হোম > বিশ্ব > তুরস্ক

ইরান যুদ্ধের আসল বিজয়ী এরদোয়ান

বিশ্লেষক

আমার দেশ অনলাইন

রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। ফাইল ছবি

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিরুদ্ধে ইরানের যুদ্ধ থেকে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান বা আসল বিজয়ী হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে তুরস্ক। এই যুদ্ধ দেশটির প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানকে বৈশ্বিক কোনো প্রতিক্রিয়া ছাড়াই দেশের অভ্যন্তরে তার স্বৈরতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পশ্চাৎপসরণকে ত্বরান্বিত করার সুযোগ করে দিয়েছে। বিশ্বের নজর যখন অন্যদিকে ছিল, সেই মুহূর্তটিকে কাজে লাগিয়ে তিনি যেমন বিরোধীদের ওপর দমন-পীড়ন চালিয়েছেন, তেমনি বিশ্বমঞ্চে তুরস্কের অবস্থানও উন্নত করেছেন।

সম্প্রতি তুরস্কের প্রধান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টির (সিএইচপি) সদর দপ্তরে দাঙ্গা পুলিশ জোরপূর্বক প্রবেশ করে। এর তিন দিন আগে একটি তুর্কি আদালতের মাধ্যমে দলটির নেতা ওজগুর ওজেলকে পদচ্যুত করা হয়। এর প্রতিবাদে ভেতরে অবস্থান নেওয়া সমর্থকদের সরাতে পুলিশ টিয়ার গ্যাস ব্যবহার করে। অনেকেই একে দেশের নাগরিক ও রাজনৈতিক স্বাধীনতার শেষ চিহ্নটুকু মুছে ফেলার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন।

ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের তুরস্ক প্রোগ্রামের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক গোনুল তোল বলেন, ‘এরদোয়ানের জন্য অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে এসব করার জন্য এটি একটি নিখুঁত আন্তর্জাতিক পরিবেশ। এই ভূরাজনৈতিক ধাক্কাগুলো এরদোয়ানকে দেশের অভ্যন্তরে অবশিষ্ট গণতান্ত্রিক পরিবেশ নিয়ে যা খুশি তা-ই করতে উৎসাহিত করছে।’

একই সঙ্গে এরদোয়ান ২০২২ সাল থেকে ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থা কমে যাওয়ার ফলে সৃষ্ট কূটনৈতিক শূন্যতাকে কাজে লাগাচ্ছেন।

গোনুল তোলের মতে, এই পরিস্থিতি এমন একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে যেখানে ইউরোপীয় দেশ, ন্যাটো মিত্র এবং আঞ্চলিক প্রতিবেশীরা এরদোয়ানের সঙ্গে কাজ করতে বাধ্য মনে করছে।

এর আগে এরদোয়ানের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ইস্তাম্বুলের মেয়র একরেম ইমামোগ্লুকে গ্রেপ্তারের পর ২০২৫ সালের মার্চ মাসে তুরস্কে বড় ধরনের বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল। ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার ৯ দিন পর ইমামোগ্লুর বিচার শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি থেকে শুরু করে অপরাধমূলক সংগঠন পরিচালনার অভিযোগ আনা হয়েছে, যার ফলে সম্মিলিতভাবে ২ হাজার বছরেরও বেশি কারাদণ্ড হতে পারে।

ইমামোগ্লু এই অভিযোগগুলো দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছেন। তবে এই বিচার নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব থেকে কোনো সমালোচনা আসেনি।

২০২৩ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অল্প ব্যবধানে জয়ী হওয়ার পর থেকে তুরস্কে মূল্যস্ফীতি গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশ। এই অর্থনৈতিক সংকট এরদোয়ানের জনপ্রিয়তায় কিছুটা প্রভাব ফেলায় তিনি নিয়ন্ত্রণ আরো জোরালো করছেন এবং ২০২৮ সালের পরবর্তী নির্বাচনের আগেই বিরোধীদের কোণঠাসা করার চেষ্টা করছেন।

আমেনা স্ট্র্যাটেজিসের সহযোগী ইউসুফ ক্যান বলেন, ‘এরদোয়ানের সরকার বুঝতে পেরেছে ১০-১৫ বছর আগে তাদের যে জনসমর্থন ছিল, তা এখন নেই। এ কারণেই তারা সিএইচপি-কে ধ্বংস করতে এই ধরনের দমনমূলক ও কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতির আশ্রয় নিচ্ছে।’

