হোম > বিশ্ব > মধ্যপ্রাচ্য

ধর্মীয় উগ্রতা নয়, ১৪০০ বছরের আইনি ভিত্তিতে চলে ইরান

আমার দেশ অনলাইন

ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা রুহুল্লাহ খোমেনি। ছবি: সংগৃহীত

পশ্চিমা বিশ্বে ইরানকে কেবল একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র হিসেবে চিত্রায়িত করা হলেও দেশটির শাসনব্যবস্থার আসল রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। আয়াতুল্লাহ খোমেনি কোনো ধর্মান্ধ নেতা ছিলেন না। তিনি ছিলেন ইসলামি আইনশাস্ত্রের এক মহান পন্ডিত।

এক নিবন্ধে এমনটাই দাবি করেছেন বিশিষ্ট গবেষক ও আইনজীবী লিম টিন।

তার মতে, পশ্চিমা প্রচারণার কারণে ইরানের প্রাতিষ্ঠানিক ও সাংবিধানিক জটিল কাঠামো এবং এর পেছনের আইনি ভিত্তি বিশ্ববাসীর কাছে আড়ালে রয়ে গেছে।

নিবন্ধে লিম টিন উল্লেখ করেন, ইরানের একটি নিজস্ব সংবিধান, নির্বাচিত সংসদ, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ও সুপ্রিম কোর্ট রয়েছে। এছাড়া সেখানে একটি সাংবিধানিক পর্যালোচনা কাউন্সিল রয়েছে। এই পুরো ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠাতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা আইনজ্ঞ।

শব্দ চয়ন পশ্চিমা প্রচারণা

লিম টিন বলেন, পশ্চিমা এস্টাবলিশমেন্ট ইরানকে হেয় করতে অত্যন্ত সচেতনভাবে ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ শব্দটি বেছে নিয়েছে। এই শব্দটির মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছে যে, ইরান কোনো আইন ছাড়াই কেবল ধর্মীয় উগ্রতা দিয়ে পরিচালিত হয়। অথচ ইরানের শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছে ১৪ শ বছরের পুরোনো এবং অত্যন্ত সমৃদ্ধ ইসলামি আইনশাস্ত্রের (ফিকহ) ওপর ভিত্তি করে। পশ্চিমা সংবাদমাধ্যম ইরানকে এমনভাবে উপস্থাপন করে যাতে দেশটির ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো বা হামলা চালানো সহজ হয় এবং মানুষের মনে কোনো অপরাধবোধ না জাগে।

খোমেনির পড়াশোনা

ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের মূল ভিত্তি হলো ‘ভেলায়েত-ই-ফকিহ’ বা ইসলামি আইনজ্ঞের অভিভাবকত্ব। আয়াতুল্লাহ খোমেনি কেবল একজন ধর্মীয় প্রচারক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ‘ফকিহ’ বা আইনশাস্ত্রের মাস্টার। ১৯২২ সালে তিনি পবিত্র শহর কোমে যান। সেখানে তিনি আয়াতুল্লাহ আবদুল করিম হায়েরি ইয়াজদির অধীনে পড়াশোনা শুরু করেন। ৩০ দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ‘ইজতিহাদ’ বা স্বাধীন আইনি যুক্তির সনদ লাভ করেন এবং একজন ‘মুজতাহিদ’ হন। এর ফলে তিনি কোরআন ও হাদিস থেকে সরাসরি নতুন আইনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করেন।

আইনশাস্ত্রের পাশাপাশি তিনি দর্শন, নীতিশাস্ত্র এবং ইসলামি আধ্যাত্মবাদ শিক্ষা দিতেন। ১৯৬১ ও ১৯৭০ সালে যথাক্রমে গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ বোরুজেরদি এবং গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ হাকিমের মৃত্যুর পর খোমেনি লাখ লাখ মানুষের কাছে অনুসরণের উৎস হিসেবে স্বীকৃতি পান। এই পদটি কোনো রাজনৈতিক বা মনোনীত পদ নয়, বরং পণ্ডিতদের মধ্যে সর্বোচ্চ পাণ্ডিত্যের ভিত্তিতে এই স্বীকৃতি মেলে। নির্বাসনে থাকা অবস্থাতেও তার আইনি নির্দেশনাবলী অনুসারীদের কাছে বাধ্যতামূলক ছিল।

১৯৬৩ সালে শাহের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ায় খোমেনি গ্রেফতার হন। ওই সময় রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তার মৃত্যুদণ্ড হতে পারত। কিন্তু ১৯০৬ সালের ইরানি সংবিধানের একটি ধারা অনুযায়ী জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতাদের মৃত্যুদণ্ড থেকে দায়মুক্তি দেওয়া হতো। আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ কাজেম শরিয়তমাদারিসহ জ্যেষ্ঠ আলেমদের প্রতিবাদের মুখে শাহের সরকার তার মৃত্যুদণ্ড মওকুফ করে এবং তাকে নির্বাসনে পাঠাতে বাধ্য হয়।

যা প্রমাণ করে ১৯৭৯ সালের আগেই ইরানে সাংবিধানিক চিন্তাভাবনা বিদ্যমান ছিল। খোমেনি আইনশাস্ত্র, আইনি দর্শন এবং আধ্যাত্মবাদের ওপর ৪০টিরও বেশি বই লিখেছেন। তার লেখা ‘কিতাব আল-বায়’ বা ক্রয়-বিক্রয় সংক্রান্ত আইন এবং দুই খণ্ডের ‘তাহরির আল-ওয়াসিলা’ অত্যন্ত বিখ্যাত ও জটিল আইনি গ্রন্থ।

