ঝালকাঠিতে ডাকাতির গুজব রটিয়ে ৯ নির্মাণ শ্রমিককে গণপিটুনি

ঝালকাঠিতে ডাকাতির গুজব রটিয়ে ৯ নির্মাণ শ্রমিককে গণপিটুনি

ঝালকাঠি সদর উপজেলার পিপলিতা গ্রামে ডাকাতির গুজব রটিয়ে ৯ নির্মাণ শ্রমিককে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। গত সোমবার গভীর রাতে ডাকাত সন্দেহে তাদের পিটুনি দেয় স্থানীয়রা।

এলাকাবাসী জানায়, সোমবার রাতে এলাকার মসজিদ থেকে ডাকাত পড়ার ঘোষণা মাইকিং করা হয়। তখন স্থানীয় আইনজীবী ও আওয়ামী লীগ নেতা বনি আমিন বাকলাই অনেককে মোবাইল ফোনে জানান, ডাকাতদল তার বাড়ির আশপাশে ঘোরাফেরা করছে, তাদের মুখ বাঁধা। এর পরপরই স্থানীয়রা লাঠিসোটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে হাজির হয়ে উপস্থিত থাকা নির্মাণ শ্রমিকদের ওপর হামলা চালায়।

বিজ্ঞাপন

এ বিষয়ে বনি আমিন বাকলাই বলেন, ‘সোমবার রাত ১২টা ১০ মিনিটে বেশ কয়েকজন লোক আমার বাড়ির কাছে ট্রলার থামিয়ে ওঠে। তারা বাড়ির চারপাশে ঘোরাফেরা করতে থাকে, যা আমি সিসি ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করি। একই সময়ে নদীর অপর পাড়ে ডাকাতি হচ্ছেÑ এমন মাইকিং হতে থাকে। তাদের সন্দেহজনক ঘোরাফেরা দেখে আমি সদর থানার ওসি ও কয়েকজন স্থানীয়কে ফোন দিয়ে বিষয়টি জানাই। এরপর কয়েক শতাধিক লোক এসে তাদের আটক করে। আমি তাদের পুলিশে হস্তান্তর করি।’

তিনি আরো বলেন, ‘এক ঘণ্টা পর ঝালকাঠির ব্যবসায়ী ফাইজুল ইসলাম এসে জানান, ওই ৯ জন তার নির্মাণ শ্রমিক। ডাকাত সন্দেহে তাদের আটক করার কারণে তিনি এলাকাবাসীকে গালাগালও করেন। তখন বিক্ষুব্ধ জনতা তাকে মারধর করে। আমি তাকে উদ্ধার করে নিরাপদে পাঠিয়ে দিয়েছি।’

ঝালকাঠির কামারপট্টি এলাকার ব্যবসায়ী মো. ফাইজুল ইসলাম বলেন, ‘পিরোজপুরে আমার ৯ কোটি টাকার কালভার্ট ও রাস্তার কাজ চলছিল। তিন কোটি টাকার কাজ শেষ হলেও বিল না পাওয়ায় তা বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আমি ট্রলারযোগে নির্মাণকাজের মালামাল ঝালকাঠির দিকে নিয়ে আসি। ট্রলারটি বনি আমিন বাকলাইয়ের বাড়ির কাছে নোঙর করে। তাদের বলি মালামাল ট্রাকযোগে আমার বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য। কিছুক্ষণ পর আমার শ্রমিকরা জানায়, এলাকাবাসী মাইকিং করে তাদের ডাকাত সন্দেহে আটকে রেখেছে। খবর পেয়ে আমি ঘটনাস্থলে গিয়ে বলি, তারা আমার লোক। তখন আমার ওপর হামলা চালানো হয়। জীবন বাঁচাতে আমি দ্রুত সেখান থেকে চলে আসি।’

তিনি আরো বলেন, ‘পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আমার শ্রমিকদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে যায়। তারা কোনোভাবেই ডাকাত নয়। তাদের সঙ্গে থাকা ট্রলারটিতে নির্মাণকাজের যন্ত্রাংশ ছিল। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে নির্দোষ ব্যক্তিদের ওপর হামলা করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় কয়েকজন বলেন, ‘বনি আমিন বাকলাই এলাকায় ডাকাতির গুজব রটান। এরপর স্থানীয়রা আট-নয়জনকে মারধর করে। পুলিশ যদি সময়মতো না পৌঁছাত, গণপিটুনিতে সবাই মারা যেতে পারত। গুজব রটানো এবং নির্দোষ ব্যক্তিদের ওপর হামলা করার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নইলে মব জাস্টিস থামবে না।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঝালকাঠি সদর থানার ওসি মো. মনিরুজ্জামান আমার দেশকে বলেন, ‘ডাকাত সন্দেহে বেশ কয়েকজনকে আটকের খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাদের উদ্ধার করে থানায় নিয়ে আসে। পরবর্তীতে তাদের চিকিৎসার জন্য ঝালকাঠি সদর হাসপাতালে পাঠিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়। আটককৃতরা নির্মাণ শ্রমিক এবং নির্দোষ হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেয়া হয়।’

এদিকে ঝালকাঠির বিকনা এলাকাসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নে রাত ১১টার পর হতেই ডাকাত পড়েছেÑ এরকম গুজব ছড়ানো হয়। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের আইডি থেকে ডাকাত পড়ার খবর প্রচার করা হয়। এ প্রচারণায় যোগ দেন কয়েকজন সংবাদকর্মীও। মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে ডাকাত পড়ার খবর প্রচার করা হয়। এতে সদর উপজেলার নবগ্রাম, বাসন্ডা ও বিনয়কাঠি ইউনিয়নের গ্রামগুলোয় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে নির্ঘুম রাত কাটায় এলাকাবাসী। তবে সোমবার রাতে সদর উপজেলার কোথাও ডাকাত আসার খবরের সত্যতা পাওয়া যায়নি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন