শান্তির ভাষা এতোটা ‘ফাঁকা’ শোনায়নি, যতটা ‘ফাঁকা ও অসার’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘গাজা শান্তি বোর্ড’-এর সনদ। অনেকটা নিঃশব্দে প্রায় ৬০টি দেশে এর খসড়া সনদ বিতরণ করে সদস্যপদ লাভের জন্য এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত দাবি করা হয়। আর এই দাবির মাধ্যমে প্রস্তাবটি ‘শান্তির নৈতিক অর্থ’ থেকে বিচ্যুত হয় এবং একটি আর্থিক লেনদেনে পরিণত হয়। বিশ্বকে যা দেওয়া হচ্ছে তা দুর্ভোগের অবসান বা ধ্বংসের পরে ন্যায়বিচার নয়, বরং একটি বিধ্বস্ত ভূমি এবং এর জনগণের ওপর দীর্ঘমেয়াদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প।
গাজা সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসছে না; এটি এখনো পরিস্থিতির চাপে পিষ্ট হচ্ছে। পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে, বেসামরিক নাগরিকদের ব্যাপকভাবে বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে, দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি আরো খারাপ হতে দেওয়া হয়েছে এবং অপরাধের অভিযোগ অমীমাংসিতই থেকে গেছে। গাজার ভবিষ্যতের যে কোনো আলোচনা শুরু হতে হবে যুদ্ধবিরতি, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক সংস্থা পুনরুদ্ধারের মাধ্যমে। কিন্তু ট্রাম্পের বোর্ড শুরু হয় অন্য কোথাও থেকে। এই বোর্ডের সূত্রপাত অর্থ, কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ দিয়ে।
প্রস্তাবের কাঠামো প্রকাশিত হচ্ছে। সদস্যপদ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে নির্ধারিত। এর শর্তাবলী সম্মিলিত পর্যালোচনা বা আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেটের মাধ্যমে নবায়নযোগ্য নয় বরং এটি ঠিক করবেন এর চেয়ারম্যান এককভাবে। এতে ফিলিস্তিনিদের অংশীদার, সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী, এমনকি আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণকারী হিসেবেও উল্লেখ করা হয়নি। গাজার স্থিতিশীলতা, এর পরিচালনা এবং পুনর্নির্মাণের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু কোথাও ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার নিয়ে বলা হয়নি। এটি ফিলিস্তিনিদের সম্মতি ছাড়া শাসন, জবাবদিহিতা ছাড়া কর্তৃত্ব এবং জনগণ ছাড়াই শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা বলে।
বিলিয়ন ডলারের সদস্য পদ আকস্মিক নয়। ইঙ্গিত দেয় যে এটি কোনো স্বল্পমেয়াদী মানবিক ব্যবস্থা নয় বরং একটি দীর্ঘমেয়াদী উদ্যোগ। ধ্বংস পরিণত হয়েছে সুযোগে আর দুর্ভোগ উদ্দেশ্যসাধানের উপায়ে। শান্তি পরিণত হয়েছে ব্যালেন্স শিটে । যা প্রস্তাব করা হচ্ছে তা হল দুর্যোগ পুঁজিবাদ।
সমান সুযোগের বিষয়টি সনদ এড়িয়ে চলে। আন্তর্জাতিক আইনের কোনো স্থান নেই, চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের কোনো উল্লেখ নেই, ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রস্তাবের কোনো স্বীকৃতি নেই, আন্তর্জাতিক বিচার আদালত বা এর অস্থায়ী ব্যবস্থার প্রতি কোনো শ্রদ্ধা নেই। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ স্পষ্টতই অনুপস্থিত। এই বাদ দেয়া ইচ্ছাকৃত। কারণ জাতিসংঘ-নির্ধারিত কাঠামো আইনি বাধ্যবাধকতা, স্বচ্ছতা এবং ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা আরোপ করে। ট্রাম্পের বোর্ড এই তিনটি বিষয় থেকে মুক্তি চায়।
জাতিসংঘ ব্যবস্থাকে এড়িয়ে ওয়াশিংটন নিজেকে এবং তার অংশীদারদের তদন্ত থেকে রক্ষা করছে। বোর্ড একটি সমান্তরাল কাঠামো তৈরি করে - তহবিলে বিশ্বব্যাপী, নিয়ন্ত্রণে সংকীর্ণ এবং দায়িত্বে অস্বচ্ছ। যদি এটি রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়, তবে দোষ দেওয়া যেতে পারে। যদি এটি বাণিজ্যিকভাবে সফল হয়, তবে কৃতিত্ব এবং প্রভাব শক্তভাবে ধরে রাখা হবে।
