ইরানের বিরুদ্ধে ছয় মাস ধরে চলা বিমানযুদ্ধ সত্ত্বেও তেহরানকে পরাজিত করা সম্ভব হয়নি—এমন মূল্যায়ন দিয়ে নতুন কৌশলের সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইলি এক নিরাপত্তা বিশ্লেষক। ইসরাইলি সংবাদপত্র জেরুজালেম পোস্টে প্রকাশিত ওই লেখাকে কেন্দ্র করেই ‘ইসরাইলের খেলা’ শিরোনামের বিশ্লেষণটি লিখেছেন ড. হাসান বুখারি। তার মূল প্রশ্ন, সামরিক শক্তির ব্যাপক ব্যবহারের পরও যদি কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জিত না হয়, তাহলে নতুন করে যে কৌশলের কথা বলা হচ্ছে, তার প্রকৃত উদ্দেশ্য কী এবং তা কতটা বাস্তবসম্মত?
জেরুজালেম পোস্টের লেখক এ জে জাফ নিজেকে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, সংকট ব্যবস্থাপনা ও ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে পরিচয় দেন। তার লেখায় বলা হয়েছে, পেন্টাগন সম্প্রতি ইরানকে কেন্দ্র করে ‘সৃজনশীল’ বা প্রচলিত ধারার বাইরে নতুন ধারণা খুঁজছে। অর্থাৎ সামরিক অভিযান চালিয়ে প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ার পর ওয়াশিংটনে ইরানকে মোকাবিলার বিকল্প পথ নিয়ে আলোচনা চলছে।
এই জায়গাতেই বিশ্লেষক বুখারি প্রশ্ন তুলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সময় ধরে বিমান হামলা চালিয়েও যদি দেশটির সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধের ক্ষমতা পুরোপুরি ভেঙে দেওয়া না যায়, তাহলে আরো ‘আউট অব দ্য বক্স’ কৌশল কি সমস্যার সমাধান করবে? তার দৃষ্টিতে, যুদ্ধকে কেবল সামরিক শক্তির হিসাব দিয়ে দেখলে ইরানের রাজনৈতিক ও কৌশলগত সক্ষমতার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যায়।
ইরান-ইসরাইল সংঘাতের সাম্প্রতিক পর্যায় ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ইরানের সামরিক সক্ষমতা, আঞ্চলিক মিত্রদের নেটওয়ার্ক এবং হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থান দেশটিকে শুধু একটি সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করাকে কঠিন করে তুলেছে। একই সঙ্গে ইরানের ওপর চাপ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ফলে সংঘাতের পরিধি আরো বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
বুখারির বিশ্লেষণে আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে যুদ্ধের রাজনৈতিক লক্ষ্য ও বাস্তব ফলাফলের মধ্যকার ব্যবধান। কোনো সামরিক অভিযান যদি শত্রুর অবকাঠামোতে ব্যাপক ক্ষতি করতে পারে, কিন্তু তার রাজনৈতিক নেতৃত্বকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে না পারে কিংবা প্রতিরোধের সক্ষমতা পুরোপুরি ধ্বংস করতে না পারে, তাহলে সেই অভিযানকে বিজয় হিসেবে ঘোষণা করা কতটা যৌক্তিক—এ প্রশ্ন থেকেই যায়।
ইসরাইলি বিশ্লেষকের প্রস্তাবিত নতুন কৌশল নিয়ে আলোচনা তাই শুধু ইরানকে ঘিরে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি, ইসরাইলের নিরাপত্তা কৌশল এবং ভবিষ্যৎ সংঘাতের সম্ভাব্য বিস্তার। সামরিক শক্তি দিয়ে ইরানকে দুর্বল করার চেষ্টা যত দীর্ঘ হবে, ততই ওয়াশিংটনকে অর্থনৈতিক, কূটনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রতিক্রিয়ার হিসাব করতে হবে।
এর মধ্যে ইসরাইলও বিভিন্ন সীমান্তে সামরিক প্রস্তুতি জোরদার করছে। ৬ সেপ্টেম্বর ইসরাইলি সেনাবাহিনী জর্ডান সীমান্তসংলগ্ন এলাকা ও ইলাত অঞ্চলে বড় ধরনের সামরিক মহড়া করেছে। মহড়ায় আকাশ, স্থল ও সমুদ্রপথে আকস্মিক হামলা ও অনুপ্রবেশের পরিস্থিতি মোকাবিলার অনুশীলন করেছে বলে সেনাবাহিনী জানিয়েছে। এর আগে গোলান মালভূমিতেও অনুরূপ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে।
সব মিলিয়ে ‘ইসরাইলের খেলা’ বিশ্লেষণটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে—যুদ্ধের লক্ষ্য যদি সামরিক বিজয় হয়, তবে সেই বিজয়ের সংজ্ঞা কী? ইরানকে দুর্বল করার জন্য নতুন কৌশল গ্রহণ করা হলেও তা যদি সংঘাতকে আরো বিস্তৃত করে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য শক্তিকে সরাসরি জড়িয়ে ফেলে, তাহলে কাঙ্ক্ষিত ফলের পরিবর্তে আরও বড় আঞ্চলিক সংকট তৈরি হতে পারে।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পরবর্তী পদক্ষেপ তাই শুধু তেহরানের জন্য নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে ক্ষতিগ্রস্ত করা সম্ভব হলেও একটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ইচ্ছা, সামাজিক স্থিতি ও প্রতিরোধের সক্ষমতা ভেঙে দেওয়া অনেক বেশি জটিল। আর এই বাস্তবতাই ইরানকে ঘিরে নতুন কৌশলের সন্ধানকে আরো বিতর্কিত করে তুলেছে।