ফেনীর পতিত গডফাদার নিজাম উদ্দিন হাজারীর স্ত্রী নূরজাহান বেগমের ৮টি ফ্ল্যাট, ৫২ বিঘা জমি ও চারতলা একটি ভবন ক্রোকের আদেশ দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে তার নামে থাকা ৩০টি ব্যাংক হিসাব ও বিভিন্ন কোম্পানির বিপুল পরিমাণ শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
সোমবার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ ও জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক মো. জাকির হোসেন এ নির্দেশ দেন।
দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এই আদেশ দেন আদালত। দুদকের সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, জব্দ হওয়া সম্পদের মধ্যে ঢাকায় ও চট্টগ্রামে ৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা মূল্যের ৮টি ফ্ল্যাট, খাগড়াছড়িতে ১৫ একর জমি, কেরানীগঞ্জে ৬০ শতাংশ জমি, মোহাম্মদপুরে সাড়ে ৪৯ শতাংশ জমি, গাজীপুরে ১২৭ শতাংশ জমি ও মোহাম্মদপুরে চারতলা ভবন রয়েছে।
এ ছাড়া অবরুদ্ধ হওয়া অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা মূল্যের পিস্তল এবং মেঘনা ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক, এফএসআইবিএল ব্যাংকের ৩০টি ব্যাংক হিসাবে ১৯ কোটি ২৯ লাখ টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
এ ছাড়াও স্নিগ্ধা ওয়াটার ট্রান্সপোর্টের ১৫ হাজার শেয়ার, স্নিগ্ধা ওভারসিজের ৮০০ শেয়ার, স্নিগ্ধা ইকুইটিজের ২৫ হাজার শেয়ার ও স্নিগ্ধা ডিজাইনের ৫ হাজার শেয়ার অবরুদ্ধ করা হয়েছে। এন এন ফিশারিজ অ্যান্ড হ্যাচারি ও ব্যবসায়িক মূলধন ৮০ লাখ টাকা অবরুদ্ধ করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, বিগত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে গত ২৮ নভেম্বর নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া হলফনামায় নিজাম হাজারী উল্লেখ করেছেন তাঁর স্ত্রীর মাসিক আয় ১ কোটি ৪ লক্ষ ১৩ হাজার ৫৮৫ টাকা। নগদ ও ব্যাংকে রয়েছে ১৯ কোটি ২৯ লক্ষ ৮২১ টাকা।
এছাড়া বন্ড, ঋণপত্র, স্টক এক্সচেঞ্জে শেয়ার রয়েছে স্ত্রীর নামে ৪ কোটি ১০ লক্ষ ৫ হাজার টাকার। পোস্টাল, সেভিংস সার্টিফিকেটসহ বিভিন্ন ধরনের সঞ্চয়পত্রে স্থায়ী আমানতে বিনিয়োগ রয়েছে ১৬ কোটি ৪২ লক্ষ ৯৩ হাজার ২২৫ টাকার।
স্থাবর সম্পদের মধ্যে স্ত্রীর রয়েছে (অর্জনকারী সময়ের মূল্যে ) ১৩ কোটি ১২ লক্ষ ৬২ হাজার ৭২৫ টাকা মূল্যের ২টি ফ্ল্যাট, ১টি ৫ তলা ভবনসহ ২৫ শতাংশের মতো অকৃষি জমি,২ কোটি ৫০ লক্ষ ৩০ হাজার ৫০০ টাকা মূল্যের মৎস্য খামার এবং ৮ কোটি টাকার ব্যবসা।
২০১১ সালে ফেনী পৌর নির্বাচনে অংশ নিয়ে নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়া হলফনামায় নিজাম হাজারী এবং তাঁর স্ত্রীর নামে থাকা সম্পদের বিবরণে উল্লেখ করেন, ওই সময়ে তার নিজের নামে ব্যাংকে জমা টাকার পরিমাণ ১০ লাখ আর স্ত্রীর নামে সঞ্চয়পত্র/স্থায়ী আমানত ছিল এক কোটি টাকা।
তখন তার কাছে নগদ টাকা ছিল ৫০ হাজার, স্ত্রীর কাছে ছিল ৫০ হাজার টাকা। হলফনামা অনুযায়ী, ২০১১ সাল পর্যন্ত নিজাম হাজারী ৫০ শতাংশ কৃষি জমি ও ৫০ শতাংশ অকৃষি জমির মালিক। তখন স্ত্রীর নামে কোনো জমি বা ফ্ল্যাট ছিল না। নিজামের একটি মোটর কার থাকার কথা বলা হলেও দাম উল্লেখ করা হয়নি। স্ত্রীর নামে তখন কোনো গাড়ি ছিল না। তবে স্ত্রীর ১০০ ভরি স্বর্ণালংকার ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ২০১১ সালের ১৮ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ফেনী পৌরসভার নির্বাচনে অংশ নিয়ে মেয়র হন তিনি। এর তিন বছরের মাথায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রথমবার ও আট বছরের মাথায় দ্বিতীয়বার আওয়ামী লীগ থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন নিজাম হাজারী।