বিশ্বব্যাপী আমন্ত্রণের তালিকা প্রতারণাকে আরো গভীর করে তোলে। কয়েক ডজন দেশকে শান্তি বোর্ডের সমান স্থপতি হিসেবে নয় বরং অর্থায়নকারী ও বৈধতা প্রদানকারী আনুষঙ্গ হিসেবে অংশগ্রহণ করতে বলা হচ্ছে। বিশেষ করে আরব রাষ্ট্রগুলো একটি নৈতিক ক্রসরোডের মুখোমুখি। ফিলিস্তিনিদের বাদ দেয় এবং সার্বভৌমত্ব অস্বীকার করে এমন একটি বোর্ডকে গ্রহণ করা নিরপেক্ষতা নয়; বরং এটি রাজনৈতিকভাবে ফিলিস্তিনকে মুছে ফেলার ক্ষেত্রে সহযোগিতা। গাজাকে স্বশাসন থেকে বঞ্চিত করার সময় চেক লেখা মর্যাদা পুনর্গঠন করে না - এটি দখলদারিত্বকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেয়।
গ্লোবাল সাউথের জন্য এর প্রভাব ফিলিস্তিনের অনেক বাইরেও বিস্তৃত। এই মডেলটি এমন একটি নজির স্থাপন করে যেখানে বিধ্বস্ত অঞ্চলগুলোকে তাদের সম্মতি ছাড়াই আন্তর্জাতিকীকরণ করা যেতে পারে এবং তা অভিজাত বোর্ডের মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে। এটি ভবিষ্যতের হস্তক্ষেপের জন্য একটি মহড়া।
ইতিহাস এখানে কোনো স্বাচ্ছন্দ্য দেয় না। ইরাক থেকে আফগানিস্তান, হাইতি থেকে কসোভো পর্যন্ত, বাহ্যিকভাবে পরিচালিত সংঘর্ষ-পরবর্তী ব্যবস্থা শুধু স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং তাদেরকে পরনির্ভর করেছে। গাজার প্রস্তাবিত ভাগ্য আরো অন্ধকার: অনির্দিষ্টকালের জন্য বাহ্যিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা, যেখানে দখল-প্রশাসনে বিলীন হয়ে যায়, দায়িত্ব অদৃশ্য হয়ে যায় এবং সার্বভৌমত্ব চিরতরে পিছিয়ে যায়। এটি এমন একটি ব্যবস্থা যার মাধ্যমে কোনো স্থান স্বাধীন বা আনুষ্ঠানিকভাবে দখল করা হয় না, নিজ নাগরিকদের পরিবর্তে কমিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
শান্তি বোর্ডের সবচেয়ে বড় বিপদ এর নৈতিক ঝুঁকির মধ্যে নিহিত। পুনর্গঠনকে জবাবদিহিতা থেকে আলাদা করে, এটি বিশ্বকে শেখায় যে গণহত্যাকে বাকপটুতার সঙ্গে নিন্দা করা যেতে পারে এবং পুরস্কৃত করা যেতে পারে। ন্যায়বিচার ছাড়া আরোপিত স্থিতিশীলতা সহিংসতার অবসান ঘটায় না; একে পুনর্গঠিত করে।
গাজায় প্রকৃত শান্তি কেনা বা পরিচালনা করা যায় না। এটি শুরু হতে হবে তাৎক্ষণিক এবং স্থায়ী যুদ্ধবিরতি, অবাধ মানবিক সহায়তার প্রবেশাধিকার এবং অবরোধ তুলে নেওয়ার মাধ্যমে, যা পুরো জনগোষ্ঠীকে জিম্মি করে রেখেছে।
এরজন্য আমলাতন্ত্রের মাধ্যমে সাধারণ ক্ষমা নয় বরং সংঘটিত অপরাধের জবাবদিহিতা প্রয়োজন। এটি ফিলিস্তিনের পুনর্গঠনে ফিলিস্তিনি নেতৃত্বের দাবি করে, যা বিদেশী মতামত নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনসিদ্ধ হতে হবে।
ট্রাম্পের বোর্ডকে প্রত্যাখ্যান করা একটি অনৈতিক প্রস্তাবের ন্যূনতম নৈতিক প্রতিক্রিয়া। যে রাষ্ট্রগুলো সত্যিকার অর্থে শান্তি চায় তাদের অবশ্যই দুর্ভোগে অর্থায়নকারী পরিকল্পনাগুলোতে অংশগ্রহণ প্রত্যাখ্যান করতে হবে। পরিবর্তে আত্ম-নিয়ন্ত্রণের ওপর ভিত্তি করে আইন-ভিত্তিক ও জাতিসংঘ-নেতৃত্বাধীন প্রক্রিয়াগুলোতে জোর দিতে হবে। এর চেয়ে কম কিছু শান্তি প্রতিষ্ঠা করবে না।
গাজার পরিচালনা পর্ষদের প্রয়োজন নেই। এর ভবিষ্যত নির্ধারণকারী চেয়ারম্যানের প্রয়োজন নেই। এর জন্য ন্যায়বিচার, সার্বভৌমত্ব এবং মানবিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারের প্রয়োজন - যার কোনওটিই এক বিলিয়ন ডলারে কেনা যায় না।
মূল প্রবন্ধ: রঞ্জন সলোমন, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও মানবাধিকার কর্মী
মিডল ইস্ট মনিটর থেকে নেয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত
আরএ