সরকারি ৪০০ গাছ কাটলেন যুবদল নেতা, কাঠ মজুদ শ্রমিক লীগ নেতার করাতকলে

সরকারি ৪০০ গাছ কাটলেন যুবদল নেতা, কাঠ মজুদ শ্রমিক লীগ নেতার করাতকলে
ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন

ভোলার লালমোহনে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই রাস্তার পাশের চার শতাধিক সরকারি গাছ কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় এক যুবদল নেতার বিরুদ্ধে। সম্প্রতি রমাগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন দিন-রাত এসব গাছ কেটে ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিনের করাতকল, পাশের মাঠ ও বাগানে মজুদ করেছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের নাকের ডগায় এমন ঘটনা ঘটলেও এখন পর্যন্ত কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত জসিম উদ্দিন রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না এলাকাবাসী। তবে প্রশাসনের এমন নিষ্ক্রিয় ভূমিকায় ক্ষুব্ধ সচেতন মহল।

বিজ্ঞাপন

বুধবার দুপুরে লালমোহন উপজেলার কর্তারহাট বাজার থেকে রায়চাঁদ সড়ক ধরে সামনে এগোতেই চোখে পড়ে গাছ কাটার মহোৎসব। রাস্তার দুই পাশে পড়ে আছে অসংখ্য গাছের গুঁড়ি। সদ্য কেটে নেওয়া শত শত গাছের গোড়া এখনো দৃশ্যমান। তবে এ বিষয়ে রাস্তার পাশের বাসিন্দা ও পথচারীদের কেউই মুখ খুলতে চান না।

স্থানীয় বাসিন্দা খোরশেদ আলম বলেন, গত কয়েকদিন ধরে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা এসব গাছ কেটে নিতে দেখেছেন তিনি। বড় বড় ভেকু (এক্সকাভেটর) দিয়ে পুরো গাছ তুলে নেওয়া হয়েছে। কে, কীভাবে এসব গাছ কেটেছে, তা ইউনিয়নের সবাই জানেন। কিন্তু কেউ নাম বলতে চান না। তিনি বলেন, ভেকুচালক ও শ্রমিকদের তাঁরা দেখেছেন। তবে এর পেছনে যারা রয়েছেন, তাদের নাম প্রকাশ করে বিপদে পড়তে চান না।

কর্তারহাট বাজারের পূর্ব পাশের একটি করাতকলেও রাস্তার পাশ থেকে কেটে নেওয়া বেশ কিছু গাছের গুঁড়ি দেখা গেছে। করাতকলের পাশে উপস্থিত ১০-১২ জন এলাকাবাসী একসঙ্গে জানান, একদল মানুষ রাস্তার গাছগুলো কেটে নিয়ে গেছে। তাদের সবাইকে চিনলেও নাম বলতে রাজি নন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যক্তি জানান, কর্তৃপক্ষের কোনো অনুমতি কিংবা টেন্ডার ছাড়াই এসব গাছ কেটে নিয়েছেন রমাগঞ্জ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি মো. জসিম উদ্দিন।

স্থানীয়দের আরো অভিযোগ, অক্টোবর মাসের শুরুর দিকে রাস্তা সংস্কারের কথা বলে ১০-১৫টি গাছ কাটা হয়। পরবর্তীতে গত সপ্তাহ থেকে এক্সকাভেটর মেশিন দিয়ে দিন-রাত প্রায় ৪০০ গাছ কেটে রায়চাঁদ বাজারে রমাগঞ্জ ইউনিয়ন শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি মো. শাহাবুদ্দিনের করাতকলে রাখা হয়েছে। কর্তারহাট থেকে পূর্ব দিকে রায়চাঁদ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে গাছ কাটার অসংখ্য চিহ্ন দেখা গেছে।

রায়চাঁদ বাজার ব্রিজের পূর্ব পাশের একটি করাতকলে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সদ্য কাটা গাছের স্তূপ। এর মধ্যে মেহগনি, রেইনট্রি ও চাম্বুল গাছের সংখ্যা বেশি। করাতকলের দক্ষিণ পাশের বাগান ও বিলের মধ্যেও বিপুলসংখ্যক গাছের গুঁড়ি স্তূপ করে রাখা হয়েছে।

এদিকে প্রশাসনের কর্মকর্তারা আসার খবর পেয়ে করাতকলের মালিক তালা মেরে আত্মগোপনে চলে যান। পাশের রাস্তায় মালিকের ছেলে মো. মনিরের সঙ্গে দেখা হলে তিনি করাতকলের মালিকানার বিষয়টি অস্বীকার করে বলেন, গাছ কাটার সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। তবে উপস্থিত এলাকাবাসীর দাবি, জসিম উদ্দিনের কাছ থেকে মনির ওই গাছগুলো কিনে রেখেছেন।

গাছ কাটার বিষয়ে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে গত দুই দিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার মুখে বুধবার দুপুরে সরেজমিন পরিদর্শনে যান লালমোহন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, এলজিইডির প্রকৌশলী ও বন বিভাগের রেঞ্জার। এ সময় তারা গাছ কাটা এবং করাতকলে স্তূপ করে রাখার প্রমাণ নিজ চোখে দেখেন।

পরিদর্শন শেষে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সিফাত বিন সাদেক জানান, গাছ কাটার অভিযোগ পেয়ে তারা সরেজমিনে এসে পরিস্থিতি দেখেছেন। যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গাছগুলো কোন দপ্তরের এবং গাছ কাটার সঙ্গে কারা জড়িত, তা চিহ্নিত করার কাজ চলছে।

উপজেলা প্রকৌশলী মাহিদুল ইসলাম জানান, রাস্তা সংস্কারের জন্য টেন্ডার দেওয়া হলেও গাছ কাটার কোনো অনুমতি বা টেন্ডার তারা দেননি।

বন বিভাগ লালমোহনের রেঞ্জার আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাসহ তারা ঘটনাস্থল সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা যা বলার বলবেন। তবে গাছ কাটার জন্য বন বিভাগ কোনো টেন্ডার বা অনুমতি দেয়নি বলেও জানান তিনি।

স্থানীয়দের তথ্যমতে, কর্তারহাট থেকে রায়চাঁদ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সড়কের দুই পাশে ৫০ বছরের পুরোনোসহ সহস্রাধিক গাছ রয়েছে। এর মধ্যে কেটে ফেলা ৪০০ গাছের বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা বলে জানিয়েছেন তারা।

অভিযুক্ত যুবদল নেতা জসিম উদ্দিন সাংবাদিকদের কাছে গাছ কাটার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করবেন তিনি। এ কারণে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তবে কে বা কারা গাছ কেটে নিয়েছে, সে বিষয়ে কোনো বক্তব্য না দিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান তিনি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন