যুক্তরাজ্যের আবাসন সংকট মোকাবিলায় নতুন শহর নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়ে দেশটির রাজনীতিতে বিতর্ক শুরু হয়েছে। লেবার সরকার ইংল্যান্ডে সাতটি নতুন শহর গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে উত্তর লন্ডনের এনফিল্ডে প্রায় ২১ হাজার বাড়ি নির্মাণের একটি বড় প্রকল্প রয়েছে। তবে স্থানীয় কনজারভেটিভ নেতৃত্বাধীন প্রশাসন এবং গ্রিন পার্টির সমর্থকদের একাংশ এই প্রকল্পের বিরোধিতা করছে।
এক নিবন্ধে লেখক পলি টয়েনবি বলেন, ব্রিটেনে ক্লেমেন্ট অ্যাটলি ও হ্যারল্ড উইলসনের সময়কার নতুন শহর নির্মাণের ঐতিহ্য আবারও ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে লেবার সরকার। দেশটির দীর্ঘস্থায়ী আবাসন সংকট মোকাবিলায় পরিকল্পিত নতুন শহর নির্মাণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এনফিল্ডের ক্রুজ হিল ও চেজ পার্ক এলাকায় প্রস্তাবিত নতুন শহরটি এ পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। চলতি বছরের মার্চে ব্রিটিশ সরকার সাতটি সম্ভাব্য নতুন শহরের তালিকায় এলাকাটিকে অন্তর্ভুক্ত করে। তখন এনফিল্ডের লেবার নেতৃত্বাধীন স্থানীয় প্রশাসনও প্রকল্পটিকে স্বাগত জানিয়েছিল। সরকারের পরিকল্পনায় নতুন বাড়ির পাশাপাশি স্কুল, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবহন, কর্মসংস্থান ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা গড়ে তোলার কথা রয়েছে।
তবে মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনের পর পরিস্থিতি বদলে যায়। এনফিল্ড কাউন্সিলে কনজারভেটিভদের নেতৃত্বে নতুন প্রশাসন দায়িত্ব নেয় এবং প্রকল্পটির প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করে। তাদের প্রধান আপত্তি হলো, নতুন শহর নির্মাণে গ্রিন বেল্ট হিসেবে সংরক্ষিত জমির একটি অংশ ব্যবহৃত হবে। স্থানীয় কনজারভেটিভ নেতারা জানিয়েছেন, তারা আবাসন নির্মাণের বিরোধী নন; বরং ব্রাউনফিল্ড বা আগে ব্যবহৃত জমি এবং শহরের কেন্দ্র পুনর্গঠনের মাধ্যমে নতুন বাড়ি নির্মাণে বেশি গুরুত্ব দিতে চান।
অন্যদিকে প্রকল্পের সমর্থকদের যুক্তি, এনফিল্ডে আবাসনের প্রয়োজন অত্যন্ত বেশি। প্রস্তাবিত এলাকায় রেল যোগাযোগও ভালো। গ্রিন বেল্টের আওতাভুক্ত জমির একটি অংশ বাস্তবে বাগানকেন্দ্র, গ্রিনহাউস, গলফ কোর্সসহ বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে এসব জমির কিছু অংশকে নতুন আবাসন নির্মাণে ব্যবহার করে হাজার হাজার মানুষের জন্য বাড়ি তৈরি করা যেতে পারে।
লন্ডনের মেয়র সাদিক খানও এনফিল্ড ও থেমস্মিডে নতুন শহর নির্মাণের পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। তবে স্থানীয় রাজনীতিতে আবাসন নির্মাণ বনাম পরিবেশ সংরক্ষণের প্রশ্নটি এখন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বিরোধে পরিণত হয়েছে। প্রকল্পের বিরোধীরা স্থানীয় সবুজ এলাকা রক্ষার ওপর জোর দিচ্ছেন, আর সমর্থকেরা বলছেন, আবাসন সংকট মোকাবিলায় বড় আকারের পরিকল্পিত নির্মাণ ছাড়া বিকল্প সীমিত।
ব্রিটিশ সরকারের আবাসনমন্ত্রী ম্যাথিউ পেনিকুক নতুন শহর পরিকল্পনায় অতীতের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর চেষ্টা করছেন। আগের নতুন শহরগুলোর অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার ব্যক্তিগত গাড়িনির্ভর বিচ্ছিন্ন আবাসিক এলাকা না বানিয়ে গণপরিবহনকেন্দ্রিক, ঘনবসতিপূর্ণ এবং স্কুল, হাসপাতাল, দোকান, বিনোদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগসমৃদ্ধ শহর গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারের বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইংল্যান্ডে সাতটি নতুন শহর নির্মাণের উদ্যোগকে গত পাঁচ দশকের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী আবাসন কর্মসূচিগুলোর একটি হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিটি প্রকল্পে বিপুলসংখ্যক বাড়ির পাশাপাশি পরিবহন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সবুজ অবকাঠামো সমন্বিতভাবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো দীর্ঘদিনের আবাসন সংকট কমানো এবং নতুন কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সুযোগ তৈরি করা।
তবে স্থানীয় পরিবেশ, জমির ব্যবহার এবং স্থানীয় জনগণের মতামতকে কীভাবে জাতীয় আবাসন চাহিদার সঙ্গে সমন্বয় করা হবে—এটাই নতুন শহর পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনফিল্ডের বিতর্ক সেই বৃহত্তর প্রশ্নকেই সামনে এনেছে: আবাসন সংকট মোকাবিলায় জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে, নাকি স্থানীয়ভাবে সংরক্ষিত ভূমি ও পরিবেশ রক্ষাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।