আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

মিন্টুর দ্বৈত নাগরিকত্ব: মনোনয়নপত্রের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক

এস এম ইউসুফ আলী, ফেনী

মিন্টুর দ্বৈত নাগরিকত্ব: মনোনয়নপত্রের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক

ফেনী-৩ আসনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী আব্দুল আউয়াল মিন্টুর দ্বৈত নাগরিকত্ব প্রসঙ্গে মনোনয়নপত্রের বৈধতা নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।

গত কয়েকদিন ধরে এ নিয়ে তার প্রার্থিতা বাতিল হতে পারে বলে স্থানীয়দের মাঝে গুঞ্জন ছিল।

বিজ্ঞাপন

রোববার মনোনয়ন যাচাই-বাছাইয়ের দিনে যখন ফেনী-৩ আসনের নির্ধারিত সিডিউল দুপুর ১টা থেকে পিছিয়ে আড়াইটা এবং পরে ৩টায় নিয়ে যাওয়া হয় তখনই সে গুঞ্জন আরো বাড়তে থাকে ।

পরে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের কোনো প্রমাণপত্র জমা না দেওয়ার পরও বিস্ময়করভাবে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মিন্টুর মনোনয়নপত্রটি বৈধ ঘোষণা করেন।

এসময় উপস্থিত বিএনপি নেতা-কর্মীরা হাততালি দিয়ে উচ্ছাস প্রকাশ করলেও অন্য সবাই নিরবে বিস্ময় প্রকাশ করতে দেখা গেছে।

এর আগে বেলা ৩ টার কিছু পর যখন আব্দুল আউয়াল মিন্টুর মনোনয়ন ফরমের যাচাই-বাছাইয়ের ঘোষণার সময় হয়, তখন ঘোষণা চলাকালীন সময়ে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হক প্রার্থী নিয়ে কোনো প্রশ্ন আছে কিনা জিজ্ঞেস করলে জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মোহাম্মদ আব্দুর রহিম আব্দুল আউয়াল মিন্টুর দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেন। প্রশ্নের প্রেক্ষিতে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হক বলেন, উনি উনার যে হলফনামা সেখানে উনি ঘোষণা করেছেন যে উনি মার্কিন এ্যাম্বাসিতে নাগরিকত্ব পরিত্যাগের আবেদন দাখিন করেছেন।

পরে তিনি বৈধ ঘোষণা দিয়ে বলেন, প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন যে উনি নাগরিকত্ব বাতিলের আবেদন দাখিল করেছেন। আমাদের সংবিধানের যে সংশ্লিষ্ট ধারা আছে, সেখানে বলা আছে- দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে এ অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি নাগরিকত্ব অর্জন করেছেন বলে গণ্য হইবে না। এতে উনার মনোনয়নপত্র গ্রহণ করা যায়। ফলে আমরা মনোনয়নপত্র গ্রহণ করছি।”

মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণার পর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আবদুল আউয়াল মিন্টু সাংবাদিকদের বলেন, যারা আমার কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে বৈধ ঘোষণা করেছেন তাদের প্রতি অকুণ্ঠ কৃতজ্ঞতা। কারণ আমাদের মতো লোকদের অনেক কাগজপত্র, অন্তত ১৫টি ব্যাংকে আমার ঋণ রয়েছে। আবার বিভিন্ন স্থানে জায়গা-জমি রয়েছে, সবকিছু উনারা কষ্ট করে যাচাই-বাছাইয়ে সঠিক পেয়েছেন। ফেনীর জনগণের কল্যাণে তাদের প্রত্যাশা ও মান উন্নয়নে কী করা দরকার সেই সম্পর্কে আমি পুরোপুরি অবহিত। এগুলো বাস্তবায়নের জন্যই শেষ বয়সে নির্বাচন করছি।

এদিকে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাইয়ের দিন থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মাধ্যমসহ জেলার সর্বত্র বিষয়টি নিয়ে নানান বিতর্ক ও রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই।

আবদুল আউয়াল মিন্টু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পরিত্যাগের ডকুমেন্টস হিসেবে কি প্রমাণ দাখিল করেছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা মনিরা হক আমার দেশকে বলেন, মার্কিন এ্যাম্বাসিতে ইমেইলে এ সংক্রান্ত কনভারসেশনের তথ্য ও দুটো ফর্মের মতামত জমা দিয়েছেন আবদুল আউয়াল মিন্টু।

মনোনয়নপত্র বৈধতার জন্য এটাই কি যথেষ্ট এমন প্রশ্নের জবাবে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা আমার দেশকে বলেন, এ ব্যাপারে পিপির পরামর্শ নেওয়া হয়েছে। আমার ভুলও হতে পারে। কেউ চাইলে আপিল করতে পরেন।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি যদি বিদেশের নাগরিকত্ব অর্জন করেন অথবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করেন, তবে তিনি সংসদ সদস্য হওয়ার অযোগ্য বিবেচিত হন। এই অনুচ্ছেদে নাগরিকত্বের পাশাপাশি বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্যের প্রশ্নটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যা কেবল পাসপোর্ট নয়, বরং আইনি সম্পর্ক ও অধিকারবোধকেও অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশের নির্বাচনে বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত অনেক বিদেশি নাগরিক ও দ্বৈত নাগরিকরা সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন, সংসদ সদস্য হয়েছেন।

