যুক্তরাজ্যে মুসলিমবিদ্বেষ মোকাবিলায় শিগগিরই একজন বিশেষ উপদেষ্টা নিয়োগ দেবে সরকার। ‘বিভেদের আরেকটি দশক’ এড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম।
বুধবার ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটিশ মুসলিম সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন বার্নহাম। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর এটিই ছিল তাদের সঙ্গে তার প্রথম বৈঠক। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন কমিউনিটিজ-বিষয়ক মন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার।
বৈঠকে বার্নহাম স্বীকার করেন, যুক্তরাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়কে বিভেদের ভয়াবহ কিছু অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বিশেষ করে অনলাইনে ছড়ানো বিদ্বেষ তাদের জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি জানান, মুসলিমবিষয়ক একজন সরকারি উপদেষ্টা শিগগিরই নিয়োগ দেওয়া হবে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন ব্রিটিশ মুসলিম সম্প্রদায়ের অধিকার নিয়ে কাজ করা নজরদারি সংস্থা ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্টের প্রধান আকিলা আহমেদ। তিনি এই পদে উপদেষ্টা নিয়োগের উদ্যোগকে ‘ইতিবাচক পদক্ষেপ’ বলে অভিহিত করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, মুসলিম সম্প্রদায় বর্তমানে বড় ধরনের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।
আহমেদ সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ব্রিটিশ মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্যাপন করার মতো অনেক অর্জন রয়েছে। কমিউনিটি সেন্টার থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনের তারকা—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই তাদের সাফল্য রয়েছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জও আছে। মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধ বাড়ছে, প্রতি পাঁচ দিনে একটি মসজিদে হামলা বা বর্ণবাদী ঘটনার শিকার হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রতি ছয়জনের একজন ব্রিটিশ মুসলিমদের সম্পর্কে বিদ্বেষপূর্ণ মনোভাব পোষণ করেন।
তিনি বলেন, এসব সমস্যার সমাধান জরুরি। বিভেদ সৃষ্টিকারী শক্তির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নতুন সরকারি উপদেষ্টার সঙ্গে কাজ করার অপেক্ষায় রয়েছে ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট।
চলতি গ্রীষ্মে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মুসলিমবিষয়ক উপদেষ্টা নিয়োগের জন্য চাপের মুখে রয়েছেন বার্নহাম।
এর আগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার গত মার্চে মুসলিমবিদ্বেষের সংজ্ঞা নির্ধারণ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের সুরক্ষায় বিভিন্ন পদক্ষেপ ঘোষণার সময় এ বিষয়ে একজন ‘বিশেষ প্রতিনিধি’ নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ওই প্রতিনিধির দায়িত্ব হবে যুক্তরাজ্যজুড়ে মুসলিম এবং মুসলিম বলে বিবেচিত ব্যক্তিদের প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণা মোকাবিলায় বিভিন্ন উদ্যোগকে এগিয়ে নেওয়া। এ জন্য তিনি বিভিন্ন সম্প্রদায়, স্কুল ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজ করবেন।
গত সেপ্টেম্বরে লেবার পার্টির জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য আফজাল খান সতর্ক করে বলেছিলেন, মুসলিমবিদ্বেষ মোকাবিলায় বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগের স্পষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। এ সময় তিনি সরকারকে দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাজ্যে মুসলিমবিদ্বেষী অপরাধের ঘটনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর পেছনে উগ্র ডানপন্থী মতাদর্শের বিস্তারকে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ব্রিটিশ দাতব্য সংস্থা টেল মামার তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে লন্ডনে মুসলিমবিদ্বেষী ঘটনার সংখ্যা ছয় গুণ বেড়েছে। গত বছর লন্ডনে এ ধরনের ঘটনার ১ হাজার ৯০৯টি অভিযোগ নথিভুক্ত হয়, যা এক বছরে সর্বোচ্চ। ২০২৬ সালের পুরো বছরের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কারণ, জুনের শেষ নাগাদই এ ধরনের ১ হাজার ৩১টি ঘটনার খবর পাওয়া গেছে।
সরকারের সমর্থনপুষ্ট নজরদারি সংস্থা ব্রিটিশ মুসলিম ট্রাস্ট জানিয়েছে, যুক্তরাজ্যের মসজিদগুলোতে হামলার ঘটনা আরো গুরুতর হয়ে উঠছে। তবে গত এক বছরে তুলনামূলক কম গুরুতর হয়রানির ঘটনা কমেছে।
বার্নহাম বলেন, তিনি চান, যুক্তরাজ্যের তরুণ মুসলিমরা যেন অনুভব করেন যে এই দেশ তাদেরও। দেশটি তাদের পাশে রয়েছে, তাদের সহায়তায় কাজ করছে এবং তাদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
মুসলিমদের প্রতি বিরোধী দলগুলোর অবস্থানেরও সমালোচনা করেন তিনি। বার্নহামের ভাষায়, এ বিষয়ে বিরোধী দলগুলোর অবস্থান ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’। তিনি আরো বলেন, মুসলিম সম্প্রদায় সম্পর্কে তারা যে ধরনের ভাষা ব্যবহার করে, তা গ্রহণযোগ্য নয়।
এদিকে প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় সেনাবাহিনীর হয়ে লড়াই করতে গিয়ে প্রাণ হারানো কয়েক লাখ মুসলিম সেনার স্মরণে একটি যুদ্ধস্মৃতিসৌধ নির্মাণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে বলেও জানিয়েছেন বার্নহাম। প্রকল্পটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল। এটি নির্মাণে প্রায় ১০ লাখ পাউন্ড (১৩ লাখ ৩০ হাজার মার্কিন ডলার) ব্যয় হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সূত্র: দ্য ন্যাশনাল নিউজ