ছেলের কথা বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদ হৃদয়ের মা নাছিমা বেগম। ‘আমার ছেলের অপরাধ কী ছিল’Ñঅশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ১৮ জুলাই রাতে শেষবারের মতো কথা হয়েছিল। বলেছিল, শুক্রবার সকালে বাড়ি আসবে। ছেলের পছন্দের খাবার রান্না করেছিলাম। পরে সকালে ফোন করে বলল, রোববার বাবার সঙ্গে ফিরবে। আমি শুধু বলেছিলাম, ঢাকার অবস্থা ভালো নয়, সাবধানে থাকিস। তখন সে বলেছিল ‘মা, তুমি চিন্তা করো না।’ ওই কথাটাই ছিল আমার ছেলের শেষ কথা।
কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে শুরু হওয়া গণআন্দোলনে প্রাণ হারান শত শত মানুষ। তাদেরই একজন শহীদ হৃদয় আহমেদ শিহাব শিবচর উপজেলার সন্যাসীরচর এলাকার আজগর হাওলাদারকান্দি গ্রামের বাসিন্দা শাহ আলম হাওলাদার ও নাছিমা বেগম দম্পতির ছেলে। পরিবারে তার একটি ছোট বোন রয়েছে। সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী এ কিশোরের মৃত্যু শুধু একটি প্রাণহানির ঘটনা নয়, বরং একটি পরিবারের স্বপ্ন, ভরসা ও ভবিষ্যৎ একসঙ্গে নিভে যাওয়ার করুণ ইতিহাস। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও হৃদয়ের বাড়িতে আজও শোকের ছায়া স্পষ্ট দেখা যায়।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, হৃদয়ের বাবা শাহ আলম হাওলাদার প্রায় আট বছর আগে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ভারী কাজ করার সক্ষমতা হারান। এরপর পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী হয়ে ওঠে ছেলে হৃদয়।
পরিবার জানায়, ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার জুমার নামাজ শেষে ফুপাতো ভাইয়ের বোনের বাসায় দুপুরের খাবার খেতে যায় হৃদয়। খাবার শেষে কর্মস্থলে ফেরার পথে রাজধানীর বাড্ডা লিংক রোড এলাকায় চলমান আন্দোলনের মধ্যে টিয়ার শেলের ধোঁয়ায় চারপাশ আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। ঠিক সেই সময় একটি গুলি এসে বিদ্ধ হয় তার শরীরে। রক্তাক্ত অবস্থায় প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে পরে বনশ্রীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক হৃদয়কে মৃত ঘোষণা করেন।
মা নাছিমা বেগম চোখের পানি মুছতে মুছতে বলেন, মোবাইলে এখনো আমার বাবার ভিডিও দেখি। মনে হয়, এই বুঝি ফোন দেবে, ‘মা’ বলে ডাকবে। কিন্তু আমার বাবা আর ফিরে আসে না।
হৃদয়ের বাবা শাহ আলম হাওলাদার ছেলের কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তিনি বলেন, আমার ছেলের কী অপরাধ ছিল। ওরে কেন গুলি করে মারল? সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন।
সরেজমিন হৃদয়ের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ছোট্ট একটি টিনের ঘরে বসবাস করেন শাহ আলম ও নাছিমা দম্পতি। পরিবারের নিজস্ব বসতভিটা ছাড়া অন্য কোনো জমিজমা নেই। ঘরের অবস্থাও অত্যন্ত নাজুক।
বর্তমানে হৃদয়ের মা নাছিমা বেগম সেলাইয়ের কাজ করে সামান্য আয় করেন। এছাড়া জুলাই স্মৃতি ফাউন্ডেশন থেকে পাওয়া পাঁচ লাখ টাকা ব্যাংকে এফডিআর করে তার মুনাফা দিয়ে সংসার চলছে।
হৃদয়ের একমাত্র বোন সাথী আক্তার বলেন, অনেকেই এসেছেন, আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু বাস্তবে সহযোগিতা কেউ করেননি।
শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এইচএম ইবনে মিজান বলেন, আমরা শহীদ হৃদয়ের পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। সরকারের পক্ষ থেকে যে সহযোগিতা এসেছে, তা পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। পরিবারের অনুরোধে হৃদয়ের কবর সংরক্ষণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পাওয়া গেলে পরিবারটিকে সহযোগিতা করা হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

