গাজায় বাস্তুচ্যুত মানুষের তাঁবুতে হামলা চালিয়ে ঘুমন্ত শিশুসহ বেশ কয়েকজনকে হত্যা করেছে ইসরাইলি বাহিনী। অথচ গাজার এসব অংশকে ‘নিরাপদ অঞ্চল’ ঘোষণা করে ‘যুদ্ধবিরতি’ করা হয়েছিল।
চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে, শনিবার দুটি অস্থায়ী তাঁবুতে ইসরাইলি ড্রোন হামলায় দুই ভাই-বোন নিহত হয়েছে। নিহতরা হলো ১৫ বছর বয়সি ইসলাম মুসা এবং তার ৩০ বছর বয়সি ভাই আবদুল্লাহ মুসা।
গাজার সিভিল ডিফেন্স জানিয়েছে, খান ইউনিসের পশ্চিমে আল-মাওয়াসি এলাকার ওই হামলার স্থান থেকে সাতজন আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের নাসের হাসপাতাল ও রেড ক্রস হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। হাসপাতালের আঙিনায় সাদা কাফনে জড়ানো ভাই-বোনের লাশের পাশে আত্মীয়স্বজনকে কাঁদতে দেখা গেছে।
এর আগে দক্ষিণ গাজায় ইসরাইলি বোমাবর্ষণে আহত হওয়া ১০ বছর বয়সি আরো এক ফিলিস্তিনি শিশু মারা গেছে।
নাসের হাসপাতালের একটি সূত্র আনাদোলু বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছে, দিন কয়েক আগে আল-মাওয়াসিতে ইসরাইলি হামলায় আহত হওয়া ওয়ালিদ ইউসুফ আবু জাজার নামের ওই শিশুটি চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়।
আল-শিফা হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী পশ্চিম গাজা শহরে বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের আশ্রয় নেওয়া আরেকটি তাঁবুতেও আঘাত হেনেছে। এতে অন্তত ১২ জন আহত হয়েছে।
ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির অ্যাম্বুলেন্স-সেবা জানিয়েছে, আহতদের বেশির ভাগই নারী এবং তাদের মধ্যে দুজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
গাজা শহর থেকে আলজাজিরার তারেক আবু আজুম জানিয়েছেন, ‘যুদ্ধবিরতি’ সত্ত্বেও ইসরাইল তাদের হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘গত বছর যুদ্ধবিরতি হওয়ার পর থেকেই সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করা ইসরাইলি নীতির মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
তিনি আরো জানান, ‘গত কয়েক ঘণ্টায় আমরা খবর পেয়েছি যে ইসরাইলি ড্রোনগুলো আল-মাওয়াসি এলাকার অস্থায়ী তাঁবুতে আঘাত হেনেছে। যুদ্ধবিরতির শর্ত অনুযায়ী এই এলাকাকে হাজার হাজার ফিলিস্তিনির জন্য নিরাপদ অঞ্চল হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছিল।’
আজুম বলেন, ‘আমরা ড্রোন হামলার তীব্রতা বাড়ানোর সাক্ষী হচ্ছি এবং এখনো মাথার ওপরে ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে।’
শিশুদের লক্ষ্য করে ইসরাইলের পরিকল্পিত হামলা
জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে গাজায় শিশুদের লক্ষ্যবস্তু করার বিষয়টি নথিভুক্ত করার পর ইসরাইলের ফিলিস্তিনি শিশু হত্যার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশই শিশু।
শিশুদের অধিকারকর্মী রাচেল আকুরসো (মিস রাচেল নামে পরিচিত) এই প্রতিবেদনের একজন সহলেখকের সঙ্গে কথা বলেছেন। তিনি বলেন, এই হত্যাকাণ্ড থামাতে বিশ্ব ব্যর্থ হয়েছে।
শুক্রবার তিনি বলেন, ‘আমরা দেখছি আমাদের নিজেদের সন্তানদের মতো শিশুরাই একটি গণহত্যার মধ্যে টিকে থাকার চেষ্টা করছে, তবু কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, কোনো জবাবদিহি নেই।’
প্রতিবেদনের সহলেখক এবং জাতিসংঘের কমিশনার ক্রিস সিডোটি এই প্রতিবেদনের ফলাফলকে ‘একেবারে হৃদয়বিদারক’ বলে অভিহিত করেছেন।
সিডোটি আরো বলেন, ‘রাষ্ট্রগুলোর পদক্ষেপ নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা রয়েছে। আমাদের সাড়ে তিন বছর আগেই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল, তবে শুরু করার জন্য এখনো খুব বেশি দেরি হয়ে যায়নি।’
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ৭৩ হাজার ৪৩ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে এবং ১ লাখ ৭৩ হাজার ৪১৭ জন আহত হয়েছে।
মন্ত্রণালয় আরো জানায়, গত অক্টোবরে ‘যুদ্ধবিরতি’ শুরু হওয়ার পর থেকেই ইসরাইলি বাহিনী ১ হাজার ৩১ জন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে এবং ৩ হাজার ৩০৯ জনকে আহত করেছে।
সূত্র: আলজজিরা
এএম