৮ কোটি টাকার সড়ক, দুই মাসেই বেহাল দশা

৮ কোটি টাকার সড়ক, দুই মাসেই বেহাল দশা

নোয়াখালীতে লক্ষ্মীপুর-দত্তপাড়া-চাটখিল-খিলপাড়া সড়কের মেরামতের কাজ শেষ হওয়ার দু’মাসের মধ্যেই সড়কটি মুখ থুবড়ে পড়েছে। একটু বৃষ্টিতেই সড়কের বিভিন্ন স্থানে পিচ উঠে গিয়ে খানাখন্দ ও গর্তের সৃষ্টি এবং বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে সড়কটি জমিন ও খালের মধ্যে ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন যাত্রীসাধারণ ও যানচালকেরা।

অভিযোগ উঠেছে, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার ও দায়সারা কাজ করে প্রকল্পের টাকা হরিলুট করেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা।

বিজ্ঞাপন

নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের (সওজ) নির্বাহী প্রকৌশলী সফিকুল ইসলাম জানান, চাটখিল-খিলপাড়া সড়কের প্রায় ৭ কিলোমিটার অংশ মেরামতের জন্য ৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা ব্যয়ে কাজটি পান মেসার্স সেলিম এন্ড ব্রাদার্স এন্ড নুরুজ্জামান ইঞ্জিনিয়ারিং ফাউন্ডেশন জেবি নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। ১৯/বি, উত্তর টোলারবাগ (প্রথমতলা), মিরপুর-১, ঢাকা-১২১৬। তবে কাজটি করেন নোয়াখালীর ঠিকাদার মোরশেদ আলম।

স্থানীয় সাইফুল ইসলাম অভিযোগ করেন, বিগত আওয়ামী শাসনামলের শেষ এক দশকে এ সড়কটিতে উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। এর ফলে সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। দীর্ঘ এক দশক পর স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের আন্তরিক প্রচেষ্টায় এটি মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি আসে। তবে মেরামতকাজ শেষ হওয়ার দুই মাসের মধ্যে সড়কের বেহাল দশা দেখা দেওয়ায় স্থানীয়রা ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যাদেশ ও নির্ধারিত মান অনুযায়ী কাজ না করায় সড়কের বিভিন্ন স্থানে ফাটল ধরেছে। কাজ শেষ হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই পাথরের ওপরের কালো বিটুমিনের আবরণ উঠে গিয়ে সড়কের অনেক অংশ ধূসর হয়ে গেছে।

নির্মাণকাজে নিম্নমানের বিটুমিন ও পরিমাণে বিটুমিন কম ব্যবহার করা হয়েছে। নিম্নমানের বিটুমিনযুক্ত পাথর ব্যবহার করায় এগুলো হাতের টানে উঠে আসছে বলে অভিযোগ করেন তারা।

ইতিমধ্যে ১২-১৩টি স্থানে সড়কের অংশ ধসে পড়েছে। ওই সব স্থানে বালুর বস্তা ও কালো পলিথিন দিয়ে সাময়িকভাবে ঢেকে রাখা হয়েছে। ভারী বৃষ্টি হলে সড়কটি খালের ভেতর ও জমিনের দিকে ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, কার্যাদেশ অনুযায়ী বিটুমিন-পাথরের ৪০ মিলিমিটার পুরুত্বের ঢালাই দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক স্থানে ২৫ থেকে ৩০ মিলিমিটার পুরুত্বে ঢালাই দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া প্রথমে গাইড ওয়াল নির্মাণ না করে সড়ক মেরামতের কাজ করায় বিভিন্ন স্থানে সড়ক ধসে পড়েছে। স্থানীয়রা বলেন, নিয়ম অনুযায়ী প্রথমে গাইড ওয়াল নির্মাণ, তারপর গাইড ওয়ালের ভেতরে মাটি ভরাট ও এরপর রোলার দিয়ে ম্যাকাডম করা। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসব নিয়মের কোনো তোয়াক্কাই করেননি। ফলে সড়কটি ঝুঁকিতে পড়ে গেছে।

সিএনজি চালক আব্দুল হান্নান ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই ভাঙা রাস্তা নিয়ে আমরা দীর্ঘদিন কষ্ট করেছি। আশা ছিল নতুন রাস্তা হলে সেই কষ্ট লাঘব হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, কাজ শেষ হওয়ার আগেই রাস্তা ভেঙে যাচ্ছে। অত্যন্ত নিম্নমানের কাজ করা হয়েছে।”

সড়কে চলাচলকারী কফিল উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, “ঠিকাদার প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূর থেকে বিটুমিন-পাথর মিক্স করে এনে এখানে কাজ করেছেন। অত্যন্ত নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের কারণে কাজ শেষ হওয়ার পরপরই সড়কের অধিকাংশ জায়গা ফেটে চৌচির হয়ে গেছে।”

এ বিষয়ে ঠিকাদার মোরশেদ আলম বলেন, এ সড়কটি এলজিইডি থেকে এসেছে। আমার গাইড ওয়াল ধরা আছে ১০৭ মিটার, সেখানে ১৮৬ মিটার করেছি। এখানে প্রায় দুই কিলোমিটার রাস্তা খুঁড়ে পাবলিক হেলথ নিয়মবহির্ভূতভাবে পানির পাইপ লাইন দিয়েছে এবং রাস্তার পাশে বেশ কয়েকটি পুকুর রয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন স্থানে রাস্তা দেবে গেছে। এই কাজে আমার ইস্টিমেটের বাইরে ৬০ লাখ টাকা লস হবে। আমরা গত কয়েক দিন থেকে এগুলো রিফারিং করে দিচ্ছি।

এ ব্যাপারে নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মোহাম্মদ শফিকুল ইসলামের নিকট জানতে চাইলে, তিনি প্রথমে তথ্য দিতে নানা অজুহাত ও ঘড়িমসি করেন। তবে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, কাজে নিম্নমানের বিটুমিনের ব্যবহারসহ কিছু অনিয়ম হয়েছে। বৃষ্টির পরে এখন আমরা সেগুলো রিফারিং করে দিচ্ছি।

এ ঘটনায় নোয়াখালী সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সফিকুল ইসলামের নিকট জানতে চাইলে তিনি কাজের অনিয়মের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, ভারী বৃষ্টির কারণে কাজের সমস্যা হয়েছে। বৃষ্টি কমে যাওয়ার পর এখন আমরা পুনরায় সেটি মেরামত করে দিচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, এই কাজের ডিফেক্ট লায়াবিলিটি তিন বছর যাবৎ রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কোনো সমস্যা দেখা দিলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেরামত করতে বাধ্য থাকিবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন