মার্কিন কামিকাজে ড্রোন যখন ইরান যুদ্ধে সাফল্য পেতে শুরু করেছিল, তখনই স্পেসএক্সের শীর্ষ কর্মকর্তারা দাবি করে বসেন, স্যাটেলাইট-নির্ভর ওয়াই-ফাই নেটওয়ার্ক ব্যবহারের জন্য পেন্টাগনকে আরও বেশি দাম দিতে হবে।
আমেরিকা বোমাবর্ষণ শুরু করার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পেন্টাগন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন স্পেসএক্সের কর্মকর্তারা। সেখানে স্পেসএক্সের যুক্তি দেয়, মার্কিন সেনাবাহিনী টার্মিনাল-পিছু সংযোগের জন্য মাত্র ৫ হাজার ডলার দিচ্ছে। অথচ তারা যে উচ্চমানের সেবা ব্যবহার করছে, তার প্রকৃত মূল্য প্রায় ২৫ হাজার ডলার। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুটি সূত্র ও রয়টার্সের হাতে আসা পেন্টাগনের কিছু নথি থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
লুকাস সুইসাইড ড্রোনে স্টারলিঙ্কের ব্যবহার নিয়েই মূলত এই মতবিরোধ। এই মার্কিন ড্রোন বেশ সস্তা ও ইরানের শাহেদ ড্রোনের সমতুল্য। এটি লক্ষ্যবস্তুর উপর চক্কর কেটে সোজা নিচে নেমে এসে বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। অবগত পাঁচজন ও সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে স্টারলিঙ্কের দাম নিয়ে স্পেসএক্স ও পেন্টাগনের মধ্যে ক্রমশ যে উত্তেজনা বাড়ছে, এই বিরোধ তারই অংশ।
সরকারের যোগাযোগ-নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ইরানের নাগরিকদের সাহায্য করতে চাইছে পেন্টাগন। এই উদ্দেশ্যে ফাইভ-জি সেবার মতো স্টারলিঙ্কের মাধ্যমে সরাসরি মুঠোফোনে সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। দুটি সূত্রের দাবি, এই পরিকল্পনার খরচ নিয়েও স্পেসএক্সের সঙ্গে পেন্টাগনের মতবিরোধ তৈরি হয়েছে।
এই বিবাদ থেকেই স্পষ্ট, স্পেসএক্সের ওপর পেন্টাগনের ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে মাস্কের প্রভাব ক্রমেই বাড়িয়ে দিচ্ছে। আগামী মাসেই আইপিও ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে স্পেসএক্স। এটি ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আইপিও হতে পারে। ঠিক তার আগেই কোম্পানির আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন মাস্ক।
ওয়ালমার্টসহ সাধারণ দোকানে স্টারলিঙ্কের যে টার্মিনাল বিক্রি হয়, পেন্টাগনকে দেওয়া সরঞ্জাম তার চেয়েথেকে আলাদা। ২০২৩ সালের চুক্তি অনুযায়ী, পেন্টাগনকে স্টারশিল্ড নামক বিশেষ সামরিক সংস্করণ সরবরাহ করে স্পেসএক্স। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, স্টারশিল্ড টার্মিনাল সাধারণ বাণিজ্যিক স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইট ও স্টারশিল্ড নামক একটি পৃথক ও অধিক সুরক্ষিত স্যাটেলাইট-মণ্ডলী—উভয়ের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারে।
স্পেসএক্স বলছে, লুকাস ড্রোন যে পরিস্থিতিতে কাজ করে, তা তুলনামূলকভাবে সস্তা 'ল্যান্ড' বা 'মোবিলিটি' সেবার বদলে তাদের 'অ্যাভিয়েশন' সেবার সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ। একটি সূত্রের দাবি, পেন্টাগন কর্মকর্তাদের পাল্টা যুক্তি ছিল, মাসে ২৫ হাজার ডলারের এই খরচ মূলত বিমানের জন্য ধার্য করা হয়েছে। কামিকাজে ড্রোনের জন্য তা একেবারেই প্রযোজ্য নয়, কারণ এই ড্রোন মাত্র কয়েক মিনিট বা কয়েক ঘণ্টার জন্যই স্টারলিঙ্কের সংযোগ ব্যবহার করে।
ইরানে আক্রমণের তীব্রতা তখন আরও বাড়াচ্ছিল পেন্টাগন। তাই বাধ্য হয়ে শেষপর্যন্ত স্পেসএক্সের প্রস্তাবিত বর্ধিত মূল্য দিতেই রাজি হয় তারা। ফলে প্রতিটি লুকাস ড্রোনের পেছনে পেন্টাগনের খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে। প্রথমে প্রতিটি ড্রোনের জন্য তারা প্রায় ৩০ হাজার ডলার খরচ করছিল।
এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে স্পেসএক্স সাড়া দেয়নি।
রয়টার্সের এই প্রতিবেদন নিয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি পেন্টাগনও। স্পেসএক্সের মূল্যবৃদ্ধি, পেন্টাগনের বর্ধিত মূল্য পরিশোধের সিদ্ধান্ত কিংবা ইরানের নাগরিকদের স্টারলিঙ্কের মাধ্যমে মোবাইল সেবা দেওয়ার পরিকল্পনা—কোনো বিষয়েই তারা মুখ খোলেনি। তবে এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের এক কর্মকর্তা বলেছেন, টার্মিনাল কেনার দায়িত্বে থাকা কমার্শিয়াল স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনস অফিস বিকল্প প্রতিযোগী কোম্পানির সন্ধান চালাচ্ছে।
রয়টার্সের এই খবর প্রকাশিত হওয়ার পর এক্স হ্যান্ডলে দেওয়া পোস্টে বিষয়টিকে 'মিথ্যা' দাবি করেছেন ইলন মাস্ক। তবে এ নিয়ে বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি। আরেকটি পোস্টে মাস্ক দাবি করেন, সাধারণ নাগরিকদের জন্য তৈরি স্টারলিঙ্ক ব্যবস্থা 'সামরিক উদ্দেশ্যে' অপব্যবহার করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ভুলটি পেন্টাগনের নয়, বরং তার নিজের 'কোম্পানিরই' ছিল বলে জানান তিনি।
লুকাস ড্রোন প্রস্তুতকারক সংস্থা স্পেকট্রেওয়ার্কসের মুখপাত্র অবশ্য এ-সংক্রান্ত সব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে বিষয়টিকে পেন্টাগনের কোর্টেই ঠেলে দিয়েছেন।
পেন্টাগনের মুখপাত্র শন পার্নেলও এক্সে এক পোস্টে রয়টার্সের প্রতিবেদনটিকে 'ভুল' বলে দাবি করেছেন। তবে দাবির সপক্ষে কোনো অতিরিক্ত তথ্য দেননি তিনি।
তবে স্টারলিঙ্কের সমকক্ষ কোনো বিকল্প এখনও অন্য কোনো কোম্পানির কাছে নেই। ২০২২ সালে ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে আধুনিক যুদ্ধে এই ব্যবস্থা ক্রমশ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক বিশ্বব্যাপী সংযোগ রক্ষা করতে সক্ষম। ফলে দুর্গম এলাকাতেও যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগ ও নিখুঁত নিশানা বজায় রাখা যায়। পৃথিবীর কক্ষপথে থাকা মোট স্যাটেলাইটের ৬০ শতাংশেরও বেশি স্পেসএক্সের দখলে। তাদের প্রায় ১০ হাজার স্যাটেলাইটের এই বিশাল সমাহারের কাছে ওয়ানওয়েব বা অ্যামাজন লিওর মতো কোম্পানিগুলোর স্যাটেলাইটের সংখ্যা একেবারেই নগণ্য।
স্টারলিঙ্কের উপর এই অতিনির্ভরতার ঝুঁকি প্রথম বড় আকারে সামনে আসে ইউক্রেন যুদ্ধের সময়। রয়টার্সের আগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ সালে ইউক্রেনীয় সেনা যখন রুশ ঘাঁটির দিকে এগোচ্ছিল, তখন মাস্ক দেশের কিছু অংশে স্টারলিঙ্ক সেবা বন্ধ করার নির্দেশ দেন। ফলে ইউক্রেনের একটি বড় পাল্টা অভিযান ধাক্কা খেয়েছিল। গত গ্রীষ্মেও বিশ্বব্যাপী স্টারলিঙ্ক সেবা সাময়িক বিপর্যস্ত হওয়ায় চালকহীন সামরিক নৌকাগুলোর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে মার্কিন নৌবাহিনীর একটি পরীক্ষা বিঘ্নিত হয়।
মার্কিন প্রশাসনকে 'কোণঠাসা' করছে স্পেসএক্স
জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক থিঙ্কট্যাঙ্ক সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর সিনিয়র ফেলো ক্লেটন সোপ বলেন, প্রথাগত প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর তুলনায় পেন্টাগনের ওপর স্পেসএক্সের দাপট অনেক বেশি। কারণ রকেট উৎক্ষেপণ ও এআই ব্যবসার পাশাপাশি স্টারলিঙ্কের একটি বিশাল বাণিজ্যিক বাজার রয়েছে তাদের। আমেরিকার সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের এক নথি অনুযায়ী, স্পেসএক্স তাদের মোট আয়ের মাত্র ২০ শতাংশ পায় মার্কিন সরকারের কাছ থেকে।
সোপ বলেন, 'স্পেসএক্স নিশ্চিতভাবেই মার্কিন সরকারকে একপ্রকার কোণঠাসা করে বাগে এনে ফেলেছে।'
ইরান যুদ্ধ শুরুর প্রথম থেকেই স্টারলিঙ্ক মার্কিন সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছিল। পরীক্ষামূলক ব্যবহার ও প্রাথমিক মোতায়েনের সময়েই এটি আকাশপথে হামলাকারী লুকাস ড্রোন থেকে শুরু করে সামুদ্রিক নজরদারি ও হামলার কাজে ব্যবহৃত চালকহীন জলযান—সব ধরনের ব্যবস্থাকেই সচল রেখেছিল। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্যমতে, আমেরিকা যখন বোমাবর্ষণ শুরু করে, তত দিনে ডজনেরও বেশি ড্রোন ব্যবস্থায় স্টারশিল্ড টার্মিনাল ব্যবহৃত হচ্ছিল।
কিন্তু ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে আমেরিকার আক্রমণের পরই পেন্টাগন ও স্পেসএক্সের মধ্যে দ্রুত উত্তেজনার পারদ চড়তে শুরু করে। ১ মার্চ এক্সে এক ব্যবহারকারীর পোস্টের জবাব দেন মাস্ক। ওই পোস্টে একটি লুকাস ড্রোনের ছবি দিয়ে দাবি করা হয়েছিল, এতে 'ইন্টিগ্রেটেড স্টারলিঙ্ক টার্মিনাল' রয়েছে বলে মনে হচ্ছে।
এর জবাবে মাস্ক লেখেন, 'অস্ত্র ব্যবস্থার জন্য এই টার্মিনাল ব্যবহার করা বাণিজ্যিক স্টারলিঙ্কের সেবার শর্তাবলির পরিপন্থি। এটি সব ব্যবহারকারীর ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য এবং এমন কিছু নজরে এলেই সেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়।" তিনি আরও বলেন, 'এর জন্য 'স্টারশিল্ড' নামে একটি পৃথক নেটওয়ার্ক রয়েছে, যা মার্কিন সরকার পরিচালনা করে।'
তবে রয়টার্সকে দেওয়া এক বিবৃতিতে পেন্টাগনের একজন কর্মকর্তা স্পেসএক্সের সঙ্গে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সংশ্লিষ্ট দুটি সূত্রের খবর, এর কয়েক দিন পরেই পেন্টাগনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন স্পেসএক্সের কর্মকর্তারা। তাদের দাবি ছিল, এই সেবার জন্য মার্কিন সেনাবাহিনী পর্যাপ্ত অর্থ দিচ্ছে না।
অ্যাটাক ড্রোনের ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট-নির্ভর ওয়াইফাই সংযোগের বাড়তি মূল্য দিতে পেন্টাগন প্রথমে সম্মত হলেও, একটি সূত্রের দাবি, প্রতিরক্ষা-সংক্রান্ত ডেপুটি সেক্রেটারি স্টিভ ফেইনবার্গসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা এই বন্দোবস্ত নিয়ে বেশ অস্বস্তিতে ছিলেন। এপ্রিলে যুদ্ধবিরতি চলাকালীন পেন্টাগনের কর্মকর্তারা ফের মূল্য নির্ধারণের জন্য টেরেন্স ও'শনেসির সঙ্গে বৈঠক করেন। এই অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল বর্তমানে স্পেসএক্সের প্রতিরক্ষা ব্যবসার দায়িত্বে রয়েছেন।
এত কিছুর পরেও পেন্টাগন বর্তমানে আরও সাড়ে তিন হাজারের বেশি স্টারশিল্ড টার্মিনালের সাবস্ক্রিপশন কেনার কথা ভাবছে। রয়টার্সের হাতে আসা পেন্টাগনের নথি অনুযায়ী, এর মধ্যে উচ্চমূল্যের অ্যাভিয়েশন সেবার ১০০টি টার্মিনালও রয়েছে। এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে স্পেসএক্সের বার্ষিক আয় কয়েক কোটি ডলার বাড়তে পারে। তবে চূড়ান্ত চুক্তি সই হয়েছে কি না বা কত দাম ধার্য করা হচ্ছে, তা রয়টার্স নিশ্চিত হতে পারেনি।
২০২৫ সালে স্টারলিঙ্ক থেকে স্পেসএক্সের আয় ছিল ১১.৪ বিলিয়ন ডলার। সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি ও পেন্টাগনের নথির তথ্যানুযায়ী, এই নতুন প্রযুক্তি চালু করার জন্য স্পেসএক্স ৫০০ মিলিয়ন ডলারের পাশাপাশি এটি পরিচালনার জন্য মাসে আরও ১০০ মিলিয়ন ডলার দাবি করেছিল। এই বিপুল খরচের বহর দেখে প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ে।
অন্যান্য অভিযানের ক্ষেত্রেও স্টারলিঙ্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদন অনুসারে, জানুয়ারিতে সরকারবিরোধীদের ইন্টারনেট সেবা দিতে ট্রাম্প প্রশাসন গোপনে ৬ হাজারেরও বেশি স্টারলিঙ্ক টার্মিনাল দেশটিতে পাচার করেছিল।
তবে সংশ্লিষ্ট একটি সূত্রের দাবি, যুদ্ধের তীব্রতা বাড়তেই ইরানি প্রশাসন সেই টার্মিনালগুলো বাজেয়াপ্ত করে। পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত করতে বড় শহরগুলোতে জ্যামিং ডিভাইস বসানো হয়। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত দুজন জানান, যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই পেন্টাগনের কর্মকর্তারা সরাসরি মুঠোফোনে সেবা ব্যবস্থা চালু করার বিষয়ে স্পেসএক্সের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। এর ফলে ওই বাধাগুলো অনায়াসেই এড়ানো সম্ভব হত। ফাইভ-জি সংযোগের মতো এই ব্যবস্থায় মাটিতে কোনো টার্মিনাল ছাড়াই ব্যবহারকারীরা সংযোগ স্থাপন করতে পারবেন।
সূত্র: রয়টার্স