মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোর ওপর নির্ভরতা কমাতে নতুন পথে পা বাড়িয়েছে চীন। আর্কটিক মহাসাগর দিয়ে রাশিয়ার উত্তর উপকূল ঘেঁষে ইউরোপে পণ্য পরিবহনের জন্য ‘আইস সিল্ক রোড’ চালু করেছে দেশটি। বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে এই পথ বিশ্ব বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠতে পারে।
চীনা জাহাজ কোম্পানি সি লিজেন্ড রাশিয়ার নর্দার্ন সি রুট ব্যবহার করে চীন থেকে ইউরোপে নিয়মিত পণ্য পরিবহন শুরু করেছে। চীনের নিংবো বন্দর থেকে যুক্তরাজ্যের ফেলিক্সস্টো বন্দর পর্যন্ত এই রুটে পণ্য পরিবহন করা হবে।
এই পথের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো সময় কম লাগা। সুয়েজ খাল হয়ে চীন থেকে ইউরোপে যেতে যেখানে ৪০ দিনের বেশি সময় লাগতে পারে, আর্কটিক পথ ব্যবহার করে তা প্রায় ১৮ থেকে ২০ দিনে নামিয়ে আনা সম্ভব। ফলে জ্বালানি খরচ ও পরিবহন সময়—দুটিই কমতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমানোর চেষ্টা
বর্তমানে এশিয়া-ইউরোপ বাণিজ্যের বড় অংশ সুয়েজ খাল ও লোহিত সাগর দিয়ে পরিচালিত হয়। একই সঙ্গে জ্বালানি পরিবহনে হরমুজ প্রণালিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব নৌপথে যুদ্ধ, হামলা বা রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিলে বিশ্ব বাণিজ্য মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়।
চীনের নতুন আর্কটিক রুট এসব গুরুত্বপূর্ণ ‘চোকপয়েন্ট’ এড়িয়ে এশিয়া ও ইউরোপকে যুক্ত করার সুযোগ দিচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত ও নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বেইজিং বিকল্প পথ তৈরিতে আগ্রহী হয়েছে।
গলছে বরফ, খুলছে নতুন পথ
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আর্কটিক অঞ্চলের বরফ দ্রুত কমছে। এতে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে উত্তর মেরুর এই সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল তুলনামূলক সহজ হচ্ছে। প্রযুক্তির উন্নতি এবং বরফভাঙা জাহাজের সক্ষমতা বাড়ায় বাণিজ্যিকভাবে এই পথ ব্যবহারের সম্ভাবনাও বাড়ছে।
তবে এই পথ এখনই সুয়েজ খাল বা হরমুজ প্রণালির বিকল্প হয়ে উঠছে না। আর্কটিক অঞ্চলের আবহাওয়া অনিশ্চিত, বরফের কারণে জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে আইসব্রেকারের প্রয়োজন হয়। বীমা খরচও বেশি। রাশিয়ার ওপর এই রুটের নিয়ন্ত্রণ থাকায় ইউক্রেন যুদ্ধ ও পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রাজনৈতিক ঝুঁকিও রয়েছে।
বাড়ছে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা
আর্কটিক রুটের বাণিজ্যিক গুরুত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অঞ্চলটি নিয়ে চীন, রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিযোগিতাও বাড়তে পারে। চীন এই উদ্যোগকে ‘পোলার সিল্ক রোড’ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররাও আর্কটিক অঞ্চলে নিজেদের উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিকট ভবিষ্যতে আর্কটিক রুট সুয়েজ খাল বা মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথকে পুরোপুরি প্রতিস্থাপন করবে না। তবে নিয়মিত বাণিজ্যিক চলাচল বাড়লে এটি বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প পথ হয়ে উঠতে পারে। একই সঙ্গে আর্কটিক অঞ্চলকে ঘিরে অর্থনৈতিক ও সামরিক প্রতিযোগিতাও আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সূত্র: আলজাজিরা, ফিন্যান্সিয়াল টাইমস ও দ্য গার্ডিয়ান