যুক্তরাজ্যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বিদেশ ভ্রমণ নিয়ে নতুন করে বৈষম্যের অভিযোগ উঠেছে। দেশটির বিভিন্ন স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও এনএইচএসের স্বাস্থ্য বোর্ড অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধীদের নিজস্ব কেয়ার ফান্ড ব্যবহার করে বিদেশে ব্যক্তিগত সহকারী সঙ্গে নেওয়ার অনুমতি দিচ্ছে না। ফলে একই ধরনের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কোথায় বসবাস করেন, তার ওপর নির্ভর করছে তিনি বিদেশে যেতে পারবেন কি না।
অনেক ক্ষেত্রে বিদেশ ভ্রমণের কারণে সরকারের অতিরিক্ত কোনো খরচও হয় না। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সাধারণত নিজেদের ভ্রমণ খরচ বহন করেন এবং সঙ্গে থাকা ব্যক্তিগত সহকারীর টিকিট, থাকা-খাওয়া ও বিমার খরচও নিজেরাই পরিশোধ করেন। তবু কোনো কোনো স্বাস্থ্য বোর্ড বা স্থানীয় কাউন্সিল বিদেশে কেয়ার সেবা চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানায়।
এ ধরনের পরিস্থিতিকে অধিকারকর্মীরা ‘পোস্টকোড লটারি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অর্থাৎ একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কোন এলাকায় বসবাস করছেন, তার ওপর নির্ভর করছে তিনি কেয়ার সহায়তা নিয়ে বিদেশে যেতে পারবেন কি না। কোথাও বিদেশ ভ্রমণের ক্ষেত্রে কেয়ার ফান্ড ব্যবহারের অনুমতি রয়েছে, কোথাও একাধিক শর্ত দেওয়া হয়, আবার কোথাও বিষয়টি স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
৩৮ বছর বয়সী লুসি রবিনসন চতুরঙ্গ পক্ষাঘাতে আক্রান্ত এবং ২৪ ঘণ্টা ব্যক্তিগত সহকারীদের সহায়তা নিয়ে চলেন। তিনি ইউরোপিয়ান স্পাইনাল কর্ড ইনজুরি ফেডারেশনের সভাপতি হিসেবে নিয়মিত আন্তর্জাতিক কর্মসূচিতে অংশ নেন। কিন্তু অক্সফোর্ডশায়ারের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ তাকে বিদেশে কেয়ার প্যাকেজ ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ায় নরওয়ে ও আলবেনিয়ায় নির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করতে হয়।
রবিনসন জানান, এ অভিজ্ঞতা তাকে প্রচণ্ড মানসিক চাপে ফেলেছিল। তার ভাষায়, ভ্রমণ তাঁর কাজ ও জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং তিনি শুধু অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে চান না, স্বাভাবিকভাবে বাঁচতে চান। শেষ পর্যন্ত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য বোর্ড সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে এবং বিদেশে তার কেয়ার ব্যয় বহনে সম্মত হয়।
আরেকটি ঘটনায় ২২ বছর বয়সী চেলসি পেটিটের বিষয়টি সামনে এসেছে। সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত পেটিটের কেয়ার পরিকল্পনায় ল্যাঙ্কাশায়ারের বাইরে ভ্রমণের জন্য বছরে সাত রাত পর্যন্ত দুইজন করে সহকারী রাখার ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু তিনি সাপোর্টেড আবাসনে বসবাস শুরু করার পর বিদেশ ভ্রমণে সেই সুবিধা ব্যবহারের অধিকার নিয়ে কাউন্সিলের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়। তার পরিবার বলছে, জাতীয় পর্যায়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকায় তারা বুঝতে পারছেন না, বিদেশে ভ্রমণের ক্ষেত্রে চেলসির অধিকার আসলে কতটা।
স্পাইনাল ইনজুরিজ অ্যাসোসিয়েশনের কেয়ার ও সহায়তা বিষয়ক কর্মকর্তা ক্যারল ব্যারাক্লফ জাতীয় পর্যায়ে সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তার মতে, বিদেশে কেয়ার সহায়তা দিতে অস্বীকৃতি জানালে করদাতাদের কোনো অর্থ সাশ্রয় হয় না, কারণ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কেয়ার ব্যয় এমনিতেই বহন করা হচ্ছে।
অ্যাডাল্ট সোশ্যাল কেয়ার ওয়ারিয়র্সের প্রতিষ্ঠাতা জিসেল হোড বলেন, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জীবনযাপন সম্পর্কে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পূর্বধারণাও এ সমস্যার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক সময় কেয়ার ব্যবস্থা ধরে নেয়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পরিবার, সম্পর্ক, চাকরি কিংবা ভ্রমণের প্রয়োজন নেই এবং কাছাকাছি এলাকায় সুযোগ পেলেই তাদের সন্তুষ্ট থাকা উচিত।
ইংল্যান্ডে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের কেয়ার সহায়তা প্রধানত দুটি ব্যবস্থার মাধ্যমে দেওয়া হয়—উচ্চমাত্রার প্রয়োজন থাকা ব্যক্তিদের জন্য এনএইচএস কন্টিনিউয়িং হেলথকেয়ার এবং স্থানীয় কাউন্সিলের সামাজিক কেয়ার ব্যবস্থা। কিন্তু বিদেশ ভ্রমণের সময় এসব সহায়তা কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে একক ও স্পষ্ট নীতিমালা না থাকায় বিভিন্ন এলাকায় ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে।
ব্রিটেনের স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যোগ্য ব্যক্তিদের স্বাধীন ও পরিপূর্ণ জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রত্যেক ব্যক্তির প্রয়োজন অনুযায়ী কেয়ার প্যাকেজ তৈরি করা এনএইচএসের ইন্টিগ্রেটেড কেয়ার বোর্ডগুলোর দায়িত্ব এবং জাতীয় নীতি ও আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের এ দায়িত্ব পালন করা উচিত।
প্রতিবন্ধী অধিকারকর্মীদের দাবি, বিদেশ ভ্রমণকে বিলাসিতা হিসেবে দেখার পরিবর্তে এটিকে স্বাধীনভাবে জীবনযাপনের অধিকারের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। তাদের মতে, জাতীয় নির্দেশনা প্রণয়ন করা হলে একই ধরনের কেয়ার প্রয়োজন থাকা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে এলাকা ভেদে বৈষম্য কমানো সম্ভব হবে।