একই আসন থেকে টানা তৃতীয়বার আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়ে সর্বশেষ বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও অংশ নিয়ে আমি আর ডামি ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
এর মধ্যে মানবপাচার, কমিশন-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন খাতের অর্থ আত্মসাৎসহ বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে গত ১৫ বছরে নিজের ও স্ত্রীর নামে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলেছেন জেলার বিনা ভোটের সাবেক এই সংসদ সদস্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের পর দুদকের অনুসন্ধানে নিজাম হাজারীর ৮২টি ব্যাংক হিসাবে ৫৪৮ কোটি ৮০ লাখ টাকার সন্দেহজনক ও অস্বাভাবিক লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
এ ব্যাপারে ফেনী জেলা যুবলীগের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ‘গত আওয়ামী লীগ সরকারের ১৫ বছরে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন নিজাম হাজারী। এই সম্পদের ১০ শতাংশ রয়েছে ফেনীতে। বাকি টাকা দুবাই, লন্ডন, তুরস্কসহ বিভিন্ন দেশে পাচার করেছেন। তার স্ত্রীর রয়েছে দুই কেজি স্বর্ণালংকার। অবৈধভাবে অর্জন করা এই সম্পদ দেশের কোনো কাজে আসেনি।’
ফেনী জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শেখ ফরিদ বাহার বলেন, ‘মাস্টারপাড়ার হিন্দুদের জায়গা দখল করে নিজাম হাজারী হাজার কোটি টাকার বাগানবাড়ি তৈরি করেছেন।’
ফেনী শহরতলি সহদেবপুরের বাসিন্দা সম্ভু চক্রবর্তী বলেন, ‘প্রথমে জায়গা দিতে রাজি হচ্ছিলাম না। পরে দুজন এসে বলে, জায়গা বিক্রি করে টাকা না নিলে জোর করে নিয়ে যাবে। ভয়ে রেজিস্ট্রি করে দিই। পরে নামমাত্র টাকা দিয়েছে।’
এ ছাড়া ফেনী সদর উপজেলার বালিগাঁও ইউনিয়নে নিজাম হাজারী কয়েক হাজার একর জায়গা দখল করে নিজের ও স্ত্রীর নামে মসজিদ-মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। নামমাত্র টাকায় এসব জমি দখল করা হয়। অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে ফেনীর পতিত এই গডফাদারের বিরুদ্ধেও মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
গত ১৮ ডিসেম্বর দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয় ঢাকা-১-এ মামলাটি করেন সংস্থাটির উপপরিচালক মোহাং নূরুল হুদা।
তার আগে গত ৪ আগস্ট ফেনীর মহিপালে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে ১২ জনকে হত্যা ও অন্তত ৩০০ জনকে আহত করেছিল নিজাম হাজারী ও তার সাঙ্গপাঙ্গসহ দলীয় ফ্যাসিস্টরা।
৫ আগস্ট হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর পরিবার নিয়ে আত্মগোপনে চলে যায় নিজাম হাজারী। গত ১৭ অক্টোবর নিজাম উদ্দিন হাজারী ও তাঁর স্ত্রী নূরজাহান বেগমের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত।
ওই আদেশের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে ভারত গিয়ে সেখানে অবস্থান করছেন বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

