ইসরাইলের পক্ষে প্রচারণা চালাতে যুক্তরাষ্ট্রে একটি অস্তিত্বহীন থিংক ট্যাংকের নামে বিপুল পরিমাণ লেখা প্রকাশ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চ্যাটবটের উত্তরকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে বলে এক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। ‘হ্যানোভার ইনস্টিটিউট ফর পাবলিক পলিসি’ নামের ওই প্রতিষ্ঠানের কোনো বৈধ অস্তিত্ব, কার্যালয় বা পরিচিত কর্মী নেই।
৬ থেকে ১৪ আগস্ট মাত্র ৯ দিনে প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে ১২৪টি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। এসব প্রতিবেদনের মোট শব্দসংখ্যা ৫ লাখ ৬০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে শুধু ১২ ও ১৩ আগস্ট দুই দিনেই প্রকাশ করা হয় প্রায় ৩ লাখ ৫৪ হাজার শব্দের ৭৩টি প্রতিবেদন।
প্রতিবেদনগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন ব্যবহারকারীরা এআই চ্যাটবটে যে ধরনের প্রশ্ন করেন, সেগুলোর উত্তর দিচ্ছে একটি নিরপেক্ষ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রশ্নের মধ্যে ছিল—ইসরাইল কি গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে, ইসরাইল কি ফিলিস্তিনিদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ করেছে এবং ইহুদিবাদের বিরোধিতা কি ইহুদিবিদ্বেষের সমান ইত্যাদি। তবে প্রতিবেদনের ভাষ্য ও তথ্য উপস্থাপনে ইসরাইলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে দুর্বল করার প্রবণতা ছিল।
গার্ডিয়ানের হিসাবে, ১২৪টি প্রতিবেদনের মধ্যে ২০টিতে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যা বা বর্ণবৈষম্যের অভিযোগের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, কোনো আদালত এখনো এ বিষয়ে চূড়ান্ত রায় দেয়নি। আবার ৫৫টি প্রতিবেদনে হতাহত ও ত্রাণসংক্রান্ত পরিসংখ্যানকে ‘ঘটনার সঙ্গে জড়িত একটি পক্ষের’ তথ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে গাজার পরিস্থিতি সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়ার বিষয়টি অস্পষ্ট করে তোলার চেষ্টা করা হয়েছে।
ওয়েবসাইটটির পেছনে নিউইয়র্কভিত্তিক মিডিয়া প্রতিষ্ঠান পাইরো ইনকের সম্পৃক্ততার তথ্যও পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফরেন এজেন্টস রেজিস্ট্রেশন অ্যাক্ট’ বা বিদেশি এজেন্ট নিবন্ধন আইনের আওতায় পাইরো ইসরাইল সরকারের হয়ে কাজ করার বিষয়টি নথিভুক্ত করেছে। প্রতিষ্ঠানটি এ কাজের জন্য ১০ লাখ ডলারের চুক্তিতে যুক্ত ছিল বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
এটি ইসরাইলের বৃহত্তর অনলাইন প্রচারণা কার্যক্রমের অংশ। এই প্রচারণায় তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করা হয়েছে বলে মার্কিন নথিতে উঠে এসেছে। এর একটি লক্ষ্য হলো এমন ওয়েবসাইট ও কনটেন্ট তৈরি করা, যা এআই সার্চ ও চ্যাটবটের উত্তরে উদ্ধৃত হওয়ার সম্ভাবনা বাড়াবে।
এ ধরনের কৌশলকে প্রযুক্তি খাতে ‘জেনারেটিভ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন’ বলা হচ্ছে। এর উদ্দেশ্য সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনে ওয়েবসাইটের অবস্থান বাড়ানোর বদলে চ্যাটজিপিটি, ক্লদ, জেমিনি বা পারপ্লেক্সিটির মতো এআই সিস্টেমে কোনো নির্দিষ্ট তথ্য বা বয়ানকে বেশি দৃশ্যমান করে তোলা। গবেষকদের আশঙ্কা, এসব লেখা ভবিষ্যতে এআই মডেলের প্রশিক্ষণ-তথ্যের ভান্ডারে ঢুকে গেলে সেগুলোর প্রভাব আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
তবে এই প্রচারণার প্রভাব নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। গার্ডিয়ানের পরীক্ষায় দেখা গেছে, চ্যাটবটগুলো ইতিমধ্যে হ্যানোভার ইনস্টিটিউটের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সতর্কতা দেখাতে শুরু করেছে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠানটির প্রচারণামূলক কনটেন্ট এআইয়ের উত্তরে প্রবেশ করলেও, সেটির উৎস নিয়ে সন্দেহের কথাও উঠে আসছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইলের প্রতি জনসমর্থন কমে যাওয়ার প্রমাণও বিভিন্ন জরিপে পাওয়া যাচ্ছে। গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে উদ্ধৃত জরিপ অনুযায়ী, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে গ্যালাপের এক জরিপে প্রথমবারের মতো ইসরাইলিদের তুলনায় ফিলিস্তিনিদের প্রতি বেশি সহানুভূতি দেখান আমেরিকানরা। এপ্রিলের পিউ জরিপে ৬০ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ইসরাইল সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাবের কথা জানান।
ইসরাইলি সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে কোনো ‘প্রভাব বিস্তার অভিযান’ চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে। পাইরোর সহপ্রতিষ্ঠাতা ড্যানিয়েল রোজেনবার্গও বলেছেন, তাদের কাজ ছিল ইসরাইল সম্পর্কে ‘সঠিক ও তথ্যসূত্রসমৃদ্ধ’ তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং ভুল তথ্যের মোকাবিলা করা।
বিশ্লেষকদের মতে, ঘটনাটি এআই যুগে তথ্যযুদ্ধের নতুন মাত্রা তুলে ধরছে। এখন শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা সংবাদমাধ্যমে প্রচারণা চালানো নয়, ভবিষ্যতে মানুষ এআই চ্যাটবটকে যে প্রশ্ন করবে, তার উত্তরের তথ্যভান্ডারকেও প্রভাবিত করার চেষ্টা করা হতে পারে। ফলে এআইয়ের তথ্যের উৎস, নির্ভরযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে নতুন করে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।