জনগণের রায় সাংবিধানিক কাঠামো

১৯৭৯ সালের মার্চ ও এপ্রিলে ইরানে ইসলামি প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য একটি জাতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে রেকর্ডসংখ্যক ভোটার অংশ নেন এবং ৯৮ দশমিক ২ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দেন।

লিম টিন এটিকে ২০১৬ সালের ব্রিটেনের ব্রেক্সিট গণভোটের সাথে তুলনা করে বলেন, ব্রেক্সিটকে বিশ্ব গণতান্ত্রিক স্বীকৃতি দিলেও ইরানের গণভোটকে স্বৈরতন্ত্র হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ ইরান ১৯৫৩ সালে সিআইএ-র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে বসানো শাহের স্বৈরশাসন থেকে মুক্ত হয়ে এই ব্যবস্থা বেছে নিয়েছিল।

ইরানের সংবিধানে একটি চমৎকার ভারসাম্য রয়েছে। এর সর্বোচ্চ নেতা জনগণের দ্বারা নির্বাচিত, বিশেষজ্ঞ পরিষদ দ্বারা মনোনীত হন। ২৯০ সদস্যের একটি নির্বাচিত সংসদ (মজলিস) আইন পাস করে এবং প্রশাসনকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে। গার্ডিয়ান কাউন্সিল আইনগুলোর সাংবিধানিক বৈধতা পরীক্ষা করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট বা ফ্রান্সের কনস্টিটিউশনাল কাউন্সিলের মতো কাজ করে।

আইনজীবীর দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক আইন

ব্রিটিশ কমন ‘ল’ ঐতিহ্যে প্রশিক্ষিত একজন আইনজীবী হিসেবে লিম টিন বলেন, আন্তর্জাতিক আইনের মূল ভিত্তি হলো ‘কমিটি অব লজ’ বা অন্য দেশের আইনি ব্যবস্থার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা। তিনি ইতালির ফৌজদারি আদালতের উদাহরণ দিয়ে বলেন, সেখানে আসামিদের শপথ নিয়ে সাক্ষ্য দিতে হয় না, যা কমন ‘ল’-এর চেয়ে আলাদা হলেও নিকৃষ্ট নয়। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সূচনাকালে দাসদের মানুষের তিন-পঞ্চমাংশ ধরা হতো, নারীদের ভোটাধিকার ছিল না এবং পূর্ণ নাগরিক অধিকার পেতে প্রায় দুই শতাব্দী লেগেছে। সেই তুলনায় ইরানের শাসনব্যবস্থার বয়স মাত্র ৪৬ বছর।

লিম টিন স্বীকার করেন, ইরানে রাজনৈতিক স্বাধীনতার অভাব, নারী ও সংখ্যালঘুদের অধিকারের সীমাবদ্ধতা এবং গার্ডিয়ান কাউন্সিলের প্রার্থী বাছাইয়ের কড়াকড়ির মতো প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যা ও গণতান্ত্রিক ঘাটতি রয়েছে। তবে সমালোচনা করতে হবে প্রকৃত সত্যকে সামনে রেখে, প্রচারণার ওপর ভিত্তি করে নয়। ইরান ৯ কোটি ৩০ লাখ মানুষের একটি সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্র, যা একটি সুপ্রতিষ্ঠিত আইনি ঐতিহ্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। পশ্চিমা প্রচারণা এই সত্য অস্বীকার করতে চায়, কারণ ধর্মান্ধদের একটি দেশকে ধ্বংস করা সহজ, কিন্তু একটি বৃহৎ সাংবিধানিক প্রজাতন্ত্রকে সহজে মুছে ফেলা যায় না।

গবেষণার জন্য তিনি হামিদ আলগারের অনূদিত খোমেনির রাজনৈতিক লেখা এবং সাইদ আমির আরজোমান্দের 'দ্য টারবান ফর দ্য ক্রাউন' বইটি পড়ার পরামর্শ দেন। লিম টিনের এই নিবন্ধের সাথে নাজাফে নির্বাসনে থাকার সময় খোমেনির পড়াশোনার একটি ছবিও যুক্ত রয়েছে।

এএম

ইসরাইলকে ‘শর্তহীনভাবে’ লেবানন ছাড়তে বললেন হিজবুল্লাহ প্রধান

ইরানের পক্ষে যুদ্ধে নামতে প্রস্তুত ছিল তুরস্ক, দাবি ট্রাম্পের

লেবানন, গাজা ও সিরিয়া থেকে সরবে না ইসরাইলি বাহিনী: নেতানিয়াহু

হরমুজে ইরানের ড্রোন হামলা, আটকে পড়া নাবিকদের উদ্ধার অভিযান স্থগিত

১০৫ শতাংশ বেড়েছে হরমুজে জাহাজ চলাচল

দরজা খুলতে দেরি, বেডরুমে ঢুকে ফিলিস্তিনি যুবককে গুলি করে হত্যা

ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ায় ৫ জন নিহত

ইরান এখন ‘শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র’ হিসেবে স্বীকৃত: পেজেশকিয়ান

লেবাননে বহু পরিবারের ফেরার মতো কোনো ঘর নেই: জাতিসংঘ

গাজায় শিশুদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে গণহত্যা বজায় রেখেছে ইসরাইল