ভারতের সঙ্গে আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতায় নিজেদের প্রাপ্য পানির অংশ নিয়ন্ত্রণ বা বন্ধের চেষ্টা করা হলে সেই ‘হাত কেটে ফেলা হবে’ বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছে পাকিস্তান।
দক্ষিণ এশিয়ার দুই প্রতিবেশী দেশ ভৌগোলিকভাবে হিমালয়, তিব্বত মালভূমি ও পির পাঞ্জাল পর্বতমালা থেকে উৎপন্ন ছয়টি নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল। দেশভাগের পর পানি বণ্টন নিশ্চিত করতে ১৯৬০ সালে দুই দেশ বিশ্বের অন্যতম সফল নদী বণ্টন চুক্তি হিসেবে পরিচিত সিন্ধু পানি চুক্তি (ইন্দুস ওয়াটার ট্রিটি) স্বাক্ষর করে।
তবে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক উত্তেজনার কারণে বর্তমানে ওই চুক্তি বড় পরীক্ষার মুখে পড়েছে। ভারত পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে।
মঙ্গলবার এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী মুসাদিক মালিক বলেন, ‘আমরা ঘোষণা দিয়েছি, যে হাত আমাদের পানির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে, সেই হাত কেটে ফেলা হবে। শুধু ঘোষণা নয়, গত দেড় বছরের ঘটনায় আমরা সেটি দেখিয়েছিও।’
ভারতের পক্ষ থেকে পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও প্রবাহিত হতে না দেওয়ার বক্তব্যের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
মালিক বলেন, ‘এটি শুধু ন্যায়বিচারের বিষয় নয়। আমাদের সামরিক বাহিনীও দেখিয়েছে—শুধু পানি নয়, আকাশযুদ্ধেও আমরা আপনাদের হাত কেটে দিতে পারি।’ তিনি গত বছরের মে মাসে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের বিমান সংঘাতের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন, যাতে বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রতিবেশী দেশের প্রধানমন্ত্রী একটি কলের নিয়ন্ত্রণ হাতে রেখেছেন এবং তিনি বলছেন, পাকিস্তানে এক ফোঁটা পানিও যেতে দেবেন না।’
পাকিস্তানি মন্ত্রীর এই বক্তব্য ভারতের পানিসম্পদমন্ত্রী সি আর পাতিলের সাম্প্রতিক মন্তব্যের জবাব। পাতিল বলেছিলেন, ১৯৬০ সালের সিন্ধু পানি চুক্তি স্থগিত হওয়ার পর পাকিস্তানে ‘এক ফোঁটা পানিও’ প্রবাহিত না হওয়া নিশ্চিত করতে ভারত সরকার কাজ করছে।
কাশ্মীরে এক হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর গত বছর চুক্তিটি স্থগিত করে ভারত। ওই ঘটনার পর দুই দেশ পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গিয়েছিল।
পাকিস্তানের মন্ত্রী জানান, দেশটির প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ মানুষ এমন পানির ওপর নির্ভরশীল, যা কৃষিকাজের জন্য অপরিহার্য। পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হলে খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং অর্থনীতিতে বড় প্রভাব পড়বে।
বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় হওয়া সিন্ধু পানি চুক্তিতে সিন্ধু অববাহিকার ছয়টি নদীর পানি বণ্টনের নিয়ম নির্ধারণ করা হয়। এর মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলের তিন নদী সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব পাকিস্তানের জন্য এবং পূর্বাঞ্চলের তিন নদী রাভি, বিয়াস ও শতদ্রু ভারতের জন্য বরাদ্দ করা হয়।
ভারত থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর পানি পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির কৃষি, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পানীয় জলের অন্যতম প্রধান উৎস এই প্রবাহ।
চুক্তি অনুযায়ী, ভারতকে বছরে প্রায় ৪ কোটি ৩০ লাখ একর-ফুট পানি পাকিস্তানে প্রবাহিত হতে দিতে হয়, যা পাকিস্তানের মোট ভূপৃষ্ঠস্থ পানির প্রায় ৮০ শতাংশ।
পাকিস্তান অভিযোগ করেছে, ভারত পানিকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। দেশটি বলেছে, সীমান্ত অতিক্রমকারী নদীর প্রবাহ পরিবর্তনের যেকোনো চেষ্টা “যুদ্ধের কর্মকাণ্ড” হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এদিকে, পানির অধিকার নিয়ে আলোচনা করতে মঙ্গলবার পাকিস্তান একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছে। এতে পানি বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।
পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার সম্মেলনে মূল বক্তব্য দেবেন। পরে বিশেষজ্ঞরা চুক্তির আইনি ভিত্তি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সংঘাত প্রতিরোধের বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন।
সূত্র: দ্য ইনডিপেন্ডেন্ট
এসআর