ব্রেক্সিটের পর সুইডেনে বসবাসের অধিকার নিয়ে পাঁচ বছর ধরে আইনি লড়াইয়ের পর ৬৫ বছর বয়সি এক ব্রিটিশ নাগরিককে দেশটি থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। সুইডেনে ব্রেক্সিট-পরবর্তী বসবাসের অনুমতি নিয়ে বেশ কয়েকজন ব্রিটিশ নাগরিক সমস্যায় পড়েছেন। এখন পর্যন্ত সুইডেন ৪৫৮ জন ব্রিটিশ নাগরিককে ফেরত পাঠিয়েছে বা জোরপূর্বক অপসারণ করেছে। জনসংখ্যার অনুপাতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্য কোনো সদস্য দেশের তুলনায় এই সংখ্যা বেশি।
চার্লস নামের ওই ব্যক্তি সুইডেনে তার স্ত্রী, বাড়ি ও পরিচিত জীবন ছেড়ে এখন যুক্তরাজ্যে ফিরে এসেছেন। কিন্তু সেখানে তার নিজের কোনো বাড়ি, সম্পত্তি বা নিকট পরিবার নেই। ফলে কার্যত তিনি গৃহহীন অবস্থায় পড়েছেন। সুইডেন থেকে ফিরে চার্লস এখন স্ত্রী, বাড়ি ও পরিচিত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। তার একটাই দাবি—আবার সুইডেনে ফিরে গিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে নিজের ঘরে শান্তিপূর্ণ জীবনযাপন করা।
চার্লস প্রায় ৯ বছর আগে সুইডেনে বসবাস শুরু করেন। ব্রেক্সিটের আগে তিনি দেশটিতে বৈধভাবে বসবাস করছিলেন। পরে সুইডেনে থাকার অধিকার নিশ্চিত করতে তিনি আবেদন করেন। ওই আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর প্রায় পাঁচ বছর ধরে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।
চার্লস সর্বশেষ ২০২২ সালে মাত্র এক সপ্তাহের জন্য যুক্তরাজ্যে গিয়েছিলেন। এর আগে ২০১৭ সালের পর তিনি আর সেখানে যাননি। যুক্তরাজ্যে তার কোনো সন্তান নেই, কোনো সম্পত্তিও নেই। তিনি নিজেকে সুইডেনের সমাজ ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করে নিয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন।
সম্প্রতি চার্লস ও তার সুইডিশ স্ত্রীকে স্থানীয় একটি পুলিশ স্টেশনে যেতে বলা হয়। তারা ধারণা করেছিলেন, তাদের অভিবাসন সংক্রান্ত চলমান মামলার বিষয়ে আলোচনা হবে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর পর চার্লসকে আটক করা হয় এবং জানানো হয় যে তাকে সুইডেন থেকে ফেরত পাঠানো হবে।
চার্লস বলেন, ঘটনাটি তার জন্য ছিল ‘অবিশ্বাস্য ধাক্কা’। তিনি কর্তৃপক্ষকে বলেছিলেন, তাকে আটক করার প্রয়োজন নেই এবং তিনি নিজে থেকেই যুক্তরাজ্যে ফিরে যাবেন। এমনকি নিজের কিছু জিনিসপত্র নেওয়ার জন্য গাড়ি চালিয়ে যুক্তরাজ্যে যাওয়ার অনুমতিও চেয়েছিলেন। কিন্তু তার অনুরোধ গ্রহণ করা হয়নি।
প্রায় দুই সপ্তাহ একটি আটককেন্দ্রে থাকার পর মঙ্গলবার তাকে বিমানে করে স্টকহোম থেকে লন্ডনে পাঠানো হয়। হিথরো বিমানবন্দরে পৌঁছে তার সঙ্গে ছিল মাত্র দুটি ব্যাগ। একটি ব্যাগে তার স্ত্রী কিছু কাপড় দিয়েছিলেন। আটককেন্দ্র থেকে পাওয়া সামান্য কিছু ব্যক্তিগত জিনিসও তার সঙ্গে ছিল।
হিথরোতে পৌঁছানোর পর চার্লস বলেন, যুক্তরাজ্যে তার ‘কিছুই নেই’। ব্রিটিশ কনস্যুলেটের একটি বার্তায় বিমানবন্দরে হঠাৎ গৃহহীন হয়ে পড়া ব্যক্তিদের জন্য কোথায় সহায়তা পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে তথ্য দেওয়া হয়েছিল।
চার্লসের মতে, তিনি কোনো অপরাধ করেননি। তারপরও তাকে অপরাধীর মতো আচরণের শিকার হতে হয়েছে। সুইডেনে থাকার সময় তিনি সমাজের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন, কিছুটা সুইডিশ ভাষা শিখেছেন এবং অর্থনীতিতে অবদান রেখেছেন বলেও জানান। তার প্রশ্ন, কেন তার মতো সাধারণ ও পরিশ্রমী মানুষকে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
ব্রেক্সিটের আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য দেশগুলোর নাগরিকরা অন্য সদস্য রাষ্ট্রে বসবাস, কাজ, পড়াশোনা বা অবসর কাটানোর অধিকার ভোগ করতেন। ব্রেক্সিটের পর যুক্তরাজ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে করা প্রত্যাহার চুক্তিতে ব্রেক্সিটের আগে অন্য দেশে বসবাসকারী ব্রিটিশ ও ইউরোপীয় নাগরিকদের বসবাসের অধিকার সুরক্ষিত রাখার কথা বলা হয়।
ব্রিটিশ নাগরিকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ‘ব্রিটিশ ইন ইউরোপ’-এর চেয়ার জেন গোল্ডিং চার্লসের ঘটনাকে প্রত্যাহার চুক্তির উদ্দেশ্য ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি করে এমন আরেকটি ঘটনা হিসেবে দেখেছেন। তার মতে, সুইডেনে নিজের বাড়ি ও সুইডিশ স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও চার্লস এখন যুক্তরাজ্যে গৃহহীন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছেন।
সুইডেনে বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিকদের নিয়ে এমন কয়েকটি ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে সামনে এসেছে। এর মধ্যে ৭৮ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ বিধবা এবং পূর্ণকালীন পরিচর্যায় থাকা ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত ৭৪ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ নাগরিকের বিরুদ্ধেও দেশ ছাড়ার নির্দেশ জারি হয়েছিল।
এদিকে সুইডেনের বিরোধী দলগুলো ব্রেক্সিট-পরবর্তী এসব সমস্যায় পড়া ব্রিটিশ নাগরিকদের নতুন করে বসবাসের আবেদন করার সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। তবে চার্লসের মতো যাদের ইতোমধ্যে ফেরত পাঠানো হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে কী হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।