ইংল্যান্ডের গ্লস্টার শহরের মুসলিম সম্প্রদায়ের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ঈদ উদ্যাপনের নানা স্মৃতি নিয়ে প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করেছেন শহরটির চলচ্চিত্র নির্মাতা মোহাম্মদ হুসাইন জাফর। ঈদ ইন গ্লস্টার নামের এই প্রামাণ্যচিত্রে উঠে এসেছে শহরটিতে মুসলিমদের বসতি গড়ে তোলা, ধর্মীয় চর্চা এবং সময়ের সঙ্গে সম্প্রদায়টির বিকাশের গল্প।
গ্লস্টারে ১৯৭৭ সাল থেকে বসবাস করছেন জাফর। প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণের জন্য তিনি কয়েক মাস ধরে পরিকল্পনা, চিত্রধারণ ও সম্পাদনার কাজ করেছেন। ঈদের উৎসবমুখর পরিবেশ তুলে ধরার পাশাপাশি গ্লস্টারকে নিজের আবাসস্থল হিসেবে বেছে নেওয়া মুসলিমদের অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও স্মৃতি সংরক্ষণ করাই ছিল তার উদ্দেশ্য।
জাফর বলেন, শহরটিতে আসার পর থেকে মুসলিম সম্প্রদায় কীভাবে বেড়ে উঠেছে, তা তিনি তুলে ধরতে চেয়েছেন। তার ভাষায়, “গ্লস্টার ছোট শহর হলেও এর হৃদয় অনেক বড়। এখানে বহু সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে বসবাস করেন।”
প্রামাণ্যচিত্রটিতে প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের স্মৃতি থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের অভিজ্ঞতাও তুলে ধরা হয়েছে। এতে অংশ নেওয়া জুলেখা কাদোদিয়া গ্লস্টারে কয়েক দশক আগে ঈদ উদ্যাপনের স্মৃতিচারণ করেছেন। তিনি ১৯৬৯ সাল থেকে শহরটিতে বসবাস করছেন।
জুলেখা বলেন, “প্রথম দিকে গ্লস্টারে কোনো মসজিদ ছিল না। প্রথম প্রজন্মের মুসলিমরা ছোট ছোট ভাড়া করা বাড়িতে প্রতিদিনের নামাজ আদায় করতেন। এসব জায়গায় ইমামরা নামাজের নেতৃত্ব দিতেন। সম্প্রদায়ের আকার ছোট হওয়ায় ঈদও পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ঘরেই নীরবে উদ্যাপন করা হতো।”
গ্লস্টার ফিড দ্য হাংরি সংগঠনের পরিচালক হাশিম নোরাতও প্রামাণ্যচিত্রে নিজের স্মৃতি তুলে ধরেছেন। তিনি বলেন, শহরের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তার বাবার অবদানের গুরুত্ব তিনি পরবর্তী সময়ে উপলব্ধি করেন। তাঁর বাবাই গ্লস্টারে প্রথম ইসলামি নামাজের কক্ষ চালু করেছিলেন বলে জানান তিনি। নোরাতের বাবা ১৯৬০-এর দশকের শুরু থেকে মাঝামাঝি সময়ে গ্লস্টারে আসা প্রথম প্রজন্মের মুসলিমদের একজন ছিলেন।
শৈশবে ঈদ উদ্যাপনের স্মৃতি তুলে ধরে নোরাত বলেন, “ছোটবেলায় ঈদ সব সময়ই ছিল বিশেষ কিছু। সকালে ঘুম থেকে উঠে আগরবাতি জ্বলতে দেখতাম। বাড়িতে ‘মাশাআল্লাহ’ ও ‘কুসবারা’ ছড়িয়ে থাকত। এসব দেখেই বুঝতে পারতাম, ঈদ এসেছে।”
তিনি আরো বলেন, ঈদের সৌন্দর্যের অন্যতম দিক ছিল পরিবারের সবাই একসঙ্গে হওয়া। আত্মীয়স্বজন, শিশু ও নাতি-নাতনিসহ সবাই এক জায়গায় জড়ো হতেন। সবার একসঙ্গে থাকার মধ্যেই ছিল ঈদের বিশেষ আনন্দ।
নোরাতের বাবা তাদের বাড়ির ভূগর্ভস্থ কক্ষকে নামাজের ঘরে রূপান্তর করেছিলেন। তার দাবি, এটিই ছিল গ্লস্টারের প্রথম নামাজের কক্ষ। বাবার মৃত্যুশয্যার একটি স্মৃতিও তুলে ধরেন নোরাত। তিনি বলেন, তার বাবা জীবনে যেসব আলেমকে শিক্ষা দিয়েছিলেন, তাদের অনেকে মৃত্যুর সময় বাবার পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে একে একে তার কানে নীরবে দোয়া পড়ছিলেন।
নোরাত বলেন, “সেই মুহূর্তেই আমি সত্যিকার অর্থে বুঝতে পেরেছিলাম, আমার বাবা কে ছিলেন। তিনি ছিলেন এই সম্প্রদায়ের অভিভাবক। তার মতো মানুষ খুব বেশি আসেননি।”
বাড়িতে নামাজ আদায়ের ছোট ছোট আয়োজন থেকে সময়ের সঙ্গে গ্লস্টারের মুসলিম জনসংখ্যা বেড়েছে। ফলে স্থায়ী মসজিদ নির্মাণের প্রয়োজন দেখা দেয়। সম্প্রদায়ের সদস্যদের উদ্যোগে তহবিল সংগ্রহের পর ১৯৮৩ সালে রাইক্রফট স্ট্রিটে শহরটির প্রথম পরিকল্পিত মসজিদ নির্মাণ সম্পন্ন হয়।
১৯৬০-এর দশকে শহরের প্রথম দিককার ঈদের জামাতগুলোর একটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল গ্লস্টার পার্কে। এখনো সেখানে ঈদের আয়োজন হয়। জাফরের প্রামাণ্যচিত্রে চলতি বছরের ঈদ উদ্যাপনের ড্রোনে ধারণ করা দৃশ্যও রয়েছে।
জাফর বলেন, গ্লস্টারের বিভিন্ন মসজিদে ঈদ উদ্যাপনের পাশাপাশি গ্লস্টার পার্কেও উৎসবটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। বিশেষ এই দিনে একসঙ্গে হতে শুধু শহরটি থেকেই নয়, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ সেখানে আসেন।
প্রামাণ্যচিত্রটি বিনা মূল্যে ইউটিউবে দেখা যাচ্ছে। আগামী ১৯ জানুয়ারি ২০২৭ তারিখে গ্লস্টার গিল্ডহলেও এটি প্রদর্শিত হবে। প্রামাণ্যচিত্রটি নির্মাণে অর্থায়ন করেছে ভয়েসেস গ্লস্টার ও গ্লস্টারশায়ার কাউন্টি কাউন্সিল।