আল জাজিরার প্রতিবেদন
কাতারের সাবেক আমির ও ‘ফাদার আমির’ শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ৭৪ বছর বয়সে মারা গেছেন। ১৯৯৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত তাঁর ১৮ বছরের শাসনামলে কাতার শুধু জ্বালানি রপ্তানিকারক দেশ হিসেবেই নয়, বরং বৈশ্বিক বিনিয়োগ ও অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
১৯৯৫ সালে ক্ষমতায় আসার সময় কাতারের অর্থনীতি ছিল তুলনামূলক ছোট এবং প্রধানত তেলনির্ভর। বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাসক্ষেত্র ‘নর্থ ফিল্ড’-এর বিপুল সম্ভাবনা তখনও পুরোপুরি কাজে লাগানো হয়নি।
১৯৯০-এর দশকের দ্বিতীয়ার্ধে গ্যাস উত্তোলন ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনে ব্যাপক বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত কাতারের অর্থনীতির মোড় ঘুরিয়ে দেয়। ১৯৯৬ সালে প্রথম এলএনজি রপ্তানি শুরু করার পর ১৫ বছরেরও কম সময়ে কাতার বিশ্বের সবচেয়ে বড় এলএনজি রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়।
২০১০ সালে দেশটির বার্ষিক এলএনজি উৎপাদন সক্ষমতা ৭ কোটি ৭০ লাখ টনে পৌঁছে। এই সাফল্য শুধু রাজস্বই বাড়ায়নি, বরং এশিয়া ও ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তায় কাতারকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারে পরিণত করেছে।
নজিরবিহীন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি
গ্যাস খাতের উত্থানের ফলে কাতারের অর্থনীতি বিশ্বের দ্রুততম প্রবৃদ্ধির অর্থনীতিগুলোর একটি হয়ে ওঠে।
বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হামাদের শাসনামলে কাতারের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ১৯৯৫ সালের প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ২০১৩ সালে প্রায় ১৯৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে—অর্থাৎ ২০ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) জানিয়েছে, ২০০৬ সালে দেশটির প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ শতাংশ এবং ২০১১ সালে তা বেড়ে ২৬ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছায়, যা সে সময় বিশ্বের সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির মধ্যে অন্যতম ছিল।
জ্বালানি আয় থেকে বৈশ্বিক বিনিয়োগ
শেখ হামাদ শুধু জ্বালানি উৎপাদন বাড়াননি, বরং সেই আয়কে দীর্ঘমেয়াদি সম্পদে রূপান্তরের কৌশল গ্রহণ করেন।
২০০১ সালে তাঁর নেতৃত্বে গঠিত হয় সুপ্রিম কাউন্সিল ফর ইকোনমিক অ্যাফেয়ার্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট। পরে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় কাতার ইনভেস্টমেন্ট অথরিটি (কিউআইএ), যা তেল ও গ্যাস খাতের উদ্বৃত্ত অর্থ বৈশ্বিক বিনিয়োগে ব্যবহার শুরু করে।
কিউআইএ দ্রুত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সার্বভৌম সম্পদ তহবিলে পরিণত হয়। সংস্থাটি বার্কলেজ, ভক্সওয়াগেন এবং যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত হারডস ডিপার্টমেন্ট স্টোরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করে। পাশাপাশি লন্ডনের দ্য শার্ড ভবন, ইউরোপীয় ফুটবল ক্লাবসহ বিশ্বের বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বিস্তৃত করে।
বর্তমানে কিউআইএর সম্পদের পরিমাণ ৫০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বলে ধারণা করা হয়।
জীবনমানের উল্লেখযোগ্য উন্নতি
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক প্রভাব পড়ে কাতারের নাগরিকদের জীবনমানেও।
বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, শেখ হামাদের আমলে মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে কাতার বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর একটিতে পরিণত হয়। ক্রয়ক্ষমতার সমতার (পিপিপি) হিসাবে মাথাপিছু আয় ৯০ হাজার ডলারেরও বেশি ছাড়িয়ে যায়।
সরকার আবাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ায় এবং বেকারত্বের হার অত্যন্ত নিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে।
শিক্ষা ও মানবসম্পদে বিনিয়োগ
জ্বালানি খাতের পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়নেও বিশেষ গুরুত্ব দেন শেখ হামাদ।
১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় কাতার ফাউন্ডেশন ফর এডুকেশন, সায়েন্স অ্যান্ড কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট, যা শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে।
পরবর্তীতে জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি, টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি এবং কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটির মতো আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় কাতারে ক্যাম্পাস স্থাপন করে। পাশাপাশি হামাদ মেডিকেল করপোরেশন সম্প্রসারণ এবং নতুন হাসপাতাল ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবারও ব্যাপক উন্নয়ন করা হয়।
বিশ্বকাপের ভিত্তি গড়ে দেওয়া অবকাঠামো
শেখ হামাদের শাসনামলে গ্যাস থেকে অর্জিত আয় দিয়ে ব্যাপক অবকাঠামো উন্নয়ন করা হয়।
এই সময় হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, হামাদ বন্দর, লুসাইল সিটি, আধুনিক সড়ক নেটওয়ার্ক এবং পরবর্তীতে দোহা মেট্রোর ভিত্তি স্থাপন করা হয়।
এই উন্নয়নই কাতারকে ২০২২ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের সক্ষমতা এনে দেয়। বিশ্বকাপ উপলক্ষে দেশটি সড়ক, স্টেডিয়াম, রেলপথ, বিমানবন্দর ও বন্দরসহ অবকাঠামো উন্নয়নে ২০০ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করে।
দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক উত্তরাধিকার
২০০৮ সালে চালু করা হয় কাতার ন্যাশনাল ভিশন ২০৩০, যার লক্ষ্য ছিল প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে জ্ঞানভিত্তিক ও টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা।
বিশ্লেষকদের মতে, শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির সবচেয়ে বড় অবদান শুধু গ্যাসসম্পদ উন্নয়ন নয়; বরং সেই সম্পদ থেকে অর্জিত বিপুল আয়কে শিক্ষা, অবকাঠামো, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বৈশ্বিক বিনিয়োগে রূপান্তর করে ভবিষ্যৎমুখী অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করা। তাঁর প্রণীত এই অর্থনৈতিক মডেলই আজও কাতারের অর্থনৈতিক নীতির মূল ভিত্তি, যা তাঁর উত্তরসূরি আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানির নেতৃত্বেও অনুসরণ করা হচ্ছে।
এসআর