আওয়ামীপন্থীদের দিয়ে মাদারীপুর পৌর শ্রমিকদলের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে সদর উপজেলা শ্রমিকদলের একাংশের সভাপতি শাকিল মুন্সিকে (৩০) কুপিয়ে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষের লোকজন। এঘটনায় বিক্ষুব্ধরা অন্তত সাতটি ঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ফেলে। হামলা আর পুলিশের ভয়ে পুরুষ শূন্য পুরো এলাকা।

নিহতের ঘটনাটি রোববার রাত ১০টার দিকে মাদারীপুর সদর উপজেলার নতুন মাদারীপুর এলাকায় ঘটে। সোমবার সকালে থেকে নিহতের এলাকায় পুলিশ, র্যাব ও সেনাবাহিনী সদস্য মোতায়েন আছে।
নিহত শাকিল মুন্সি নতুন মাদারীপুর এলাকার মোফাজ্জেল মুন্সির ছেলে। তিনি সদর উপজেলা শ্রমিকদলের সভাপতি দায়িত্ব পালন করতেন। তবে গ্রুপিং রাজনীতির কারণ আরেক পক্ষেরও সদর উপজেলার শ্রমিকদলের কমিটি রয়েছে।

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, মাদারীপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান আক্তার হাওলাদারের ছোট ভাই যুবলীগ নেতা লিটন হাওলাদারকে সম্প্রতি মাদারীপুর পৌর শ্রমিকদলের সভাপতি করা হয়। এই কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে উপজেলা শ্রমিকদলের একাংশের সভাপতি শাকিল মুন্সির সাথে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হয় আক্তার হাওলাদার ও লিটন হাওলাদারের। এছাড়াও এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে একই এলাকার রুবেল হাওলাদারের বংশের লোকের সাথে আক্তার হাওলাদারের দ্বন্দ্ব ছিল। বৈষম্যবিরোধী
আন্দোলনে হত্যা মামলায় আওয়ামী লীগ নেতা আক্তার হাওলাদার দীর্ঘদিন থেকে কারাগারে। তার মামলাটির শুনানি ছিল রবিবার। তার সমর্থকদের ধারনা ছিল মামলায় কারাবন্দি আক্তার হাওলাদার জামিনে মুক্তি পাবেন। তাকে বরন করে নিতে আদালত চত্বরে হাজির হন তার সমর্থকেরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে রবিবার দুপুরে দুপক্ষের মাঝে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়াসহ দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের পরপর ঘটনাস্থলে পুলিশ পৌঁছালে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়। পরে রোববার রাতে রুবেল হাওলাদারের সমর্থক উপজেলা শ্রমিক দলের একাংশের সভাপতি শাকিল মুন্সিকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।
নিহতের পরিবারের দাবি, লিটন হাওলাদার, আল-আমিন হাওলাদার, জাহাঙ্গীর হাওলাদারসহ বেশ কয়েকজন হামলা করে শাকিলকে কুপিয়ে গুরুতর জখম করে।
পরে স্থানীয়রা উদ্ধার করে মাদারীপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করে। সেখানেই চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যায় শাকিল। এদিকে মারা যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে বিএনপির সমর্থকরা হত্যাকারীদের বিচার দাবি করে শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে।
ঘটনায় পরে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। ওই দিন রাতেই মারা যাওয়ার ঘটনায় নতুন মাদারীপুর এলাকার লতিফ হাওলাদার, সাজ্জাদ হাওলাদার, হায়দার হাওলাদার, রাজ্জাক হাওলাদারসহ ছোট বড়
সাতটি ঘরে আগুন দেয় বিক্ষুব্ধরা। নিমিষেই পুরো ঘর পুড়ে ছাই হয়ে যায়।
এ ঘটনার পর থেকে পুরো এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। ফলে কোনো ঘরেই পুরুষ মানুষ দেখা যায়নি। কয়েকটি স্থানে পুলিশ মোতায়েন রাখা আছে। তবে এখনো মামলা হয়নি।
নিহত শাকিলের ভাই মাদারীপুর পৌর বিএনপির ২নম্বর ওয়ার্ডের সাধারণ সম্পাদক হাসান মুন্সি বলেন, ‘আমার ভাই শাকিলকে প্রতিপক্ষ লিটন, আল আমিন, জাহাঙ্গীরসহ বেশ কয়েকজন কুপিয়ে হত্যা করেছে। এরা সবাই আওয়ামী লীগের লোকজন। এর আগেও আক্তার হাওলাদারের লোকজন আমার ভাইকে মারধর করেছিল। পরে আওয়ামী লীগের নেতাদের ভয়ে মামলা তুলে মীমাংসা করতে হয়েছিল। এর এবার সেই আওয়ামী লীগের নেতাদের নিয়েই পৌর শ্রমিকদলের
কমিটি করায়, তার প্রতিবাদ করেছিল শাকিল। ফলে তাকে লাশ হতে হলো। আমি এই হত্যার বিচার চাই।’
মাদারীপুর জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব কামরুল হাসান বলেন, ‘একমাত্র আওয়ামী লীগের লোকজন নিয়ে কমিটি করার প্রতিবাদ করায়ই শাকিলকে খুন করা হয়েছে। এভাবে একটি তরতাজা প্রাণকে হত্যা করা কোনো ভাবেই কাম্য নয়।
এ ঘটনার সাথে যারা জড়িতদের খুঁজে বের করে শাস্তি দেয়ার দাবি করছি।’ এ ব্যাপারে মাদারীপুরের পুলিশ সুপার মো. সাইফুজ্জামান বলেন, ‘শাকিল মুন্সি নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করেছে। এই ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা থাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরে এলাকার আধিপত্য ও পৌর শ্রমিকদলের কমিটি গঠন নিয়েই এ হত্যা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। মামলা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তবে কিছু লোকের নাম জানা গেছে, তাদের আটকের চেষ্টা করা হচ্ছে।’
এঘটনার পর অভিযুক্তরা বাড়ি থেকে পালিয়ে গেছে। তাদের প্রায় সবার ঘরেই তালা ঝুলছে। ফোনেও তাদের বক্তব্য নেয়া যায়নি।
এমএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

