানে হামলা এবং তার পাল্টা জবাবে ইরানের আক্রমণ উপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য নজিরবিহীন নিরাপত্তা সংকট তৈরি করেছে। এমনকি ইরান কিছু সময়ের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়, যা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথগুলোর একটি।

তার মতে, এই যুদ্ধের পর কিছু উপসাগরীয় দেশ ভাবতে শুরু করেছে যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করা ঠিক হবে না।

তিনি বলেন, ‘এই যুদ্ধের পর অনেক দেশ প্রশ্ন তুলছে, যুক্তরাষ্ট্র আদৌ তাদের নিরাপত্তার নির্ভরযোগ্য রক্ষক কি না।’

কুইন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষক অ্যানেল শিলাইনও মনে করেন, জিসিসি ভুক্ত দেশগুলো ভবিষ্যতে চীন, তুরস্ক ও ইউরোপের সঙ্গে নিরাপত্তা সম্পর্ক আরো গভীর করবে।

তিনি বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে চাইবে, কিন্তু আর পুরোপুরি তার ওপর নির্ভর করতে চাইবে না।’

তার মতে, যুদ্ধের সময় মার্কিন ঘাঁটিগুলো ইরানের হামলা ঠেকাতে পারেনি। বরং এসব ঘাঁটি থাকার কারণেই সেগুলো হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিল।

ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা

হামলার কারণে ক্ষোভ থাকলেও উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করেনি।

বরং তারা ধীরে ধীরে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।

কিছু বিশেষজ্ঞের মতে, অর্থনৈতিক সম্পর্ক শক্তিশালী হলে সেটাই ভবিষ্যতে সবচেয়ে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা হতে পারে।

যদি উপসাগরীয় দেশ ও ইরানের অর্থনীতি একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে যায়, তাহলে ভবিষ্যতে হামলা চালানোর আগে ইরান অনেক বেশি চিন্তা করবে।

অ্যানেল শিলাইন বলেন, ‘উপসাগরীয় দেশগুলো এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছে, যাতে ভবিষ্যতে তাদের ওপর হামলা চালানো ইরানের জন্যও বড় ক্ষতির কারণ হয়।’

যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সম্প্রতি বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে এমন অর্থনৈতিক আলোচনা শুরু করেছে, যা আগে কখনো হয়নি।

তার মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ইরানকে বলছে—কোন কোন পরিবর্তন আনলে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়বে। ইরানও এসব বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব দেখাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ভবিষ্যৎ অবস্থান

এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রও নতুন করে ভাবছে।

ট্রাম্প প্রশাসন জানায়, মধ্যপ্রাচ্য আর তাদের প্রধান অগ্রাধিকার নয়। বরং তারা পশ্চিম গোলার্ধসহ অন্য গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলে বেশি মনোযোগ দিতে চায়।

তবে একই সঙ্গে ইসরাইলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিশ্রুতি রয়েছে।

ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এখনো লেবাননসহ বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন, যা যুদ্ধবিরতি চুক্তির লঙ্ঘন।

ওয়াশিংটনে ইসরাইলের সমর্থক অনেকেই ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সমঝোতার বিরোধিতা করছেন এবং ইসরাইলের সামরিক অভিযান অব্যাহত রাখার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের অনেক স্বার্থ এক হলেও সব বিষয়ে তাদের অবস্থান এক নয়।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি চুক্তিকেও সমর্থন দিয়েছে, যাতে লেবাননে হিজবুল্লাহ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত ইসরাইলকে সামরিক পদক্ষেপ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষক অ্যানেল শিলাইনের মতে, যদি ইরানের সঙ্গে একটি স্থায়ী চুক্তি হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র ধীরে ধীরে মধ্যপ্রাচ্যে তার সামরিক ভূমিকা কমাতে পারবে। তবে ইসরাইল যদি উত্তেজনা বাড়িয়ে রাখে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র আবারো সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— ইসরাইল কী করবে।’

তার মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের ওপর চাপ দিয়ে সমঝোতা বজায় রাখতে পারে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব আরো বেশি নিজেরাই নিতে পারবে, যা দীর্ঘমেয়াদে অনেক বেশি কার্যকর ও টেকসই হবে।

সবশেষে আনা জ্যাকবস খালাফ বলেন, গাজায় ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে দখলদারিত্ব সম্প্রসারণ এবং লেবানন ও সিরিয়ায় ধারাবাহিক হামলার কারণে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন ইসরাইলের সামরিক নীতিকেও পুরো মধ্যপ্রাচ্যের জন্য বড় হুমকি হিসেবে দেখছে। এমনকি যেসব আরব দেশ ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেছে, তারাও এসব কর্মকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছে।

আরএ

নেতানিয়াহুকে হটাতে বিরোধী জোটের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়াল আরব দলগুলো

ইসরাইলের নির্বাচনে মুসলিম দলগুলোর আকাশচুম্বী সাফল্য, কেন বাড়ছে গুরুত্ব

নেতানিয়াহুর জোটের সম্ভাব্য আসন ৫৪, বিরোধীদের ৪৯, আরব দলগুলোর ১৯

ইসরাইলের ক্ষমতার চাবিকাঠি কি মনসুর আব্বাস ও ইউসুফ জাবারিনের হাতে

ইসরাইলের নির্বাচনে আরব দলগুলোর চমক

নেতানিয়াহু কি সরকার গঠন করতে পারবেন

ইসরাইলের নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না কেউ, এখন কী হবে

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় ৪৭ বিলিয়ন ছাড়াল

শক্তিশালী জাতীয় সরকার গঠন করা হবে, নেতানিয়াহুর ঘোষণা

ইসরাইলের নির্বাচনে এগিয়ে নেতানিয়াহু জোট, সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি কেউই