গাজায় ফিলিস্তিনিদের ব্যাপক হত্যার আহ্বান জানিয়েছেন ইসরাইলের এক মন্ত্রী। তার এমন বক্তব্যের পর ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) এক প্রভাবশালী ব্যবসায়ী।
দুবাইভিত্তিক ধনকুবের খালাফ আহমাদ আল-হাবতুর ইসরাইলের জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভিরের বক্তব্যকে ‘বিপজ্জনক নৈতিক অধঃপতন’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। আল-হাবতুর ইউএইর ফেডারেল ন্যাশনাল কাউন্সিলের সাবেক সদস্যও।
রোববার বেন-গভির বলেন, গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জন পুরুষ, নারী বা শিশুকে হত্যা করা উচিত। তিনি ফিলিস্তিনিদের ‘জীবনের যোগ্য নয়’ এবং ‘মানুষও নয়’ বলে মন্তব্য করেন।
এর পরদিন সোমবার এক্সে দেওয়া এক পোস্টে আল-হাবতুর বেন-গভিরের বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ইসরাইল সরকারের একজন মন্ত্রী প্রকাশ্যে ও কোনো ধরনের লজ্জা ছাড়াই গাজায় প্রতি রাতে ৩০ থেকে ৪০ জন মানুষ হত্যার আহ্বান জানাচ্ছেন। একই সঙ্গে তিনি মানুষকে ‘জীবনের অযোগ্য’ হিসেবে বর্ণনা করছেন।
আল-হাবতুর প্রশ্ন তোলেন, এমন বক্তব্য কীভাবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
তিনি আরো বলেন, ইসরাইল সরকারের একজন কর্মকর্তা যদি প্রকাশ্যে এভাবে কথা বলতে পারেন এবং এর জন্য কোনো জবাবদিহির ভয় না থাকে, তাহলে একই সময়ে কীভাবে শান্তি, আলোচনা ও সহাবস্থানের কথা বলা হবে?
আল-হাবতুর ইউএই সরকারের কোনো কর্মকর্তা নন। তবে দেশটির শাসকগোষ্ঠীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতা রয়েছে। ইউএইতে বিশেষ করে প্রভাবশালী নাগরিকদের প্রকাশ্য বক্তব্য কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় তার এমন মন্তব্যকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থগিত করার আহ্বান জানাননি আল-হাবতুর। তিনি ইসরাইলের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ বা দেশটির বিরুদ্ধে ইউএইর অর্থনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের কথাও বলেননি। বেন-গভিরের হত্যার আহ্বানের পর আরব ও মুসলিম দেশগুলোর কী করা উচিত, সে বিষয়েও কোনো প্রস্তাব দেননি তিনি।
ইসরাইলের বড় আরব বাণিজ্যিক অংশীদার ইউএই
গাজায় প্রায় তিন বছর ধরে চলা সংঘাত ও ব্যাপক প্রাণহানির মধ্যেও ইসরাইলের সঙ্গে ইউএইর কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক অব্যাহত রয়েছে।
ইসরাইলের সবচেয়ে বড় আরব বাণিজ্যিক অংশীদার এখন ইউএই। ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার।
২০২০ সালে আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের মাধ্যমে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পক্ষে জোরালো অবস্থান নিয়েছিলেন আল-হাবতুর। তখন তিনি যুক্তি দিয়েছিলেন, আরব দেশগুলোর স্বীকৃতি ইসরাইলকে আরো সংযত করবে এবং ফিলিস্তিনিদের বিষয়ে ছাড় দিতে উৎসাহিত করবে।
ওই সময় তিনি লিখেছিলেন, ইসরাইল যত বেশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার আরব প্রতিবেশীদের সঙ্গে যুক্ত হবে, তত বেশি আপসের পথ খোলার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
কিন্তু এরপর গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান অব্যাহত রয়েছে। অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের নীতিরও সমালোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণের গতিও বেড়েছে।
এ ছাড়া ইসরাইল লেবানন ও সিরিয়ার কিছু অংশে হামলা ও দখলদারত্ব চালিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কাতার, ইয়েমেন ও ইরাকেও হামলা চালানো হয়েছে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রকে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার অভিযোগও রয়েছে। এসব ঘটনায় পুরো অঞ্চল অস্থিতিশীল হয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে।
আল-হাবতুর তার এক্স পোস্টে বলেন, গাজার মানুষ মানুষ। তাদের শিশুরাও মানুষ। তাদের নারী ও পুরুষেরাও মানুষ। অন্য সবার মতো তাদেরও জীবন ও মর্যাদার অধিকার রয়েছে।
আগেও ট্রাম্পের সমালোচনা
ইসরাইল-ফিলিস্তিন ইস্যুতে আল-হাবতুরের এটি প্রথম প্রকাশ্য মন্তব্য নয়। এর আগেও তিনি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেছেন।
মার্চে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর পর তিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সমালোচনা করেন। ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় মিত্রদের বিপদের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন এবং যুদ্ধকে তার অগ্রাধিকারের শীর্ষে রেখে মার্কিন নাগরিকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এএম