ইরানের বিরুদ্ধে ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক বড় ধরনের সামরিক, কৌশলগত, অর্থনৈতিক এবং নৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে জেনেভায় একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের মাধ্যমে এই সংঘাতের সমাপ্তি ঘটতে যাচ্ছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এক ‘নম্র আত্মসমর্পণ’ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইসরাইলকে সঙ্গে নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধ লড়েছে, তা শুরুর কোনো লক্ষ্যই পূরণ করতে পারেনি। উল্টো এই পরিস্থিতি তেহরানের কট্টরপন্থিদের আরো শক্তিশালী করেছে এবং ভবিষ্যতে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের দিকে ধাবিত করতে উৎসাহিত করেছে। যুদ্ধ বন্ধ করতে মরিয়া প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার নিজের দেওয়া হুমকি থেকে পিছিয়ে এসেছেন এবং মধ্যপ্রাচ্যে আলোচনার পরিবেশ নষ্ট করার জন্য ঘনিষ্ঠ মিত্র ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর তীব্র সমালোচনা করেছেন।
চুক্তি নিয়ে গোপনীয়তা ও মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
শুক্রবার জেনেভায় চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হওয়ার আগে হোয়াইট হাউস এর বিশদ বিবরণ প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, এই চুক্তির আওতায় আগামী ৬০ দিনের জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকবে এবং ইরান ‘হরমুজ প্রণালি’ পুনরায় উন্মুক্ত করে দেবে। ফলে মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার হবে এবং অঞ্চলটি থেকে আবার তেল সরবরাহ শুরু হবে। তবে ৬০ দিন পর এই প্রণালিতে শুল্ক আদায়ের পথ ইরান খোলা রেখেছে। এছাড়া ট্রাম্প যে পারমাণবিক সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি বন্ধের দাবিতে যুদ্ধ শুরু করেছিলেন, তা এই চুক্তিতে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
ট্রাম্পের প্রধান আলোচক জ্যারেড কুশনার, স্টিভ উইটকফ এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এই চুক্তিকে সমর্থন করলেও মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে তীব্র বিভেদ তৈরি হয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এই চুক্তি বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে গোপনে আপত্তি প্রকাশ করেছেন।
রিপাবলিকানদের অসন্তোষ ও ওবামা চুক্তির সঙ্গে তুলনা
ট্রাম্প এই চুক্তিকে বড় জয় হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করলেও ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার ইরান চুক্তির সঙ্গে এর সাদৃশ্য নিয়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। রিপাবলিকান পার্টির ইরানপন্থিরাও ট্রাম্পের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। ডানপন্থি রেডিও হোস্ট মার্ক লেভিন হোয়াইট হাউসের গোপনীয়তার সমালোচনা করেছেন। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম চুক্তির দায় ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের ওপর চাপানোর চেষ্টা করছেন।
রক্ষণশীল বিশ্লেষক এরিক এরিকসন সরাসরি বলেছেন, ‘ট্রাম্প ইরানের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন।’
অন্যদিকে বুশ প্রশাসনের সাবেক উপদেষ্টা মার্ক থিসেন সতর্ক করেছেন, ট্রাম্পের এই চুক্তি দেখতে ওবামার চুক্তির মতোই।
যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি ও ভূ-রাজনৈতিক বিপর্যয়
নেতানিয়াহুর উসকানিতে গত ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে ইরান ও মার্কিন-ইসরাইলের মধ্যে এই যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হয়। শুরুর দিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হন এবং সামরিক স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতি হয়। তবে ইরান দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয়, যা বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকট তৈরি করে।
পেন্টাগনের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ের হিসাব অনুযায়ী, এই যুদ্ধে ইতোমধ্যে ২৯ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে, যদিও স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের মতে প্রকৃত খরচ এর চেয়ে অনেক বেশি। যুদ্ধে মার্কিন সামরিক বাহিনীর গোলাবারুদের মজুত মারাত্মকভাবে কমে গেছে, যা এশিয়া ও ইউরোপে মার্কিন স্বার্থ রক্ষাকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। এছাড়া যুদ্ধের প্রথম দিকে মার্কিন হামলায় একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ১৭০ জনেরও বেশি শিশু নিহত হওয়ায় ওয়াশিংটনের নৈতিক অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে। সব মিলিয়ে ইরানের ৩ হাজারের বেশি মানুষ এবং ১৩ জন মার্কিন সেনা এই সংঘাতের কারণে নিহত হয়েছেন।
নেতানিয়াহুর সঙ্গে দূরত্ব ও ভবিষ্যৎ
যুদ্ধবিরতি আলোচনাকে ঝুঁকিতে ফেলার কারণে ট্রাম্প সম্প্রতি বৈরুতে হামলা বন্ধ করতে নেতানিয়াহুকে চাপ দিয়েছেন এবং তাকে ‘একজন অত্যন্ত কঠিন লোক’ বলে অভিহিত করেছেন।
হোয়াইট হাউসের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, ‘প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে এটি শেষ, এবং নেতানিয়াহুকে তা শুনতেই হবে।’
তবে নেতানিয়াহু দাবি করেছেন, আত্মরক্ষার জন্য ইসরাইল তার প্রয়োজনীয় হামলা চালিয়ে যাবে।
ইরান এই সংঘাত থেকে একটি বড় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে, যার ক্ষেপণাস্ত্র শক্তি অক্ষত রয়েছে এবং হিজবুল্লাহ ও হুথিদের মতো মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক আরো জোরদার হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই ব্যর্থতা চীন, রাশিয়া বা উত্তর কোরিয়াকে আরো আগ্রাসী হতে উৎসাহিত করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ট্রাম্প এখন মধ্যবর্তী নির্বাচন এবং ঘরের মাঠে নিজের জনপ্রিয়তা ধরে রাখার পাশাপাশি কিউবা ও ইউক্রেন যুদ্ধ অবসানের দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন।
সূত্র: দ্য আটলান্টিক
এএম