সিরিয়ার ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের চাচাতো ভাই ওয়াসিম আল-আসাদকে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত। মঙ্গলবার দামেস্কের চতুর্থ ফৌজদারি আদালত এই রায় ঘোষণা করেন।
আদালতের বিচারক ফাখর আল-দীন আল-আরিয়ান জানান, পূর্বপরিকল্পিত হত্যা, নির্যাতন এবং একাধিক হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ওয়াসিমকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। এসব অপরাধকে আদালত মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
আদালতে রায় ঘোষণার সময় আসামির কাঠগড়ায় ওয়াসিম আল-আসাদের উপস্থিতির দৃশ্যও প্রকাশ্যে এসেছে। এই রায়ের মধ্য দিয়ে আসাদ পরিবারের কোনো সদস্যকে প্রথমবারের মতো সিরিয়ার মাটিতে উপস্থিত অবস্থায় বিচার ও দণ্ড দেওয়া হলো।
এর আগে বাশার আল-আসাদ ও তার ভাই মাহের আল-আসাদকেও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তবে তারা বর্তমানে রাশিয়ায় নির্বাসনে থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতেই ওই রায় দেওয়া হয়েছিল। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দীর্ঘদিনের শাসনের অবসানের পর তারা সিরিয়া ছেড়ে রাশিয়ায় চলে যান।
দামেস্কে আদালতের বাইরে থেকে প্রতিবেদন করা আল জাজিরার সাংবাদিক ওবাইদা হিত্তো এই রায়কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, আসাদ পরিবারের নামধারী কোনো ব্যক্তিকে এবারই প্রথম সিরিয়ায় উপস্থিত অবস্থায় বিচার শেষে সাজা দেওয়া হলো।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানের শিক্ষক জামাল মনসুর রায়টিকে সিরীয়দের জন্য ‘গৌরবের দিন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতাধর আসাদ পরিবারের সদস্যরা নানা অপরাধের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কার্যত দায়মুক্তি ভোগ করেছেন।
ওয়াসিম আল-আসাদের বিরুদ্ধে যত অভিযোগ
ওয়াসিম আল-আসাদকে ২০২৫ সালের জুনে লেবানন থেকে সিরিয়ায় ফেরার পর গ্রেপ্তার করা হয়। সাবেক সরকারের আমলে প্রতিবেশী দেশগুলোতে নিষিদ্ধ মাদক ক্যাপ্টাগনের উৎপাদন ও পাচার তদারকির অভিযোগও দীর্ঘদিন ধরে তার বিরুদ্ধে ছিল। এ অভিযোগের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নিষেধাজ্ঞার তালিকাতেও তার নাম রয়েছে।
সিরিয়ার আদালতে তার বিরুদ্ধে ২০১১ সালের শুরু থেকে সরকারপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী গঠন ও নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়। পূর্ব ঘৌতায় বেসামরিক এলাকায় পরিচালিত সামরিক অভিযানেও তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ছিল। বিশেষ করে আল-মুলাইহা এলাকায় এসব অভিযানে বহু বেসামরিক মানুষ নিহত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বিচারক আল-আরিয়ান বলেন, ওয়াসিম আল-আসাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী সিরীয়দের অপহরণ ও হত্যার সঙ্গে জড়িত ছিল—এ বিষয়ে আদালত সন্দেহাতীতভাবে নিশ্চিত হয়েছে।
তবে মাদক পাচারের অভিযোগ থেকে ওয়াসিমকে খালাস দেওয়া হয়েছে। আদালতের মতে, এই অভিযোগে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মৃত্যুদণ্ডের পাশাপাশি আদালত ওয়াসিম আল-আসাদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দিয়েছেন।
সিরিয়ায় বর্তমানে চলমান বৃহত্তর অন্তর্বর্তীকালীন বিচারপ্রক্রিয়ার অংশ হিসেবেই এসব মামলা পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিনের সংঘাতে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অপরাধের জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার লক্ষ্যেই এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: আল জাজিরা
এআরবি