এসব অংশগ্রহণকারীরা তাদের হলফনামায় নাগরিকত্ব ত্যাগের ভুয়া তথ্য বা অসমাপ্ত আবেদনের কপি দাখিল করে নির্বাচন কমিশনকে বিভ্রান্ত করেছেন। অথচ আন্তর্জাতিক আইনে অসমাপ্ত আবেদন কোনোভাবেই নাগরিকত্ব ত্যাগের সমান নয়। ২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের সময় দেশত্যাগকারী একাধিক সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের ক্ষেত্রে এই দ্বিচারিতার বাস্তব উদাহরণ সামনে এসেছে। ২০২৬ সালে অনুষ্ঠিতব্য আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই বিপজ্জনক প্রবণতা আবারও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

বিদেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করা কোনো মৌখিক ঘোষণা নয়, কোনো তাৎক্ষণিক বিষয় নয়। এটি একটি সময়সাপেক্ষ প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া।

যুক্তরাজ্যে নাগরিকত্ব ত্যাগের জন্য নির্দিষ্ট ফর্মের মাধ্যমে আবেদন করতে হয় এবং সরকারিভাবে রেজিস্টার না হওয়া পর্যন্ত নাগরিকত্ব বহাল থাকে। আইনগত প্রমাণ হলো সরকারের স্ট্যাম্প ও স্বাক্ষরযুক্ত Declaration of Renunciation। এই ঘোষণাপত্র ছাড়া কেউ যদি দাবি করেন যে তিনি ব্রিটিশ নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন, সেই দাবি আইনি অর্থে অগ্রহণযোগ্য। অনেকে নাগরিকত্ব ত্যাগের আবেদন করে সেই স্লিপটি নির্বাচন কমিশনে জমা দেন, কিন্তু পরবর্তীতে আবেদন প্রত্যাহার করে নেন। এটি একটি গুরুতর নির্বাচন-সংক্রান্ত প্রতারণা এবং হলফনামার অপব্যবহার।

যুক্তরাষ্ট্রে নাগরিকত্ব ত্যাগের প্রক্রিয়া সবচেয়ে কঠোর ও নথিভিত্তিক। এটি করতে হয় বিদেশে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস বা কনস্যুলেটে, কনসুলার অফিসারের সামনে শপথ নিয়ে। প্রক্রিয়া শেষে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর অনুমোদন দিলে ইস্যু হয় Certificate of Loss of Nationality (CLN)। এই CLN ছাড়া কেউ যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছেন এমন দাবি আইনগতভাবে ভিত্তিহীন। এই মূল সনদটি ছাড়া নাগরিকত্ব ত্যাগের কোনো মৌখিক ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইন ও বাংলাদেশের আদালতে গ্রহণযোগ্য নয়। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্রে চুপিসারে নাগরিকত্ব রাখা অসম্ভব।

যুক্তরাজ্যে যদি কেউ অন্য দেশের নাগরিকত্ব পেতে নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন এবং পরে তা ফিরে পেতে চান, তবে তিনি জীবনে একবার ‘Right of Registration’ সুবিধা পেতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কেউ একবার স্বেচ্ছায় নাগরিকত্ব ত্যাগ করলে তা পুনরুদ্ধার প্রায় অসম্ভব। সাধারণত নতুন করে অভিবাসন ও নাগরিকত্ব প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।

নির্বাচনি প্রতারকরা এই আইনি সুযোগটিকে ব্যবহার করে নির্বাচনের আগে অন্য দেশের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার শেষে পুনরায় সেসব দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন।

বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থায় (জনপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২ অনুযায়ী) হলফনামায় ভুল তথ্য দিলে প্রার্থিতা বাতিল এবং বিজয়ী হলে সংসদ সদস্য পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ একাধিক রায়ে বলেছেন যে, হলফনামা নির্বাচন-সংক্রান্ত মৌলিক দলিল এবং এতে মিথ্যা তথ্য দিলে তা “সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল”।

দণ্ডবিধির ১৯১ ও ১৯৩ ধারা অনুযায়ী মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া বা মিথ্যা হলফনামা দাখিল করা একটি ফৌজদারি অপরাধ, যার শাস্তি জেল ও জরিমানা। তবে আজ পর্যন্ত ভুয়া তথ্য দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারি প্রতারকদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার উদাহরণ নেই।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘পাসপোর্ট সারেন্ডার’ করা আর ‘নাগরিকত্ব ত্যাগ’ করার মধ্যে যে সূক্ষ্ম ফারাক রয়েছে, তা ব্যবহার করেই অনেক প্রতারক পার পেয়ে যাচ্ছেন। স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলে কেবল কাগজের হলফনামা নয়, বরং ডিজিটাল ভেরিফিকেশন এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে প্রার্থীদের সত্যতা যাচাই করা আবশ্যক।

বাংলাদেশের সংবিধানের পবিত্রতা রক্ষায় দ্বৈত নাগরিকত্বের ধোঁয়াশা দূর করা অপরিহার্য। যারা জনগণের সাথে প্রতারণা করে বিদেশের পাসপোর্ট পকেটে রেখে ক্ষমতার মসনদে বসেছেন, বা বসতে চান, তারা প্রকৃতপক্ষে জনগণের প্রতিনিধি নন।

মিথ্যা তথ্য প্রদান বা নাগরিকত্ব গোপন করার শাস্তি অত্যন্ত কঠোর হওয়া বাঞ্ছনীয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। নির্বাচন কমিশনকে (EC) সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর দূতাবাস থেকে নাগরিকত্ব ত্যাগের ‘চূড়ান্ত সনদ’ (যেমন: CLN বা Certificate of Renunciation) যাচাই করতে হবে। শুধু ব্যক্তিগত দাবি বা পাসপোর্টের ফটোকপি গ্রহণযোগ্য হবে না।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...