প্রতিরক্ষা খাতে অংশীদারিত্ব ও বৈশ্বিক প্রভাব

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবর্তনের সুযোগও নিচ্ছেন এরদোয়ান। এই অঞ্চলের অনেক দেশ যুক্তরাষ্ট্রের আকাশ সুরক্ষার ওপর আস্থা হারিয়ে তুরস্কের দিকে ঝুঁকছে। মে মাসে ইরাক ২০টি তুর্কি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার চুক্তি করেছে। এছাড়া ইন্দোনেশিয়া এই মাসে তুরস্ক থেকে ৬০টি পর্যন্ত চালকবিহীন যুদ্ধবিমান‘বায়রাক্তার কিজিললেমা’ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে, যার সরবরাহ ২০২৮ সাল থেকে শুরু হবে। পাশাপাশি পর্তুগালকে দুটি সামরিক সহায়তা জাহাজ সরবরাহের জন্য একটি চুক্তিও বিদ্যমান রয়েছে।

এরদোয়ানের অধীনে তুরস্ক বিশ্বের ১১তম বৃহত্তম অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে। তাদের ড্রোন ইউক্রেন থেকে লিবিয়া পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছে। গোনুল তোল বলেন, এই প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বগুলো এরদোয়ানের অভ্যন্তরীণ অবস্থানকে চাঙ্গা করছে এবং এমন সময়ে বৈধতা তৈরি করছে যখন তার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। একই সঙ্গে এটি তুরস্কের অর্থনীতির জন্য আর্থিক সংস্থান তৈরি করছে।

এরদোয়ান তুরস্ককে একটি প্রধান জ্বালানি বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত করতে চান, যা গুরুত্বপূর্ণ খনিজ উত্তোলন, নতুন পাইপলাইন স্থাপন এবং সমুদ্র বন্দরগুলোকে সংযুক্ত করবে। ওজেলের অপসারণের পর এরদোয়ান বলেন, ‘তুরস্কের লক্ষ্য দর্শক হয়ে থাকা নয়, বরং এই প্রতিযোগিতায় গেম চেঞ্জার হওয়া।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি অর্জনের অর্থ হলো রাজনৈতিক বিরোধীদের নিষ্ক্রিয় করা। আঙ্কারা এমনকি পারস্য উপসাগর থেকে স্থানান্তরিত হতে চাওয়া বিদেশিদের তুরস্কে আসার জন্য ২০ বছরের ট্যাক্স ছুটির প্রস্তাব দিচ্ছে। আগামী জুলাইয়ের শুরুতে যখন এরদোয়ান ন্যাটো জোটের একটি বড় সম্মেলনের আয়োজন করবেন, তখন তিনি ইরান যুদ্ধ শুরুর আগের চেয়ে অনেক বেশি শক্তিশালী অবস্থান ও সুবিধা নিয়ে কথা বলবেন।

গোনুল তোল আরো বলেন, এমন একটা সময় ছিল যখন ন্যাটোকে গণতান্ত্রিক বিশ্বের জন্য একটি প্রতিরক্ষা সংস্থা হিসেবে ফ্রেম করা হতো, এখন আর তা বলা যাবে না। পশ্চিমা দেশ ও ন্যাটো মিত্ররা গণতান্ত্রিক ক্ষয় ও স্বৈরতান্ত্রিক সুসংহতকরণের দিকে কম মনোযোগ দেবে এবং প্রযুক্তিগত বিষয়ের ওপর বেশি ফোকাস করবে।’

তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন এটি একটি ভুল হবে, কারণ স্বৈরাচারীদের মাথায় সবসময় নিজেদের শাসন টিকিয়ে রাখার চিন্তা থাকে এবং তারা আন্তর্জাতিক চুক্তিতে অনুগত নাও থাকতে পারে।

সূত্র: আলজাজিরা

এএম

পদ হারালেন তুরস্কের বিরোধীদলীয় নেতা, স্বস্তিতে এরদোয়ান

ইস্তাম্বুলে কনস্যুলেট বন্ধের কথা ভাবছে ইসরাইল

বেশি সন্তান চান এরদোয়ান, সায় নেই অভিভাবকদের

তুরস্কে এরদোয়ান-জেলেনস্কি বৈঠক, জোরালো শান্তি উদ্যোগের আহ্বান

যুক্তরাজ্যের কাছ থেকে ২০টি টাইফুন যুদ্ধবিমান কিনছে তুরস্ক

ইরান–যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনা প্রশমনে মধ্যস্থতার অঙ্গীকার এরদোয়ানের