ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ফেনী অংশে বাড়ছে দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি। চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসে ৮৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৬৯ জন নিহত এবং ৯৫ জন আহত হয়েছেন।
এসব ঘটনায় মামলা হয়েছে ৬২টি। তবে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যানবাহনের অতিরিক্ত গতি শনাক্তের স্পিডগান এবং চালকদের মাদকাসক্তি পরীক্ষার ডোপ টেস্টের সরঞ্জাম থাকলেও সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে না।
দুর্ঘটনায় নিহতদের স্বজনরা অভিযোগ করে বলেন, কার্যকর নজরদারির পরিবর্তে পুলিশের কার্যক্রম অনেক ক্ষেত্রে মামলা করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।
হাইওয়ে পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের একই সময়ে মহাসড়কের ফেনী অংশে দুর্ঘটনায় ৬৬ জন নিহত এবং ৫১ জন আহত হন। এসব ঘটনায় মামলা হয়েছিল ৪৮টি। ২০২৪ সালের একই সময়ে দুর্ঘটনায় ৪৬ জন নিহত এবং ৪৩ জন আহত হন। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দুই বছরের ব্যবধানে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি বেড়েছে।
দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি ও নিহতদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুর্ঘটনার পর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চালকের পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর মামলা ও গাড়ি জব্দ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে পুলিশের কার্যক্রম। এতে দায়ী চালকদের শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক মামলায় আসামির পরিচয় অজ্ঞাত থেকে যায়।
তবে হাইওয়ে পুলিশের দাবি, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে তারা তৎপর রয়েছে। মহাসড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের শরীরে বডি ক্যামেরা রয়েছে। আইন অমান্যকারী চালকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
নিরাপদ সড়ক চাই (নিসচা) ফেনী জেলা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম বলেন, চালকদের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতার অভাবে সড়কে দুর্ঘটনা বাড়ছে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন ও অতিরিক্ত পণ্য পরিবহনের কারণে মহাসড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মহাসড়কে বেপরোয়া গতিতে মোটরসাইকেল চালানোর কারণেও দুর্ঘটনা বাড়ছে। তার দাবি, হাইওয়ে পুলিশের যথাযথ নজরদারি থাকলে দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা সম্ভব।
এদিকে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে চালকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বিআরটিএ ফেনী সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ার) মো. আল ফয়সাল। তিনি বলেন, মহাসড়কে দুর্ঘটনা রোধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়। ফিটনেসবিহীন গাড়ির চলাচল বন্ধেও অভিযান চালানো হবে। পাশাপাশি চালকদের প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
তিনি আরো বলেন, গত ১২ জুলাই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ২১ জনের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে এক কোটি পাঁচ লাখ টাকা এবং আহত দুই ব্যক্তির পরিবারকে চার লাখ টাকার অনুদানের চেক দেওয়া হয়েছে।
ফেনী সদরের ফাজিলপুর হাইওয়ে পুলিশের ওসি মোহাম্মদ কবির হোসেন বলেন, আমাদের আওতাধীন এলাকায় একই সময়ে ৩৬ দুর্ঘটনায় ৩২ জন নিহত এবং ৪০ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ২৪টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে এবং ৯টি মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে। বাকি চারটি মামলার তদন্ত চলছে। সব মিলিয়ে দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণে আমাদের সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
মহিপাল হাইওয়ে পুলিশের পরিদর্শক মো. নুরুল আফছার বলেন, জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত আওতাধীন এলাকায় ৫১টি দুর্ঘটনায় ৩৭ জন নিহত এবং ৫৫ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় ৩৮টি মামলা হয়েছে। গাড়ির গতি নিয়ন্ত্রণে স্পিডগান এবং চালকদের মাদকাসক্তি শনাক্তে ডোপ টেস্ট কার্যক্রম বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। এআই ক্যামেরা স্থাপনের কারণে স্পিড গান ব্যবহার করা হচ্ছে না।
তিনি বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার জন্য এককভাবে কাউকে দায়ী করা যায় না। এ ক্ষেত্রে জনসচেতনতার অভাব রয়েছে। মহাসড়কে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যাও বাড়ছে। দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানো এবং ফুটওভার ব্রিজ ব্যবহার না করে সড়ক পারাপারের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
অন্যদিকে, এসব সড়ক দুর্ঘটনার ঘটনায় মামলা হলেও দায়ীদের শনাক্ত করা এবং বিচারিক অগ্রগতি নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বেপরোয়া গতি ও অদক্ষ চালকদের কারণে দুর্ঘটনা ঘটলেও অনেক চালক আইনের আওতায় আসেন না। দুর্ঘটনার পর চালক পালিয়ে গেলে মামলা করা এবং গাড়ি জব্দ করার মধ্যেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে। এসব মামলায় এখন পর্যন্ত কোনো চালককে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলেও দাবি করেছেন দুর্ঘটনায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের একাধিক স্বজন।
মহিপাল হাইওয়ে পুলিশের পরিদর্শক আফছার বলেন, দুর্ঘটনার পর চালকরা পালিয়ে যান। পুলিশ তাদের খুঁজে পান না। এ কারণে অজ্ঞাত ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করতে হয়।
পুলিশের দাবি, দুর্ঘটনার তুলনায় মামলা কম হওয়ার একটি কারণ হলো, আইনি প্রক্রিয়ায় ভোগান্তির আশঙ্কায় অনেকে মামলা করতে চান না। পুলিশ যেসব দুর্ঘটনার খবর পায়, সেসব ঘটনায় মামলা করা হয়।
এ বিষয়ে ফেনী জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পিপি মেজবাহ উদ্দীন খাঁন বলেন, সড়ক দুর্ঘটনার মামলায় রাষ্ট্রপক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হয়। তবে এসব মামলার অধিকাংশ আসামিই অজ্ঞাত থাকেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

