ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীর বড় জয় হয়েছে। বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছে অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। লোহিত সাগরের কৌশলগত বন্দরনগরী মোখা দখল হুথিদের বড় ধরনের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ একটি নৌপথে চলাচলকারী জাহাজের ওপর চাপ সৃষ্টির সক্ষমতা বাড়তে পারে, প্রভাব বিস্তারের সুযোগ করে দিতে পারে এবং জ্বালানি বাজারে নতুন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইয়েমেন বিষয়ক গবেষক ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, মোখা দখলের ফলে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও তাদের মিত্ররা আরো কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়বে। নিউ আমেরিকার ইয়েমেন বিষয়ক ফেলো অ্যাডাম ব্যারনও ঘটনাটিকে সাম্প্রতিক বছরগুলোর ইয়েমেন সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
মোখা লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের সংকীর্ণ বাব আল-মান্দাব প্রণালি থেকে ৫০ মাইলেরও কম দূরে। কয়েক শতাব্দী ধরে শহরটির ভৌগোলিক অবস্থান একে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক ও সামুদ্রিক কেন্দ্রে পরিণত করেছে। একসময় ইয়েমেনের কফি রপ্তানির প্রধান কেন্দ্র ছিল মোখা। বৃহস্পতিবার মোখা দখলের খবরের পর আন্তর্জাতিক বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৫ ডলারের বেশি উঠে যায়, যা কয়েক মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।
বৃহস্পতিবার ইয়েমেন সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে হটিয়ে শহর ও এর বন্দর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয় হুথিরা। এরপর ইয়েমেনের স্থানীয় এক কর্মকর্তা ও প্রাদেশিক পর্যায়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, কয়েক দিন ধরে মোখায় হুথি ও ইয়েমেন সরকারের সমর্থিত বাহিনীর মধ্যে তীব্র স্থলযুদ্ধ চলছিল। বৃহস্পতিবার সেই লড়াইয়ে সরকারি বাহিনীকে সরিয়ে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নেয় হুথিরা। নিরাপত্তাজনিত কারণে সরকারি কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব কথা বলেন।
২০১৪ সালে হুথিরা ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখল করার পর থেকে দেশটির সংঘাত চলছে। এরপর সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেন সরকারকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বিমান হামলা শুরু করে। এতে দেশটি দীর্ঘস্থায়ী ও ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ২০২২ সালে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি হলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে তা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
মোখা দখলের পর হুথিরা আরো দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে বাব আল-মান্দাবের কাছাকাছি এলাকা এবং জলপথের একটি দ্বীপ দখলের চেষ্টা করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিউ আমেরিকার অ্যাডাম ব্যারনের মতে, ওই এলাকা ইয়েমেনের সবচেয়ে কৌশলগতভাবে মূল্যবান ভূখণ্ডগুলোর একটি। হুথিরা সেখানে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারলে আরব উপদ্বীপের দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক প্রবেশপথ—বাব আল-মান্দাব ও হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান ও তার মিত্রদের অন্তত আংশিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
তবে হুথিদের সংশ্লিষ্ট পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার জানিয়েছে, সমুদ্রপথে নৌ চলাচল নিরাপদ রয়েছে। পশ্চিম ইয়েমেনে চলমান ‘বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ’ শেষ হয়েছে বলেও তারা দাবি করেছে। মোখা এর আগে ইয়েমেন সরকারের মিত্র লেফটেন্যান্ট জেনারেল তারেক সালেহর বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল। বৃহস্পতিবার জেনারেল সালেহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, তিনি তার বাহিনীকে পুনর্গঠিত করার এবং নিরাপদ স্থানে বিকল্প কমান্ড সেন্টার স্থাপনের নির্দেশ দিয়েছেন। এ সিদ্ধান্ত সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের সঙ্গে আলোচনা করেই নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
এদিকে মোখার কাছের হুনাইশ ও জুকার—লোহিত সাগরের দুটি দ্বীপ থেকেও সালেহর বাহিনী সরে গেছে বলে ইয়েমেনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে বাব আল-মান্দাবের ভেতরে অবস্থিত পেরিম বা মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে রয়েছে, তা এখনো পরিষ্কার নয়।
হুথিদের রাজনৈতিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি বলেছেন, তাদের লক্ষ্য ইয়েমেনের ‘সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা পুরোপুরি পুনঃপ্রতিষ্ঠা’ করা এবং সৌদি আরবের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া; ভূখণ্ড সম্প্রসারণ করা নয়। দক্ষিণ ইয়েমেনের অন্যান্য গোষ্ঠী রাজনৈতিক সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত নিজেদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকতে পারবে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের মধ্যে বাব আল-মান্দাবের গুরুত্ব আরো বেড়েছে। হুথিরা গত জুলাইয়ে লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী সৌদি তেলবাহী ট্যাংকারের ওপর অবরোধ ঘোষণা করে এবং উত্তর ইয়েমেনের ঘাঁটি থেকে জাহাজ ও সৌদি স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়।
সাম্প্রতিক দিনগুলোতে হুতি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন, সৌদি আরব তাদের মিত্রদের সহায়তায় ইয়েমেনে শতাধিক বিমান হামলা চালিয়েছে। সৌদি সরকার এসব দাবির বিষয়ে মন্তব্য করেনি। অন্যদিকে হুথিরা সৌদি আরবের ভেতরে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, সাম্প্রতিক হুথি হামলায় দেশটির দক্ষিণাঞ্চলে ৭০ জনের বেশি বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন।
ইয়েমেনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ফারেয়া আল-মুসলিমির ধারণা, সৌদি আরবের বিমান হামলার সহায়তায় ইয়েমেন সরকার মোখা পুনর্দখলের চেষ্টা করতে পারে। তবে সৌদি আরব সংঘাতে আরো গভীরভাবে জড়িয়ে পড়তে চায় না এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় করে ইয়েমেন সরকারকে সহায়তা দেওয়ার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।